মনুসংহিতা অনুসারে দন্ডের উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য (Origin and characteristics of the penalty according to the Manusanghita)

মনুসংহিতা অনুসারে দন্ডের উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য (Origin and characteristics of the penalty according to the Manusanghita)

দন্ডের উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য লিখ ? (১০)


মনুসংহিতার সপ্তম অধ্যায়ে রাজধর্মঃ বর্ননা প্রসঙ্গে দন্ডের উৎপত্তি ও মাহাত্য বর্ননা করা হয়েছে। কারন রাজ্য শাসন ও প্রজারজ্ঞান রূপ মুখ্য রাজধর্ম পালনের জন্য রাজদন্ড অত্যাবশক।


মাৎস্যন্যায় দূত করে প্রজাপালনের জন্য ঈশ্বর ইন্দ্রাদি আটজন প্রধান দেবতার সার অংশ নিয়ে রাজা সৃষ্টি করেছেন। প্রজাদিগকে সৎপথে পরিচালিত করতে রাজার শাসন কার্যের সুবিধার জন্য ঈশ্বর রাজা সৃষ্টির পূর্বে দন্ড সৃষ্টি করেছেন। এই রাজদন্ড সকল জীবের রক্ষক ধর্ম স্বরূপ ও ব্রহ্মতেজময়।
মনু বলেছেন

তস্যার্থে সর্বভুতানাং গোপ্তারং ধর্মমাত্মজম্।
ব্রহ্মতেজাময়ং দন্ডমসৃজৎ পূর্বমীশ্বরঃ।। ১৪।।


দন্ডের ভয়ে সকল জীব নিজ নিজ কর্তব্য পালনে ও নায্য ভোগে সমর্থ হয়। কেউ স্বধর্ম থেকে বিচ্ছুত হয় না। সুতরাং সকল প্রজাকে নিয়ন্ত্রন করতে স্থান কাল পাত্র বিবেচনা পূর্বক যতোপযুক্ত ভাবে দন্ড প্রয়োগ করাই রাজাই কর্তব্য। এই দন্ডকে একাধারে রাজা, নেতা, পুরুষ, শাসক, ধর্মের প্রতিভ‚ এবং ব্রাহ্মনাদি চতুবর্ন ও ব্রহ্মচার্যাদি চতুরাশ্রমের রক্ষক বলা যায়।


মনু বলেছেন
স রাজা পুরুষো দন্ডঃ স নেতা শাসিতা চ সঃ।
ততুর্নামাশ্রমানাঞ্চ ধর্মস্য প্রতিভ‚ঃ স্মৃতঃ ।। ১০।।


দন্ডের ভয়ে সকল প্রজা সৎপথে চলে, দন্ডই সকলকে রক্ষা করে। সদা জাগ্রত প্রহরীর মতো দন্ড সর্বদা প্রজাদের রক্ষনে নিযুক্ত। তাই পন্ডিতেরা দন্ডকে বলেন ধর্ম।

ব্রহ্মতেজময় দন্ডের যাথাযথ প্রয়োগের ব্যপারে রাজাকে থাকতে হবে সদা সতর্ক। যথা যথ দন্ড প্রয়োগে প্রজার সন্তোষ ঘটে। রাজ্যে শান্তি উৎপত্তি ঘটে। অপরাধীর অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে তার প্রতি উপযুক্ত দন্ড বিধান রাজার একান্ত কর্তব্য। নতুবা রাষ্ট্রে দেখা দেয় নানা বিপর্যয়।

যেমন কাক যজ্ঞের পিষ্টক ভক্ষণ করে, কুকুর যজ্ঞীয় হবি লেহন করে, কোন বিষয়ে কারোও প্রভ‚ত্ত বা মালিকানা থাকে না এবং ব্রাহ্মনাদি বর্ন ইতরেতর বর্নের স্ত্রীগমনের দ্বারা বর্ন সংকরের পথ প্রশস্ত করে। এককথায় রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

তাই মনু বলেছেন
অদ্যাৎ কাকঃ পুরোডাশং শ্বাবলি হ্যাদ্ধ বিস্তযা।
স্বাম্যঞ্চ ন ম্যাৎ কস্মিংশ্চিৎ প্রবর্তেতা ধরোত্তরম্।।

কেবল মানুষই নয় দেব, দানব, গর্ন্ধব, রাক্ষস, পশুপক্ষীর দন্ডদ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আবার দন্ডের অবপ্যবহারের ফলে ব্রাহ্মনাদি বর্ন দূষিত হয়, সকল শাস্ত্রীয় নিয়ম বিলুপ্ত হয় এবং প্রজাদের মধ্যে পুঞ্জীভ‚ত দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভ। সূতরাং কেবল শাস্ত্রবীদ বিশুদ্ধ চিত্ত সত্যবাদী দূরদর্শী বুদ্ধিমান ধর্মবীর রাজাই দন্ডপ্রয়োগে উপযুক্ত অধিকারী। দন্ডের যথাযথ প্রয়োগের ফলে রাজা ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ লাভ করে। কিন্তু দন্ডের অপপ্রয়োগ করলে রাজা স্বমুলে বিনষ্ট হয়। বিষয় ভোগে অতিরীক্ত আসক্ত, অদুরদর্শী, অমার্জিত বুদ্ধি সম্পন্ন রাজার হাতে দন্ডের অপপ্রয়োগ ঘটে এবং তা স্থাবর তৃঙ্গম সমস্ত পৃথিবীকে এবং অন্তরীক্ষ গত মুনি ও দেবগনকেও পিড়ীত করে। সূতরাং দন্ডপ্রয়োগে সতর্কতা অবলম্বন একান্ত কর্তব্য।

Leave a Comment