সংস্কৃত গল্প সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য

উপাখ‍্যান সাহিত্য বা সংস্কৃত গল্প সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য বিবৃত করো এবং প্রধান প্রধান গ্রন্থগুলির পরিচয় দাও। অথবা উপাখ‍্যান সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য কি ছিল?সংস্কৃত উপাখ‍্যান সাহিত্যের বিশদ লেখচিত্র অঙ্কন কর।

Table of Contents

সংস্কৃত গল্প সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য বিবৃত করো এবং প্রধান প্রধান গ্রন্থগুলির পরিচয় দাও।অথবা উপাখ‍্যান সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য কি ছিল?সংস্কৃত উপাখ‍্যান সাহিত্যের বিশদ লেখচিত্র অঙ্কন কর।

সংস্কৃত গল্পসাহিত‍্য বা উপাখ‍্যান সাহিত্য রচনার উদ্দেশ‍্য

গল্প বলার গল্প শোনার প্রবৃত্তি চিরকালের। গল্প কাহিনীর প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে যুগ যুগ ধরে রচিত হয়ে চলেছে নানা ধরনের গল্প। তবে কখন কিভাবে এই মৌখিক গল্পকথা সাহিত্য আকারে আত্মপ্রকাশ করেছে তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। গল্পের প্রতি মানুষের আকর্ষণের প্রধান কারণ হল, গল্পের মাধ্যমেই মানুষের অবদমিত আশা আকাঙ্ক্ষার পরিপূরণ ঘটে। বিশেষত শিশু মনে গল্পের প্রভাব অপরিসীম। গল্পের মাধ্যমে শিশুদের নীতি শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রচিত হয়েছে গল্পকথা। তবে দেশভেদে এবং যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গল্পের বাচনভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথমে মুখে মুখে যে গল্প কাহিনী প্রচারিত ছিল পরে তাই সাহিত্যিক রূপ লাভ করেছে।

সংস্কৃত সাহিত্যে এই গল্পসাহিত্য কথাসাহিত্য রূপে পরিচিত। প্রাচীন বৈদিক সংহিতার কিছু গল্প ছিল বটে, কিন্তু এখনকার গল্প সাহিত্যের মত জীবজন্তুর কাহিনী সেখানে ছিল না। ব্রাহ্মণ ও আরণ‍্যককে দেবতা ও মানুষ সম্পর্কে কিছু কাহিনী রয়েছে এবং উপনিষদেও আধ্যাত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে উপদেশ দানের জন্য কিছু কাহিনী উপস্থাপনা করা হয়েছে পরবর্তীকালে লৌকিক সাহিত্যে পশুপাখি সম্বন্ধীয় কাহিনী পাওয়া যায়। আরও পরবর্তীকালের কথা সাহিত্যে পশুপাখি ও মানুষের অন্তরঙ্গ জীবনযাত্রা পরিচয় পাওয়া যায়। বিশেষত গল্পের মাধ্যমে শিশুদের নীতি শিক্ষাদানের পাশাপাশি বাস্তব জ্ঞান, ধর্মীয় অনুশাসন, রাজার কর্তব্য, বুদ্ধির প্রশংসা, অন্যায়, দুর্নীতির নিন্দা ও সামাজিক রীতিনীতির গুরুগম্ভীরতত্ত্ব সম্পর্কে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি নীতি শিক্ষাদানই ছিল গল্প গুলির মূল উদ্দেশ্য।

গল্প সাহিত্য সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে ম্যাকডোনেল বলেছেন-

“This is ingot the most original department of Indian literature.”

তিনি তার ‘Indian post’ গ্রন্থে গল্প সাহিত্যকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। যথা – প্রথমভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ।

  • প্রথমভাগ:- প্রথম ভাগে রয়েছে ধর্ম উপদেশ মূলক প্রাকৃত ভাষায় রচিত বৌদ্ধ ও জৈনসাহিত্য।
  • দ্বিতীয় ভাগ:- দ্বিতীয়ভাগে পার্থিব বিচক্ষণতা লাভে উদ্দেশ্যে রচিত নীতি উপদেশমূলক গল্প সাহিত্য রয়েছে।

সংস্কৃত গল্প সাহিত্য বা উপাখ‍্যান সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য

সংস্কৃত গল্প সাহিত্য বা উপাখ‍্যান সাহিত্য রচনার পিছনে মূলত তিনটি উদ্দেশ্য ছিল-

  • i)অবসর যাপন।
  • ii) চিত্ত বিনোদন।
  • iii)  নীতি শিক্ষাদান।

গল্পসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলির চরিত্র হিসাবে যেমন উপস্থাপনা করা হয়েছে দরিদ্র, ব্রাহ্মণ, কৃষক, বণিক, কারিগর প্রভৃতি শ্রেণীর লোকেদের।

ঠিক তেমনি অপরদিকে কখনো কখনো পশুপাখি ও মানুষের গল্প একত্রে পরিবেশিত হয়েছে, কখনো বা আলাদাভাবে।

গল্প সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থগুলির বিষয়বস্তু সংস্কৃত বা উপাখ‍্যান সাহিত্যের বিশদ লেখচিত্র অঙ্কন করা হল-

সংস্কৃত গল্প সাহিত্যে বৃহৎকথার স্থান

সংস্কৃত গল্প সাহিত্যে প্রাচীনতম গল্পগ্রন্থ গুনাঢ‍্যের বৃহৎকথা।  এটি পৈশাচী প্রাকৃত ভাষা রচিত। আনুমানিক প্রথম শতকেই গুণাঢ‍্যের কাল বলে অনেকেই মনে করেন।
       বৃহৎকথার উল্লেখ আছে সুবন্ধুর বাসবদত্তায়-

” বৃহৎকথালম্বৈরিব সালভঞ্জিকানিবহৈঃ।”

মূল বৃহৎকথা গ্রন্থটি লুপ্ত হলও পরবর্তীকালে বৃহৎকথা অবলম্বনে রচিত বুদ্ধস্বামীর শ্লোকসংগ্রহ, ক্ষেপেন্দ্রের বৃহৎকথামঞ্জুরী  এবং সোমদেবের কথাসরিৎসাগর বিশেষ প্রসিদ্ধ লাভ করেছে  বৃহৎকথা মূল উপাখ্যানের নায়ক হলেন উদয়নপুত্র নরবাহন দত্ত। বৃহৎকথার ভূমিকায় উদয়ন, বাসবদত্তা ও পদ্মাবতীর কাহিনীও বর্ণিত হয়েছে। এই গল্প কাহিনীকে অবলম্বন করে রচিত হয়েছে দন্ডীর দশকুমারচরিত,  বানের কাদম্বরী, সুবন্ধুর বাসবদত্তা,  ভাসের স্বপ্নবাসবদত্তা, শ্রীহর্ষের রত্নাবলী প্রভৃতি বহু নাটক ও কাব্য। তাই এই গ্রন্থের ঐতিহাসিক মূল্য কম নয়।

সংস্কৃত গল্প সাহিত্যে পঞ্চতন্ত্রের স্থান

পঞ্চতন্ত্র নীতি কথাসাহিত্যে সমাদৃত অতিপ্রাচীন একটি তন্ত্র। দাক্ষিণাত্যের মহারাজা অমর শক্তির মূর্খ পুত্রদের নীতি শিক্ষার জন্য পন্ডিত বিষ্ণুশর্মা রচনা করেন।

এই প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে-

“সকলার্থশাস্ত্রসারং জগতি সমালোক‍্য বিষ্ণুশর্মেদম্।
তন্ত্রৈঃ পঞ্চভিরেতচ্চকার সুমনোহরং শাস্ত্রম্।।”

     অর্থাৎ সকল অর্থশাস্ত্রের সারসংকলন করে পন্ডিত বিষ্ণুশর্মা পাঁচটি তন্ত্রে (মিত্রভেদ, মিত্রপ্রাপ্তি,কাকোলূকীয়, লব্ধপ্রণাশ এবং অপরীক্ষিতকারক) এই সুমনোহর কাব্য রচনা করেন।

পঞ্চতন্ত্র পাঁচটি তন্ত্রে রচিত হলেও প্রত্যেকটি তন্ত্র পৃথক পৃথকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মূল রচনা গদ‍্যে লিখিত এবং মাঝে মাঝে উপদেশ মূলক শ্লোক রয়েছে। পঞ্চতন্ত্রের ভাষা সহজ,সরল, বচনভঙ্গী সাবলীল, গল্পগুলিতে কথার ছলে পশু পাখিদের মুখ দিয়ে মানুষের মহত্ব, সততা,  উদারতা, শঠতা, নিষ্ঠুরতা প্রভৃতি চরিত্র ব্যক্ত করা হয়েছে। কাহিনীর বৈচিত্র‍্যে মানব চরিত্র বিশ্লেষণে অসাধারনত্বের ছাপ রেখেছে।

সংস্কৃত গল্প সাহিত্যে হিতোপদেশের স্থান

গল্প সাহিত্যের ইতিহাসে বিষ্ণু শর্মার রচিত পঞ্চতন্ত্রের পরেই নারায়ন শর্মা রচিত হিতোপদেশ স্থান করে নিয়েছে। হিতোপদেশের সূচনায় বলা হয়েছে-

“যন্নবে ভাজনেলগ্নঃ সংস্কারো ন অন‍্যথা ভবেত্।
কথাচ্ছলেন বলানাং নীতিস্তদিহ কথ‍্যতে।।”

পঞ্চতন্ত্রের মূল সুরটি এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। হিতোপদেশ রচিত হয় বঙ্গদেশে। হিতোপদেশের ৪৩ টি গল্পের মধ্যে ২৫ টি গল্প পঞ্চতন্ত্র থেকে নেওয়া হয়েছে। তাই গল্পকার গ্রন্থের প্রথমেই ঋণ স্বীকার করে বলেছেন-

“পঞ্চতন্ত্রাত্তথান‍্যস্মাদ্ গ্রন্থাদাকৃষ‍্য লিখ‍্যতে।”

   হিতোপদেশের চারটি খন্ড- মিত্রলাভ, সুহৃদ্ভেদ, বিগ্রহ এবং সন্ধি। এই ছোট গল্প গুলির রহস্যঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে। যেমন দুর্দান্ত বা মহাবিক্রম নামে সিংহ, মহাতপা নামক মুনি ও মূষিক কথা, ব্রাহ্মণের হটকারিতায় উপকারক নকুলের মৃত্যু, নীল বর্ণ শৃগালের গল্প প্রভৃতি গল্পকারের রচনার গুণে মনোজ্ঞ হয়ে উঠেছে।

সংস্কৃত গল্প সাহিত্যে বেতাল পঞ্চবিংশতির স্থান

২৫টি গল্পের সংকলন বেতাল পঞ্চবিংশতি সংস্কৃত গল্প সাহিত্যের অন্যতম অমূল্য সম্পদ। কথিত আছে এক তান্ত্রিক প্রতিদিন রাজসভায় উপস্থিত হয়ে রাজা বিক্রমাদিত্যকে একটি করে ফল উপহার দিতেন।  সেই ফলের মধ্য থেকে একটি করে রত্ন পাওয়া যেত। তান্ত্রিকের অনুরোধে বিক্রমাদিত্য শ্মশানের কোন বৃক্ষ থেকে একটি শবদেহ আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। সেই শবদেহকে আশ্রয় করে এক পিশাচ বা বেতাল অবস্থান করত। বিক্রমাদিত্য যতবার বৃক্ষ থেকে দোদুল‍্যমান শবদেহকে নীচে নামান বেতাল ততবারই তাকে একটি করে গল্প বলে এবং গল্পে বর্ণিত সমস্যা বা ধাঁধার সমাধান করতে বলে। একে একে বেতাল ২৫টি কাহিনী শুনিয়ে রাজাকে তৎ সম্পর্কিত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। রাজার উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে বেতাল তান্ত্রিকের প্রকৃত উদ্দেশ্য রাজাকে জানালে রাজা শীঘ্রই তান্ত্রিককে বধ করেন।

সংস্কৃত গল্প সাহিত্যে শুকসপ্ততিকথার স্থান

চিন্তামণি ভট্ট রচিত শুকসপ্ততিকথা গল্প সাহিত্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। অবশ্য এই গ্রন্থের পূর্ণ ভদ্র রচিত একটি জৈন সংস্করণ আছে।
মূলত নারীর কপট প্রেম, বিশ্বাস ঘাতকতা প্রভৃতি বহু উপাদানের ভিত্তিতে ৭০ টি গল্পের এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে। কিংবদন্তী অনুসারে শুকের রূপধারী নারদ দেবরাজ ইন্দ্রকে গল্পগুলি বর্ণনা করেছেন। কাহিনী অনুসারে বণিক মদনবিনোদ ও তার পত্নীকে কেন্দ্র করে এই গল্পগুলি রচিত। শুক পাখির কথা অনুযায়ী বণিক মদনবিনোদ ব্যবসার কারণে বিদেশে যাত্রা করলে তার স্ত্রী তার অবর্তমানে অবৈধ মিলনের উদ্দেশ্যে বাহিরে যাওয়ার সময় এই পাখি একটি করে গল্প বলে তাকে নিবৃত্ত করত। এই ভাবে ৭০ টি গল্প বলা শেষ হলে বনিক মদন বিনোদ বাড়ি ফিরে আসে এবং তার স্ত্রীর শূচিতাও রক্ষিত হয়।

উপরিউক্ত গল্প গ্রন্থগুলি ছাড়াও আরো কিছু গল্প পাওয়া যায়। রচনাশৈলী বা বিষয়বস্তু তেমন উপাদেয় নয়। যেমন বিদ্যাপতির পুরুষ পরীক্ষা, রাজশেখর সুরির প্রবন্ধকোষ, মেরুতুঙ্গের প্রবন্ধচিন্তামণি ও বল্লাল সেনের ভোজ প্রবন্ধ প্রভৃতি বহুগল্প সংকলন সংস্কৃত গল্প ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

Leave a Comment