কিরাতার্জুনীয়ম্ অনুসারে যুধিষ্ঠিরের নিকট বনেচরের বক্তব্য সংক্ষেপে বর্ণনা করো

ভারবি রচিত কিরাতার্জুনীয়ম্ মহাকাব্য অনুসারে যুধিষ্ঠিরের নিকট বনেচরের বক্তব্য সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। অথবা বনেচরের বক্তব্যের মাধ্যমে দুর্যোধনের রাজ্য শাসন পদ্ধতি আলোচনা করো।

কিরাতার্জুনীয়ম্ অনুসারে যুধিষ্ঠিরের নিকট বনেচরের বক্তব্য সংক্ষেপে বর্ণনা করো।

অথবা

কিরাতার্জুনীয়ম্ অনুসারে বনেচরের বক্তব্যের মাধ্যমে দুর্যোধনের রাজ্য শাসন পদ্ধতি আলোচনা করো।

ভূমিকা:-

কালিদাস উত্তর যুগের সাহিত্য গগনে প্রকাশিত যে উজ্জ্বল নক্ষত্র তাঁর নাম ভারবি। অষ্টাদশ সর্গে কিরাতার্জুনীয়ম্ রচনা করে মহাকবি ভারবি লোকাত্রয় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কিরাতার্জুনীয়ম্ মহাকাব্যের প্রথম সর্গে নিযুক্ত ব্রহ্মচারী বেশধারী বনেচর বা কিরাতের উক্তি শ্লোকাকারে নিবদ্ধ আছে। কিরাতের উক্তির মাধ্যমে দুর্যোধনের রাজ্য শাসন পদ্ধতি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তারেই সংক্ষিপ্তসার নিম্নে বর্ণিত হল-


পূর্বপ্রসঙ্গ:-

কপট পাশা খেলায় পরাজিত রাজ্যহারা যুধিষ্ঠির দ্বৈত বনে বাস করার সময় দুর্যোধনের রাজ্য শাসন পদ্ধতি জানার জন্য ব্রহ্মচারী বেশধারী বনেচর বা কিরাতকে দূত হিসাবে হস্তিনাপুরে প্রেরণ করেছিলেন।সেই বনেচর দুর্যোধনের রাজ্য শাসন পদ্ধতি ও প্রজাদের প্রতি অনুরাগ জেনে যুধিষ্ঠিরের নিকট উপস্থিত হয়েছিলেন। বনেচর বা কিরাত ফিরে এসে প্রথমে সৌজন্য প্রদর্শনপূর্বক অপ্রিয় ভাষণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে শোভন শব্দ বিশিষ্ট নিশ্চিত অর্থযুক্ত বাক‍্যগুলি বলেছিলেন।

বনেচরের ক্ষমাপ্রার্থনা:-

বনেচর প্রথমে বললেন চার চক্ষু প্রভুদের কখনও কর্মে নিযুক্ত রাজ কর্মচারীদের প্রতারণা করা উচিত নয়।অতএব তার কথা প্রিয় হোক বা  অপ্রিয় হোক যুধিষ্ঠিরের ক্ষমা করা কর্তব্য। কেননা-

“হিতং মনোহারি চ দুর্লভং”।


        আবার বলেছেন, যে রাজাকে সঠিক উপদেশ দেয় না তিনি কিংসখা এবং যে প্রভু হিতষীর নিকট সৎ উপদেশ শোনেন না তিনি কিংপ্রভু।


যুধিষ্ঠিরের মহিমা:-

বনচরের মতে যুধিষ্ঠিরের মতো ব্যক্তির প্রভাবে নিগূঢ় রাজনীতি অর্থাৎ শত্রুদের গুপ্তনীতি প্রয়োগ বিধি সম্বন্ধে জানতে পেরেছে।


দুর্যোধনের আশঙ্কা:-

দূর্যোধন রাজসিংহাসনে আসীন হলেও বনবাসী যুধিষ্ঠিরের নিকট পরাজয় আশঙ্কা করে। তাই সে কপট পাশাখেলা দ্বারা বিজিত রাজ্যকে নীতির দ্বারা জয় করতে চেষ্টা করছেন। কারণ তিনি জানতেন ছলনার মাধ্যমে জয় করা রাজ্য আসলে তার নয়। তাই প্রজাদের মন জয় করতে না পারলে রাজ্যে স্থায়িত্ব সম্ভব নয়।


দুর্যোধনের রাজ‍্যশাসনপদ্ধতি:-

দূর্যোধন ষড়রিপুকে জয় করে মনু কর্তৃক নির্দিষ্ট পথে রাজ্য শাসন করেছেন। তিনি উপায় চতুষ্টয়কে সুন্দর ভাবে প্রয়োগ করেছেন। তিনি সামনীতির দ্বারা প্রজাকে বশীভূত করে রাখতেন। তার সামনীতি কখনোই দান বর্জিত ছিল না।অর্থাৎ যার যা প্রাপ্য তার থেকে অধিক দান করে বশীভূত করে রাখতেন। এছাড়া তিনি ভৃত্যগণকে প্রিয় বন্ধুর মতো এবং বন্ধুদিগকে আত্মীয়দের মতো সমান সম্মান দেখান। আত্মীয়গনের সাথে এমন ব্যবহার করেন যেন তাদেরই রাজত্ব। এইভাবে সকলকে সন্তুষ্ট রাখতেন।


 দুর্যোধন ত্রিবর্গকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতেন। যাতে তারা পরস্পর বিরোধীতা না করে প্রচুর অর্থ সম্পদ প্রাপ্ত হতেন।
দুর্যোধন ক্রোধের বশবর্তী না হয়ে রাজ্যকে ধর্ম বিপ্লব দমন করতেন। এছাড়া শত্রু হোক বা পুত্র হোক অন্যায়কারীর ওপর সমানভাবে দন্ড প্রয়োগ করতেন। প্রজা কল্যাণের জন্য তিনি কুরুদেশে জলসেচের ব্যবস্থা করেন। ফলে কুরুজনপদ শস‍্য সমৃদ্ধ হয়েছে অর্থাৎ বসুন্ধরা তাকে প্রচুর সম্পদ দান করত।

দুর্যোধনের কর্ম ত‍ৎপরতা:-

দুর্যোধনের সৈন্যগণ তার কার্যসম্পাদনে প্রাণ ত্যাগ করতে প্রস্তুত। কারণ তারা দুর্যোধন কর্তৃক প্রচুর অর্থ দ্বারা সম্পাদিত। তিনি গুপ্তচর দ্বারা প্রতিবেশী রাজাদের কার্যকলাপ পূর্বেই জেনে নিতেন। ফলে অস্ত্র ধারণ না করে গুনের মাধ্যমে তাদের বশীভূত করতেন।


বনেচরের মত:-

দুর্যোধনের রাজ্য শাসন পদ্ধতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করে বনেচর বললেন যে রাজ সিংহাসনে আসীন হলেও যুধিষ্ঠিরের নাম উচ্চারিত হলে এবং অর্জুনের পরাক্রম স্মরণ করে। সে সর্বদা যন্ত্রণা ভোগ করেন। এরপর বনেচর বললেন দুর্যোধনের প্রতি শীঘ্রই ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। কারণ চরেরা কেবল সংবাদ সংগ্রহ করে কিন্তু, কর্তব্য নির্দেশ করতে পারে না-

“প্রবৃতিসারাঃ খলু সাদৃশাংগিরঃ”।


উপসংহার:-

এভাবে শোভন বাক্যে বনেচর দুর্যোধনের রাজ্য শাসন পদ্ধতি বর্ণনা করে এবং যুধিষ্ঠিরকে কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে  উপযুক্ত পারিশ্রমিক নিয়ে চলে গেলেন।

আরো পড়ুন

কিরাতার্জুনীয়ম্ মহাকাব্যের বনপর্ব হতে ছোট প্রশ্ন

Leave a Comment