মনুসংহিতা সপ্তম অধ্যায় । Monusonghita short Questions

মনুসংহিতা
1) মনুসংহিতা গ্রন্থের রচয়িতার নাম কি?
উঃ- মনুসংহিতা গ্রন্থের রচয়িতা ভগবান মনু। মতান্তরে ইহা রচয়িতা মহর্ষি ভৃগু।
2) মনুসংহিতা গ্রন্থে কয়টি অধ্যায় এবং কোনটি তোমাদের পাঠ্য?
উঃ- মনুসংহিতা গ্রন্থ 12 টি অধ্যায় আছে। এর মধ্যে রাজধর্মঃ নামক সপ্তম অধ্যায়টি আমাদের পাঠ্য।
3) মনুসংহিতার টীকাকার ও টিকার নাম কি?
উঃ- মনুসংহিতার প্রাচীন টীকাকার মেধাতিথি ও তাঁর টীকার নাম মেধাতিথি ভাষ্য।
4) মনুসংহিতার রচনাকাল লিখ?
উঃ- খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক হতে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যে গ্রন্থটি সংকলিত হয়েছে।
5) মনুসংহিতার কয়েকজন টীকাকারের নাম লেখ?
উঃ- মেধাতিথি, গোবিন্দরাজ,কুল্লবভট্ট,রাঘবানন্দ।
6) কুল্লবভট্ট রচিত টীকাটির নাম কি?
উঃ- মন্বোর্থমুক্তাবলী।
7) রাজা অগ্নির মধ্যে কোনটি বেশি ক্ষতিকারক এবং কেন?
উঃ- রাজা ও অগ্নির মধ্যে রাজা অধিক তর ক্ষতিকারক। কারণ সাধারণ অগ্নি তার অত্যন্ত নিকটবর্তী ব্যক্তিকে দগ্ধ করে। কিন্তু রাজরূপ অগ্নি সকল পশু ও ধনের সহিত অপরাধী ব্যক্তির সমগ্র পরিজনকে বিনষ্ট করে।
8) সর্বোতেজময় হিষঃ- কার বিষয়ে কোন পরিপ্রেক্ষিতে এই মন্তব্য অথবা কাকে সর্বতেজোময় বলা হয়েছে এবং কেন?
উঃ- ইন্দ্র বায়ু যম প্রভৃতি আটজন দেবতার সারভূত অংশ নিয়ে ঈশ্বর রাজাকে সৃষ্টি করেছেন। তাই শক্তিতে রাজা আট দেবতার সমান। কারণ রাজার অনুগ্রহে ইষ্ট সিদ্ধি, পরাক্রমে বিজয় ও ক্রোধে বিনাশ প্রাপ্তি ঘটে।এই প্রেক্ষিতে এই মন্তব্য করা হয়েছে।
9) মাৎস‍্যান‍্যায় কি?
উঃ- জলাশয়ে বড় বড় মাছেরা যেমন ছোট ছোট মাছেদের গিলে খায়। সেই রূপ ভাবে দন্ড প্রতিষ্ঠিত নাহলে বলশালী লোকেরা দুর্বলের উপর অত্যাচার করে। একেই বলে মাৎস‍্যান‍্যায়।
10) জাঙ্গলদেশ কাকে বলে?
উঃ- অল্প জল তৃণ যুক্ত, পরিমিত বায়ু ও রদযুক্ত শস্য সমৃদ্ধ দেশকে জাঙ্গলদেশ বলা হয়।

11) শিল ও উঞ্ছ বলতে কী বোঝো?
উঃ- ধান্য ক্ষেত্রে একটি একটি ধানের শিষ চয়ন করাকে বলা হয় শিল এবং ধান‍্যক্ষেত্র থেকে একটি একটি ধানের কনা সংগ্রহকে বলা হয উঞ্ছ।
12) মন্ত্রণা কালে রাজা কাদের দূরে রাখবেন?
উঃ- মন্ত্রণা কালে জড় বুদ্ধিসম্পন্ন মুখ, অন্ধ,বোধি,অতি দুগ্ধ ব্যক্তি, স্ত্রীলোক,ম্লেচ্ছপীড়িত,অঙ্গহীনব‍্যাক্তি, শুকসারী থেকে মন্ত্রনা দূরে রাখবেন।
13) ব্রাহ্মণ বুবা বলতে কী বোঝো?
উঃ- যে ব্রাহ্মণ নিজ বংশের  আচার-আচরণ পালন করেন না অথচ নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে ঘোষণা করে তাদের ব্রাহ্মণবুবা বলে।
14) তোর্যত্রিক শব্দের অর্থ কি?
উঃ- কামজ ব‍্যসনের অন্তর্গত হল তোর্যত্রিক।  এই পদটির দ্বারা নিত্য গীত বাদ্য কে বোঝায।
15) কোন কোন ব‍্যসনগুলি অধিকতর কষ্ট দেয?
উঃ- কামজ ব‍্যসনের মধ্যে মদ্যপান,পাশাখেলা, স্ত্রীসম্ভোগ ও মৃগয়া এবং ক্রোধজ ব‍্যসনের মধ্যে দণ্ডপারুষ‍্য,বাকপারুষ‍্য ও অর্থদূষন। এই তিনটি অধিকতর কষ্টকর।
16) ব্যাসন ও মৃত্যুর মধ্যে কোনটি অধিকতর কষ্টদায়ক?
উঃ- মৃত্যু কষ্টদায়ক হলেও সেই কষ্ট সাময়িক। কিন্তু ব‍্যসন সারাজীবন তিলে তিলে মানুষকে কষ্ট দেয়। অতএব মৃত্যু অপেক্ষা ব‍্যসনেই অধিকতর কষ্টদায়ক।
17) রাজা বালক হলেও তাকে অবমাননা করা উচিত নয় কেন?
উঃ- রাজা বালক হলেও তাকে মনুষ্য জ্ঞানে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। যেহেতু রাজা কোনোঅনির্বচনীয় মহান দেবতা মনুষ‍্যরূপে অবস্থান করেন।
18) রাজা কখন নানাপ্রকার রূপ ধারণ করেন?
উঃ- রাজা নিজের প্রয়োজনে, ক্ষমতা, স্থান ও কাল সম্পর্কে যথাযথ বিবেচনা করে কার্যসিদ্ধির জন্য বারবার নানাপ্রকার রূপ ধারণ করে থাকেন।
19) ঈশ্বর দণ্ডকে কখন সৃষ্টি করেন?
উঃ- রাজার প্রয়োজন সিদ্ধির জন্য সকল প্রাণীর রক্ষক, ধর্ম স্বরূপ প্রজাপতির শরীর থেকে জাত ও ব্রহ্মতেজ দ্বারা এই দণ্ডকে ঈশ্বর পূর্বেই সৃষ্টি করেছেন।

20) দণ্ডের ভয়ে কি হয় এবং কি হয় না? অথবা পৃথিবীতে দণ্ড থাকার ফল কি?
উঃ- দণ্ডের ভয়ে স্থাবর জঙ্গ মাত্যক বিশ্বের সকল প্রাণী ভোগ‍্য বস্তুগুলি ভোগ করতে সমর্থ হয়। এছাড়া কোন প্রাণী স্বধর্মভাবে বিচলিত হয় না।
21) রাজা কখন দন্ড প্রয়োগ করবেন?
উঃ- দেশকাল এবং অপরাধী সামর্থ্য ও বিদ‍্যার কথা  যথাযথ বিবেচনা করে রাজা অপরাধী ব্যক্তির ওপর দণ্ডবিধান করবেন।
22) কাকে চতুরাশ্রম ধর্মের প্রতিভূ বলা হয়েছে এবং কেন?
উঃ- ব্রহ্মতেজ থেকে উৎপন্ন ধর্মস্বরূপ দণ্ডকে চতুরাশ্রম ধর্মের প্রতিভূ বলা হয়েছে।  কারণ এই দণ্ডই রাজা, দণ্ডই পুরুষ,দণ্ডই নেতা এবং দন্ডই শাসক।
23) পণ্ডিতেরা দণ্ডকে ধর্ম বলেন কেন?
উঃ- দন্ড সমস্ত প্রজাকে শাসন করে থাকে এবং সকলকে রক্ষণাবেক্ষণ করে। তাই সবাই নিদ্রিত হলেও দন্ড একমাত্র জেগে থাকে।এই কারণে পণ্ডিতরা দণ্ডকে ধর্ম বলেছেন।
24) দণ্ডের সুপ্রয়োগ ও অপ্রয়োগের ফল কি? অথবা শাস্ত্রানুযায়ী প্রযুক্ত দন্ডের ফল কি এবং অবিবেচনার সঙ্গে প্রযুক্ত দণ্ডের  ফল কি?
উঃ- শাস্ত্রানুযায়ী সম্যক বিবেচনাপূর্বক দন্ড প্রয়োগ করা হলে সমগ্র প্রজা রাজার অনুরক্ত হয় এবং অবিবেচনার সঙ্গে দন্ড প্রযুক্ত হলে সকল ধন সম্পদ বিনষ্ট হয।
25) রাজা দণ্ড প্রয়োগ না করলে কি হত?
উঃ- রাজা যদি নিরলসভাবে অপরাধীর ওপর দণ্ডবিধান না করেন তাহলে বলশালী লোকেরা দুর্বলদের শূলে নিক্ষিপ্ত ম‍ৎস‍্যের ন‍্যায় বিনাশ করে থাকে। এছাড়া কাক যজ্ঞের পিঠে ভক্ষন করে। এছাড়া কুকুর যজ্ঞের হবি লেহন করে  এবং সমাজে কারো কোন বিষয়ে অধিকার থাকবে না।
26) দন্ড ভয়ের ফল কি?
উঃ- দন্ড ভয়ের  ফলে সকল লোক নিয়ন্ত্রণে থাকে। অর্থাৎ জগতের সকল প্রাণী স্ব স্ব ভোগ‍্য বস্তু ভোগ করতে সমর্থ হয।

27) দণ্ডের স্বার্থ প্রণেতা রাজার কি কি গুন থাকা দরকার?
উঃ- সত্যবাদী,বিবেচক, বুদ্ধিমান,ধর্ম,অর্থ ও কাম সম্পর্কে জ্ঞান সম্পন্ন উত্তম অমাত্মসহায় সম্পন্ন ও তত্ত্ব জ্ঞানী রাজাকে মুনিষীগন দণ্ডের সার্থক প্রনেতা মনে করেন।
28) কোন রাজা দন্ডের যথার্থ প্রয়োগকারী নয?
উঃ- অমাত্য সহায় বর্জিত,মুর্খ, লোভী, স্বার্থ জ্ঞানহীন ব‍্যাসনাসক্ত রাজা কখনই শাস্ত্রানুযায়ী দণ্ড প্রয়োগ করতে সমর্থ হন না।
29) রাজার কর্তব্য কি?
উঃ- রাজা অত্যন্ত ন্যায়-নিষ্ঠ, শত্রুপ্রতি তীক্ষ্নদণ্ড,মিত্রের প্রতি সরল ব‍্যবহার  এবং ব্রাহ্মণের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন।
30) রাজার যশ কিভাবে বিস্তার করে?
উঃ- গুনসম্পন্ন সুশাসক রাজা অল্প ধনের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করলেও তার কীর্তি জলে পতিত তৈলবিন্দুর মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।  অপরদিকে বিপরীত আচরণকারীর রাজার যশ জলে পতিত ঘৃতবিন্দুর  মতো সংকুচিত হয়ে যায়।

31) অসৎ আচরন সম্পন্ন রাজার যশ কিভাবে বিস্তার লাভ করে?
উঃ- অসৎ আচরন সম্পন্ন রাজার যশ ঘৃতবিন্দুর মতো সঙ্কুচিত হয়ে যায়।
32) রাজার প্রাত‍্যহিক কর্তব্য কী?
উঃ- রাজা প্রতিদিন প্রাতকালে শয‍্যা ত‍্যাগ করে বেদবিদ‍্যায় অভিজ্ঞ,নীতিশাস্ত্রজ্ঞ বৃদ্ধ ব্রাহ্মণদের সেবা করবেন তাদের আদেশ প্রতিপালন করেন।
33) রাজা কাদের কাছ হতে বিনয় শিক্ষা লাভ করবেন?
উঃ- রাজা বুদ্ধি ও শাস্ত্র জ্ঞান দ্বারা বিনীত হলেও বিদ‍্যান ব্রাহ্মণদের নিকট বিনয় শিক্ষা লাভ করবেন।
34) বিনীত ও অবিনীত রাজার ফল কি রূপ?
উঃ- প্রচুর ধনসম্পতিযুক্ত রাজা অবিনয় বশত বিনষ্ট হন। অপরদিকে রাজা সহায় সম্বলহীন বনবাসী হয়েও বিনয় বশত রাজ‍্যলাভ করেন।
35) কোন কোন রাজা অবিনয়হেতু বিনষ্ট হয়েছিলেন?
উঃ- বেণ,নহূষ,সুদা,সুমুখ,নিমি প্রভৃতি রাজারা অবিনয়হেতু বিনষ্ট হয়েছিল।
36) বিনয়ের দ্বারা কে কে রাজ‍্য লাভ করেছিল?
উঃ- মহারাজ পৃথু এবং রাজর্ষি মনু বিনয়বশত রাজ‍্য লাভ করেছিল।
37) বিনয়ের দ্বারা কে ঐশ্বর্য এবং কে ব্রহ্মত্ব লাভ করেছিল?
উঃ- বিনয়ের দ্বারা কুবের ঐশ্বর্য লাভ করেছিল এবং সাধিপুত্র বিশ্বামিত্র ব্রহ্মত্ব লাভ করেছিল।
38) আন্বীক্ষিকী কী?
উঃ- আন্বীক্ষিকী হল প্রকৃত পক্ষে তর্কবিদ‍্যা। আবার গৌতমের ন‍্যায় দর্শনকেও আন্বীক্ষিকী বলা হয়। কৌটিল‍্যের মতে, সাংখ‍্য,যোগ ও চার্বাক দর্শনকে একত্রে আন্বীক্ষিকী বলা হয়। ত্রয়ী,বার্তা,দণ্ডনীতি- এই তিনবিদ‍্যা যুক্তিসহ ব‍্যাখ‍্যা নির্নয় করে আন্বীক্ষিকী বিদ‍্যা।
39) বার্তা কি?
উঃ-কৃষি,বানিজ‍্য ও পশুপালন এদের একত্রে বার্তা বলে। বার্তার মাধ‍্যমে রাজা শস‍্য,ধাতু ও ধনসম্পত্তি লাভ করে। কৌটিল‍্য বলেছেন- “কৃষি পশুপাল‍্য বানিজ‍্যে চ বার্তা’।

40) ত্রয়ী কী?
উঃ- ঋক্,সাম,যজু এদের একত্রে বলা হয় ত্রয়ী। এই তিন বেদের বিদ‍্যাকে বলা হয় ত্রয়ী বিদ‍্যা। তবে অথর্ববেদ,পুরানইতিহাস ও বেদাঙ্গও ত্রয়ীর অন্তর্ভুক্ত। ত্রয়ী বিদ‍্যাতে চতুরবর্ণ ও চতুরাশ্রম- এর সমস্ত নিয়মকানুনের পুক্ষানুপুঙ্খ নিয়ম রয়েছে।
41) তৌর্যত্রিক কী?
উঃ- তৌর্যত্রিক বলতে নিত‍্য-গীত -বাদ‍্যকে বোঝায়। তুর্য শব্দের দ্বারা মূর্জা প্রকৃতিকে বোঝায়। আচার্য মনুরাজ ধর্ম নামে সপ্তম অধ‍্যায়ে দশপ্রকার কামজ ব‍্যসন উল্লেখ করতে গিয়ে তৌর্যত্রিক শব্দটি ব‍্যবহার করেছেন।
42) যোগক্ষেম কী?
উঃ- অপ্রাপ্তির বস্তুর প্রাপ্তের নাম যোগ এবং প্রাপ্ত বস্তুর রক্ষা করাকে বলা হয় ক্ষেম। প্রাপ্ত বস্তুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধানের মাধ‍্যমে সমাজ তথা রাষ্ট্রের ক্ষেম সাধন করে। একজন  আদর্শ রাজা প্রজাদের অপ্রাপ্ত বস্তুর দিকে দৃষ্টি দেওয়ার জন‍্য দণ্ড নীতির যথাযথ প্রয়োগ করে থাকেন।
43) আত‍্যয়িক কার্য কী?
উঃ- হঠাৎ কোনো কার্য অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কার্য করতে হলে সামান‍্য সময় নষ্ট ক্ষতিকর বলে এটিকে আত‍্যয়িককার্য বলা হয়। সুতরাং,আত‍্যয়িককার্য হল শীঘ্র সম্পাদিত সমস‍্যা যুক্ত কোনো কার্য। সুতরাং, আত‍্যয়িককার্যের ক্ষেত্রে রাজা মন্ত্রীদের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন অথবা নিজেও সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে পারেন।
44) অনাবস্থাদোষ কী?
উঃ- নিশ্চিতরূপে কোনো সন্দেহের নিরশন ঘটানোর জন‍্য যে প্রমাণের প্রয়োজন তাহল তর্কবিদ‍্যা। অর্থাৎ মানুষিক জ্ঞানের জন‍্য যে প্রমাণ প্রয়োজন তা হল তর্ক। এই তর্ক হল পাঁচপ্রকার।নৈয়ায়িক মতে, তৃতীয় প্রকার তর্ক হল অনাবস্থা। অনাবস্থার শব্দটি ন‍্যায় দর্শনে প্রচলিত একটি পরিভাষা। ন‍্যায় শাস্ত্রে অনাবস্থার সংজ্ঞা হল-যুক্তির সাহায‍্যে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার পথে যদি কোনো বাধা সৃষটি হয়। তখন সেখানে অনাবস্থাদোষ হয়।

Leave a Comment