অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকে প্রকৃতির ভূমিকা আলোচনা কর

‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটকে প্রকৃতির ভূমিকা আলোচনা কর। অথবা, কন্বের আশ্রম থেকে শকুন্তলার বিদায়দৃশ‍্যের বর্ণনা প্রসঙ্গে প্রকৃতির গুরুত্ব বর্ণনা কর।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটকে প্রকৃতির ভূমিকা আলোচনা কর

উ:- সংস্কৃত কবিদের কাছে প্রকৃতি এক বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। মহাকবি কালিদাস প্রকৃতির কবি। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় ও মধুর সম্পর্ক। মহাকবি কালিদাস ছাড়া অন‍্য কোনো কবি স্থাপন করতে পারেননি। কালিদাসের সকল সাহিত‍্যেই দেখা যায় এক অনুপম প্রকৃতিপ্রীতি। তাঁর রচিত ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‘ নাটকে প্রকৃতির সাথে মানুষের যে আত্মীয়তার সম্বন্ধ দেখা যায়, তা বিশ্ব সাহিত‍্যের কোথাও মিলে না।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকে প্রকৃতিকে স্বজীবতা দান করে কালিদাস বিশ্ব খ‍্যাতি লাভ করেছেন। কবির লেখনীর যাদুস্পর্শে প্রকৃতির চেতন-অচেতন সবকিছুই যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এই নাটকে অন‍্যান‍্য পাত্র-পাত্রীদের মতোই প্রকৃতিও যেন একটা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। শকুন্তলা, দুষ‍্যন্ত, কণ্ব, অনসূয়া, প্রিয়ংবদা – এদের মতোই প্রকৃতিও যেন একটি বিশেষ চরিত্র।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের সাতটি অঙ্কেই প্রকৃতির বর্ণনায় সমৃদ্ধ।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটকে প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় অঙ্কে প্রকৃতি

প্রথম -তৃতীয় অঙ্কে দেখা যায় শকুন্তলা তপোবন কন‍্যা। তপোবনের বৃক্ষ, প্রাণীকূল তার কাছে বড়ই আদরের। আশ্রমের চারাগাছগুলির প্রতি শকুন্তলার ছিল অকৃত্রিম স্নেহ। তাই সে বলেছে-

” অস্তি মে সোদরস্নেহেঅপি এতেষু “।

একটি নবমল্লিকা লতাকে আদর করে শকুন্তলা তার নাম রেখেছিল বনজ‍্যোৎস্না। আশ্রমের বৃক্ষগুলিতে জলসেচন না করে শকুন্তলা কখনও জলপান করত না, আশ্রমবাসী কখনো তাদের নতুন পাতা ছিঁড়ত না-

” পাতুং ন প্রথমং ব‍্যবস‍্যতি জলং যুস্মাস্বপীতেষু যা
নাদত্তে প্রিয়মণ্ডনাপি ভবতাং স্নেহেন যা পল্লবম্।।”

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটকে চতুর্থ অঙ্কে প্রকৃতি

চতুর্থ অঙ্কে মহাকবি কালিদাস প্রকৃতির তরুলতা, পশুপক্ষী সবকিছুর মানব সমাজের এক আত্মীক যোগসূত্র স্থাপন করেছেন।

পতিগৃহে যাত্রাকালে তপোবন প্রকৃতিও অকৃপন হস্তে নানা অলঙ্কার শকুন্তলাকে দান করেছে। তাই আসন্ন বিচ্ছেদে শকুন্তলা যেমন কাতর তেমনি তপোবনের পশুপাখি, গাছ-পালা সকলেরই যেন একই দশা-

” উদগলিতদর্ভকবলা মৃগাঃ পরিত‍্যক্তনর্তনাময়ূরাঃ
অপসৃতপাণ্ডুপত্রা মুঞ্চন্ড‍্যশ্রূনীবলতাঃ।।”

বনবাসী হরিণ শিশুটিও তার আঁচল ধরে টেনেছে। পতিগৃহে যাওয়ার সময় আশ্রমের তরুলতা ও পশুপক্ষীদের পরিচর্যার ভার শকুন্তলা ন্যস্ত করেছে প্রিয়সখী ও প্রিয়ংবদার উপর।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটকে পঞ্চম অঙ্কে প্রকৃতি

পঞ্চম অঙ্কে হস্তিনাপুরের নগর পরিবেশের বর্ণনাও কবির দৃষ্টি এড়াইনি। হরিণ শিশুটিকে জলপান করাবার গল্প বলেই শকুন্তলা দুষ‍্যন্তের স্মৃতি জাগানোর চেষ্টা করেছে।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটকে ষষ্ঠ অঙ্কে প্রকৃতি

ষষ্ঠ অঙ্কে দেখা যায় শকুন্তলার বিরহে বসন্ত উৎসব নিষিদ্ধ করায় বসন্তের কোকিলও নীরব থেকেছে।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটকে সপ্তম অঙ্কে প্রকৃতি

সপ্তম অঙ্কে মারীচ মুনির আশ্রমে এক অপরূপ স্বর্গীয় প্রাকৃতিক পরিবেশই সপুত্র শকুন্তলার সঙ্গে রাজা দুষ‍্যন্তের মিলন ঘটেছে।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটকে প্রকৃতির মূল্যায়ন

পরিশেষে বলা যায় যে, মহাকবি কালিদাস তাঁর ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটকে অচেতন প্রকৃতিকেও যেন সচেতন করে তুলেছে। মানবের সাথে প্রকৃতির এমন আত্মিক সম্পর্ক বিশ্ব সাহিত‍্যের ইতিহাসে দুর্লভ।

Leave a Comment