অর্থশাস্ত্র ( দূতপ্রণিধি ) অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ টীকা ( Important notes according to Arthashastra)

অর্থশাস্ত্র ( দূতপ্রণিধি ) অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ টীকা ( Important notes according to Arthashastra) – ১. কৃত্যপক্ষ ২. পাষ্ণিগ্রাহ ৩. আক্রন্দ ৪. বৈদেহব্যঞ্জন ৫. বিশালাক্ষ ৬. আটবিক ৭. অসগন্ধ ৮. ভারদ্বাজ দ্রোনাচার্য ৯. বাহুদন্ডীপুত্র বা ইন্দ্র

অর্থশাস্ত্র ( দূতপ্রণিধি ) অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ টীকা

১. কৃত্যপক্ষ : (দূতপ্রণিধি:)


রাজা নিজ রাজ্যে ও শত্রুরাজ্যে এমন সব প্রজা আছে যারা কোন না কোন কারনে সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট থাকে। অসন্তুষ্ট প্রজারা সহজবশ্য বলে কৃত্য নামে পরিচিত। যারা অসন্তুষ্ট তারা উক্ত রাজার শত্রু দ্বারা সহজে বশীভ‚ত হয়। এই সমস্ত প্রজাদেরই কৌটিল্য কৃত্যনামে চিহ্নিত করেছেন। আচার্য কৌটিল্য বলেছেন ‘কৃত্য পক্ষোপজাপমবৃত্য গুঢ়প্রানিধানম্’।
ক্রোধ, লোভ, ভয় ও অপমানের জন্য প্রজাবর্গ কৃত্য হয়ে পড়ে। তারা রাজার প্রতি অশ্রদ্ধা হেতু কোন রূপ অনুরাগ না থাকায় দেশ ও রাজার অমঙ্গল সাধনে তাদের বিন্দুমাত্র সংকোচ থাকে না। তারা শত্রুরাজার সহজেই বশীভ‚ত হয়ে দেশ ও রাজার অমঙ্গল করে। কৃত্য প্রজা শত্রুরাজার নাম, দান নীতিতে আকৃষ্ট হয়ে নিজ রাজার ক্ষতি সাধন করতে পারে।
তাই এই রূপ কৃত্য প্রজার প্রতি রাজার সতর্ক দৃষ্টি রাখা কর্তব্য।
…………

২. পাষ্ণিগ্রাহ : (দূতপ্রণিধি 🙂


বিজিগীষু রাজার অব্যবাহত পশ্চাদ্ভাগ যে রাজ্য অবস্থিত রয়েছে সে রাজ্যের রাজাকে পাষির্ণগ্রাহ বলা হয়। এই পার্ষিণগ্রাহ রাজা শত্রুরমিত্র। বিজিসীষুরাজার শত্রুর হিতের জন্য এই রাজা বিজিগীষুর পশ্চাদ্দিক থেকে বিজিগীষুকে আক্রমন করে বলে অর্থাৎ বিজিগীষু রাজার পশ্চাৎদিক থেকে রুদ্ধ করেদেয় বলে একে পা®ির্ষগ্রাহ বলে। পাষির্ণগ্রাহ শত্রুর মিত্র।

৩. আক্রন্দ : (দূতপ্রণিধি)


প্রথম পষির্ণগ্রাহ তার পর বিজিগীষু ………………. মিত্র।
পাষির্ণগ্রাহ রাজ্যের অব্যবহিত পরর্ত্তী রাজ্যের রাজাকে আক্রন্দ বলে। এই আক্রন্দ বিজিগীষু রাজার মিত্র। পাষির্ণগ্রাহকে নিবারনের জন্য বিজিগীষু রাজা একে আহŸান করে থাকেন বলেই একে আক্রন্দ বলে।

বৈদেহব্যঞ্জন :দূতপ্রণিধি


রাজা গুপ্তচরদের মাধ্যমেই স্বারাজ্যের ও পররাজ্যে সর্ববিধ ব্যাপারে জানতে পারে। গুপ্তচরদের নানা ছদ্মবেশ ও বৃত্তি ধারন করতে হয়। সেই অনুসারে অর্থশাস্ত্রে তাদের পাঁচ শ্রেনীর মধ্যে বৈদেহব্যঞ্জন এক প্রকার। বৈদেহক মানে ব্যবমায়ী এবং ব্যঞ্জন মানে ছল বা ছদ্ম। যে সকল ব্যক্তি গুপ্তচর ব্যবসায়ী সেজে ব্যবসার ছলে খবর সংগ্রহ করে রাজাকে জানায়, তাদের বলা হয় বৈদেহকব্যঞ্জন শ্রেনীর গুপ্তচর। এরা বানিজ্য কর্মের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে নিজস্ব কর্মসম্পাদন করবে। ধনাদি দ্বারা প্রব্রজিতগনের অন্নবস্ত্র ও বাসন্থানাদির ব্যবস্থা করবে। দূত পররাজ্যে গিয়ে বৈদেহ ব্যঞ্জনদের কাছ হতে সেই রাজ্যের খবরাখবর সংগ্রহ করবেন। অর্থশাস্ত্রকার কৌটিল্য বৈদেহকব্যঞ্জন গূঢ় পুরুষের সংজ্ঞা নিরূপন করতে গিয়ে বলেছেন
‘‘বাণিজকো বৃত্তিক্ষীণ: প্রজ্ঞাশৌচযুক্ত: বৈদেহকব্যঞ্জন:।
স বনিক্ কর্মপ্রদিষ্টায়াং ভ‚মাবিতি সমানং পূর্বেন’’।।

আসার : বিজিগীষুর অব্যবহিত পশ্চাদ ভাগের রাজ্যের রাজাকে বলা হয় পাষির্ণগ্রাহ। তাঁকে বিজিগীষু রাজার শত্রু বলে গন্য করা হয়। পাষির্ণগ্রাহের অব্যবহিত পিছনের রাজ্যের রাজাকে বলা হত আক্রন্দ ইহা শত্রুর শত্রু বলে বিজিগীষুর মিত্র। আক্রন্দরাজ্যের পরবর্তী রাজ্যে পাষির্ণগ্রাহাসার বলা হয়। এই রাজা শত্রুর মিত্রের মিত্র। আসার হল পাষির্ণগ্রাহের মিত্রভ‚ত রাজা। আসার মানে বন্ধু বা সহায়ক। ইহা পাষির্ণগ্রাহের সহায়ক
……………………

বিশালাক্ষ :দূতপ্রণিধি


ভগবান বিশালাক্ষ মহাদেব ব্রহ্মার ‘পৈতামহতন্ত্র’ গ্রন্থের সার সংকলন করে দশ হাজার অধ্যায় যুক্ত একখানি তন্ত্র প্রনয়ন করেন। এই তন্ত্রের নাম বৈশালাক্ষ তন্ত্র। এই বৈশালাক্ষ তন্ত্র থেক কিছু কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে প্রদর্শন করেছেন।
অর্থশাস্ত্রকার কৌটিল্য দেখিয়েছেন যে ভারদ্বাজ বা দ্রোনাচার্য মনে করেন রাজার সহপাঠীদের মধ্য থেকেই অমাত্যগনকে নিযুক্ত করবেন। কিছু আচার্য বিশালাক্ষ এমত পোষন করেন না। কার তাঁর মতে এই মহাধ্যায়ী অমাত্যগন রাজার সঙ্গে একত্র ক্রীড়া করতেন বলে তাকে অবহেলা করতে পারেন। অতএব রাজা তাঁদেরই অমাত্য নিযুক্ত করবেন যাঁর গুপ্ত বিষয়ে রাজার সঙ্গে সমান ধর্ম বিশিষ্ট। কারন তাঁর শীল অর্থাৎ গুন এবং ব্যসন অর্থাৎ দোষ বিষয়ে রারজারই সমান। রাজা তাঁদের সবধর্ম অবগত আছেন বলে তাঁরা স্বকার্য সম্পাদনে কোন অপরাধ করবেন না।

৬. আটবিক :দূতপ্রণিধি


‘অটবী’ মানে অবন্য। প্রাচীন ভারতে অনেক অরন্যাকন ছিল। সেখানে অনেক অরন্যজাতি বাস করত। তারা ছিল ভাল সাহসী যোদ্ধা এবং প্রায় স্বাধীন। তাদের দলপতি বা শাসন কর্তাকে বলা হত আটবিক। নিজের রাজ্যের আটবিকদের নিজের অনুগত রাখার জন্য অর্থশাস্ত্রে রাজাকে সদা সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সেইসাথে অন্য রাজার অথবা দুই রাজ্যের মধ্যবর্তী অরন্যাঞ্চলের আর্যবিকদের সাথেও সুসম্পর্ক স্থাপন করতে ও বজায় রাখতে বলা হয়েছে। এর ব্যবস্থা করা রারজদূতের অন্যতম কর্তব্য।

৭. অসগন্ধ : দূতপ্রণিধি


সগন্ধ মনে পরিচিত এবং অসগন্ধ মানে অপরিচিত। সকল প্রনীই সাধারনত: সজাতীয় পরিচিত প্রানীদের সঙ্গে থাকতে চায়, অপরিচিতদের সঙ্গে থাকতে চায় না। গোরুরাও কোনভাবে অপরিচিত গরুদের মধে চলে গেলে তাদের ছেড়ে আবার পরিচিত গোরুদের দলেই ফিরে আসে দেখা যায়। অর্থশাস্ত্রের প্রাচীন আচার্য কৌনপদন্ত বা ভীষ্মের মতে তাই পিতৃ পিতামহাদিক্রমে যাঁরা কোন রাজবংশের অমাত্য রূপে কাজ করেছেন সেই বংশের রাজার উচিত তাঁদের তাঁর অমাত্য পদে নিয়োগ করা । কারন, রাজার সঙ্গে তাদের বংশানুক্রমিক পরিচয় থাকায় রাজা কখনো তাঁদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেও তাঁরা রাজাকে ছেড়ে শত্রু পক্ষে চলে যাবেন না।

৮. ভারদ্বাজ দ্রোনাচার্য : দূতপ্রণিধি


আচার্য কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে অমাত্যগনের নিয়োগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ভারদ্বাজের মত গ্রহন করেছেন। ভারদ্বাজের মতে রাজা সহপাঠীদের মধ্য থেকেই অমাত্যগনকে নিযুক্ত করবেন, কেননা তাঁদের শৌচ অর্থাৎ মনের শুদ্ধি ও কার্যসামর্থ্য সম্বন্ধে তিনি সব অবগত হয়ে থাকবেন। সে কারনে তাঁরা রাজার বিশ্বাস যোগ্যও হতে পারবেন। কিন্তু আচার্য বিশালাক্ষ এই মত খন্ডন করেন।

৯. বাহুদন্ডীপুত্র বা ইন্দ্র : দূতপ্রণিধি


ভগবান ইন্দ্র বৈশালাক্ষ তন্ত্রের সার সংগ্রহকরে বাহুদন্ডকতন্ত্র নামে এক তন্ত্র রচনা করেন। কৌটিল্য প্রনীত অর্থশাস্ত্রে এ তন্ত্র থেকে যে সকল সিদ্ধান্ত সংগৃহীত হয়েছে, সে সমস্ত স্থলে ইন্দ্রকে ‘বাহুদন্ডীপুত্র’ বলে নির্দেশ করা হয়েছে। দেবরাজ ইন্দ্রের মাতার নাম বাহুদন্ডী। সেজন্য ইন্দ্রকে ‘বাহুদন্ডীপুত্র’ বলা হয়েছে।

  কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র নামক গ্রন্থে বাহুদন্ডীপুত্র বা ইন্দ্রের মত গ্রহন করেছেন। এখানে যাতব্যাধি মনে করেন রাজার পক্ষে নীতি শাস্ত্রবিদ্ নতুন ব্যক্তি গনকে অমাত্যপদে নিযুক্ত করা উচিত। কিন্তু এমত আচার্য বাহুদন্ডীপুত্র বা ইন্দ্র পোষন করেন না। তাঁর মতে কেবল নীতিশাস্ত্রে প্রধান ব্যক্তি, শাস্ত্রার্যের অনুষ্ঠান কর্মে অপরিচিত থাকায়, সকল কর্মেই বিষাদগ্রস্ত থবেন। অর্থাৎ কৃতকার্য হবেন না। সূতরাং রাজা এমন ব্যক্তিকেই অমাত্য নিযুক্ত করবেন যিনি সদ্বংশজাত, প্রজ্ঞাবান, পূত চরিত্র, ধীর ও প্রভুর প্রতি ভক্তিমান, কারন গুনের প্রাধান্যই সর্বতোভাবে প্রয়োজনীয়। 


আকার


ইঙ্গি ও আকার উভয়ই মানুষের মনে অভিপ্রায় সূচক লক্ষন। বাইরের জগতে ভালো মন্দ, প্রিয় অপ্রিয়, সুখ দুঃখ, অনুরাগ বিরাগ প্রভৃতি যখন মানুষের মনে মুখ্য অনুভ‚তির সংস্পর্শে এসে জটিল আবর্তর সৃষ্টি করে মানুষ তখন তার বর্হিপ্রকাশের জন্য ইঙ্গিত কিংম্বা আকারের সাহায্য গ্রহন করে।
কৌটিল্য আকার সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন আকৃতি গ্রহনম্ আকার:। মানষিক ভাব প্রকাশের জন্য বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের যে বাহ্যিক আকৃতি দেখানো হয় তাকে বলে আকার। এটি অস্বাভাবিক প্রচেষ্টা নয় বরং স্বাভাবিক আকারের ক্ষেত্রে মুখ, চোখ, ভ্রু, ঠোঁট প্রভৃতি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মাধ্যমে মনের আনন্দ দুঃখ রাগ ইত্যাদি প্রকাশ করা হয়। আকার প্রকাশের জন্য অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানের দরকার হয় না। এখান মানসিক অনুভ‚তিগুলির বর্হিপ্রকাশের মাধ্যম রূপে শুধুমাত্র অঙ্গ প্রত্যঙ্গের প্রয়োজন হয়। অবশ্য কখনো কখনো কোন কোন ব্যক্তি কার্য সিদ্ধির জন্য কৃত্রিম আকারের প্রয়োগ করে।

Leave a Comment