কৌটিল‍্যের অর্থশাস্ত্র মন্ত্রাধিকার অনুসারে রাজলেখের দোষ ও গুণ

কৌটিল‍্যের অর্থশাস্ত্র মন্ত্রাধিকার অনুসারে রাজলেখের দোষ কয়টি ও কী কী? রাজলেখের গুণ কয়টি ও কী কী? বর্ণনা কর। কৌটিল‍্যের অর্থশাস্ত্র মন্ত্রাধিকার – Rajlekh’s Faults and Qualities for B.A. Hons and Pass

অর্থশাস্ত্র মন্ত্রাধিকার অনুসারে রাজলেখের দোষ ও গুণ

রাজলেখের দোষ কয়টি ও কী কী? রাজলেখের গুণ কয়টি ও কী কী? বর্ণনা কর।

রাজলেখ কি?

রাজার বক্তব‍্য বা নির্দেশ লিখিত অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব‍্যাক্তিকে জানানো হয়। এই রাজলেখকেই শাসন বলে।

আচার্য কৌটিল‍্যের মতে, শাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। সেইজন‍্য রাজলেখ রচনাকালে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। অর্থশাস্ত্রকার কৌটিল‍্য তাই শাসনাধিকার প্রকরনে রাজলেখের গুণ এবং দোষ সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন।

রাজলেখের গুণ কয়টি ও কী কী?

আচার্য কৌটিল‍্য রাজলেখের ছয়টি গুণের উল্লেখ করেছেনযেমন- অর্থক্রম,সম্বন্ধ,পরিপূর্ণতা,মাধূর্য,ঔদার্য ও স্পষ্টত্ব।


কৌটিল‍্য তাই বলেছেন-

“অর্থক্রমঃ সম্বন্ধঃ পরিপূর্ণতা,মাধূর্যমৌদার্যং স্পষ্টত্বমিতি লেখসম্পৎ’।

রাজলেখের ছটি গুণ আলোচনা করা হল

১) অর্থক্রমঃ-

গুরুত্ব অনুসারে যথার্থ শব্দ প্রয়োগ করে অর্থের ক্রম রক্ষা করাই হল অর্থক্রম। লেখে বা শাসনে প‍্রথমে মুখ‍্য বা প্রধান বিষয়ের উল্লেখ এবং পরে গৌন বা অপ্রধান বিষয়ের অবতারনা-এরূপ বিষয়বস্তুর ক্রমরক্ষাকে বলে অর্থক্রম।

কৌটিল‍্য বলেছেন-

“তত্র যথাবদনুপূর্বক্রিয়া প‍্রধানস‍্যার্থস‍্য পূর্বমভিনিবেশ ইত‍্যর্থস‍্য ক্রমঃ।’


২) সম্বন্ধ

প্রস্তুত বা প্রকৃত বা প্রকৃত বিষয়ের যাতে উপরোধ বা বাধা না ঘটে, এমনভাবে পরবর্তী বিষয়ের নিরূপন শাসন বা লেখে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব‍্যাপারটিকে বলে সম্বন্ধ।

তাই কৌটিল‍্য বলেছেন-

“প্রস্তুতস‍্যার্থস‍্যানুপরোধাদুত্তরস‍্য বিধানমাসমাপ্তেরিতি সম্বন্ধ।’


৩) পরিপূর্ণতাঃ-

যদি লেখে পদ অর্থ ও অক্ষর সমুহের বাহুল্য না রেখে উদাহরণ সহযোগে বক্তব্য প্রতিপাদন করা এবং সুনির্বাচিত পদ প্রয়োগ করা হয়, তবে যে গুণ হয় তা হল পরিপূর্ণতা।

কৌটিল‍্য বলেছেন-

“অর্থপদাক্ষরাণামন‍্যুনাতিরিক্ততা হেতুদাহরন দৃষ্টান্তেরর্থোপবর্ণনাঅশ্রান্ত পদতেতি পরিপূর্ণতা’।

৪) মাধূর্যঃ-

রাজলেখের সুন্দর ও সুগম অর্থ প্রেরনের জন‍্য শব্দ প্রয়োগের নাম মাধূর্য।

তাই কৌটিল‍্য বলেছেন-

“সুখোপনীত চার্বর্থশব্দাভিধানং মাধুর্যম্’।


৫) ঔদার্যঃ-

রাজলেখকে গ্রাম‍্যতা দোষ বিবর্জিত শব্দ প্রয়োগ করার নাম ঔদার্য। অর্থাৎ, শিষ্টজনের রুচিকর হয় না এমন শব্দ সযত্নে পরিহার করা উচিৎ।

তাই কৌটিল‍্য বলেছেন-

” অগ্রাম‍্য শব্দাভিধানমৌদার্যম্’।


৬) স্পষ্টত্বঃ-

লেখে সুপ্রসিদ্ধ শব্দ প্রয়োগের নাম স্পষ্টত্ব।

অর্থশাস্ত্রকার কৌটিল‍্য বলেছেন-

“প্রতীতশব্দপ্রয়োগঃ স্পষ্টত্বমিতি’।

রাজলেখের দোষ কয়টি ও কী কী?

অর্থশাস্ত্রকার কৌটিল‍্যের মতে দোষ পাঁচ প্রকার।আর শাসন রচনাকালে দোষ গুলি সম্বন্ধে সচেতন হওয়া দরকার এবং সেগুলি যাতে না ঘটে সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। কৌটিল্য বলেছেন-

“অকান্তিঃ ব‍্যাঘাতঃ পুনরূক্তম্ অপশব্দঃ সংপ্লব ইতি লেখদোষাঃ।’

রাজলেখের দোষগুলি নিম্নে ব‍্যাখ‍্যা করা হল-

১) অকান্তিঃ-

রাজলেখটি যদি কালিমাযুক্ত হয়। অর্থাৎ রাজলেখের অন্তর্গত বর্ণগুলি যদি অসমান ও অসুন্দর হয় এবং বর্ণগুলি যদি রংহীন কালিতে লেখা হয়, তবে রাজলেখের যে দোষ ঘটে তার নাম অকান্তি।কৌটিল‍্য বলেছেন-

“তত্র কালপত্রকমচারুবিষমবিরাগাক্ষরত্বমকান্তিঃ’।


২) ব‍্যাঘাতঃ-

রাজলেখের পূর্বের বিষয়ের অর্থের সাথে যদি পরবর্তী বিষয়ের অর্থের সামঞ্জস্য না থাকে তবে যে দোষ ঘটে তার নাম ব্যাঘাত। কৌটিল‍্য বলেছেন-

” পূর্বেন পশ্চিমস‍্যানুপপত্তির্ব‍্যাঘাতঃ।’


৩) পুনরুক্তঃ-

প্রতিটি অনুচ্ছেদে নতুন বিষয়ের উপস্থাপন না করে যদি পুর্বের বিষয়কেই দ্বিতীয় বার উল্লেখ করা হয় তবে যে দোষ ঘটে তার নাম পুনরুক্ত। কৌটিল‍্য বলেছেন-

” উক্তস‍্যাবিশেষেন দ্বিতীয়মুচ্ছারনং পুনরুক্তম্’।

৪) অপশব্দঃ-

রাজলেখের অন্তর্গত পদগুলি যদি ব্যাকরণসিদ্ধ না হয় অর্থাৎ লিঙ্গ,বচন,কারক প্রভৃতির অপপ্রয়োগ হয় তবে যে দোষ ঘটে তার নাম অপশব্দ। কৌটিল‍্য বলেছেন-

“লিঙ্গবচনকালকারকানামন‍্যথাপ্রয়োগোঅপশব্দঃ’।


৫) সংপ্লবঃ-

লেখপত্রে যেখানে বিরাম চিহ্ন থাকা উচিত সেখানে বিরাম চিহ্ন প্রয়োগ না করে আবার যেখানে বিরাম চিহ্ন থাকা উচিত নয় যদি সেখানে প্রয়োগ করা হয় এবং যেখানে অর্থক্রমাদি লেখসমূহের বৈপরীত্য ঘটনা ঘটে তার ফলে যে দোষ হয় তার নাম সংপ্লব। কৌটিল্য বলেছেন-

“অবর্গে বর্গকরনং বর্গে চাবর্গক্রিয়া গুনবিপর্যাসঃ সংপ্লব ইতি’।

Leave a Comment