বনগতা গুহা গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো

উচ্চ মাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণী সংস্কৃত হতে ‘বনগতা গুহা’ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করা হল ।

বনগতা গুহা গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার

ভূমিকা :

লেখক তাঁর কাহিনি বা গল্প রচনা বা অনুবাদ যাইহোক না কেন তিনি কতটা দক্ষ তা বিচার করতে হলে প্রথমেই বিচার্য বিষয় হল নামকরণ। প্রখ্যাত ইংরেজ লেখক শেকসপিয়র মতে নামে কি আসে যায়। তিনি বলেছেন—A rose is a rose what even be it named’ অর্থাৎ গোলাপকে যে নামে ডাকা হোক না কেন সে গোলাপ। আধুনিককালে পিতৃ-মাতৃস্নেহের আবেগ মিশিয়ে কানা ছেলেরও নাম রাখা হয়, পদ্মলোচন।

নামকরণের বিষয়

বাস্তবক্ষেত্রে ব্যক্তির নামকরণ আর কাব্যের বা গল্পের, অনূদিত গল্পের নামকরণ এক বিষয় নয়। কাব্য বা সাহিত্যের নামকরণ করা হয় সাধারণত চারটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে—

  • (ক) গল্পের প্রধান চরিত্রকে অবলম্বন করে,
  • (খ) মূল বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করে,
  • (গ) ব্যঞ্ছনাভিত্তিক নামকরণ এবং
  • (ঘ) ভৌগোলিক পরিবেশ অবলম্বন করে নামকরণ।

সাধারণতঃ মুখ্য বা কেন্দ্রীয়চরিত্র বা কোনো বিশেষ অর্থবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো রচনার নামকরণ কর হয়। সাহিত্যদর্পণকার বিশ্বনাথ এ প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘নাম কার্যং নাটকস্য গর্ভিতার্থপ্রকাশকম। যাতে কোনো রচনা অন্তর্নিহিত অর্থ প্রকাশ পায় বা আখ্যানের মূল বক্তব্য প্রকাশিত হয়, এরূপ কোনো ঘটনার উপর নির্ভর করে রচনার নামকরণ করা হবে। সেই হিসাবে ‘বনগতাগুহা’ গদ্যাংশের নামটি বিশেষ অর্থবহ। বনগতা কথাটির অর্থ বনস্থিত অর্থাৎ বনে আছে এমন গুহা। ওই গুহাটিকে অবলম্বন করেই ঘটনাটি বিস্তারিত হয়েছে।

`বনগতা গুহা’ গল্পটিতে দ্বিতীয় ধারার নামকরণের রীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু বনগতা গুহা ‘বনগুহা’ .ই রকম নামকরণও হতে পারত। এবার গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করার আগে বিষয়বস্তুর দিকে একবার নজর দেওয়া যেতে পারে

বনগতা গুহা শীর্ষক পাঠ্যাংশটি প্রকৃতপক্ষে ‘চোরচত্বারিংশী কথা’ নামক সংস্কৃত গল্পগ্রন্থ থেকে নেওয়া। শ্রীগোবিন্দকৃয় মোদক বিশ্বসাহিত্যের সুবিখ্যাত আরবি গল্পগ্রন্থ আরব্য রজনির এক জনপ্রিয় গল্প “আলিবাবা ও চল্লিশ চোর”-এর সংস্কৃতে অনুবাদ করে সমগ্র গল্পের নামকরণ করেন – ‘চোরচত্বারিংশী কথা’। এই গল্পের প্রথম অংশ আমাদের পাঠ্য। এর নামকরণ করা হয়েছে – “বনগতা গুহা”। বনের মধ্যে অবস্থিত গুহা = বনগতা গুহা। পাঠ্যাংশের কাহিনি বিশ্লেষণ করে বলা যায় – নামকরণ গল্পের কাহিনি অনুসারে হয়েছে। তাই এই নামকরণ বিষয়ানুগ বলা যায়।

কাহিনি বিশ্লেষণ :

গল্পটি সংক্ষেপে এইরূপ পারসিকদের নগরে অলিপর্বা ও কশ্যপ নামে দুই সহোদরের মধ্যে অলিপর্বা ছিল দরিদ্র এবং দরিদ্রের কন্যাকে বিবাহ করে কষ্টে সংসার চালাত, কিন্তু কশ্যপ অত্যন্ত ধনীর কন্যাকে বিবাহ করে বিলাসব্যসনে কাল কাটাত।

“বনগতা গুহা” পাঠ্যাংশের কাহিনি অলিপর্বা ও বনস্থিত গৃহাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। অলিপৰা এই পাঠ্যাংশের নায়ক। সে এক দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ। তার পরিবারে আছে স্ত্রী ও এক পুত্র। প্রতিদিন বনে গিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে সেই কাঠ বাজারে বিক্রি করে অতিকষ্টে সংসার চলে। সৎপথে বাঁচতে গিয়ে তাকে জীবনের মায়া ত্যাগ করে গভীর বনে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে হয়।

এমন-ই একদিন সে গভীর বনে এক গুহার সন্ধান পেয়েছিল। সেই গুহার মধ্যে ছিল চল্লিশ চোরের সংগৃহীত লুট করা মূল্যবান রত্নসমূহ। একদিকে কৌতূহল এবং সাহস, অন্যদিকে প্রাণসংশয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দস্যু সর্দারের উচ্চারিত মন্ত্র মুখস্থ ও পাঠ করে বনে অবস্থিত বা বনের মধ্যে গিয়েছে এমন এক রত্নভাণ্ডারপূর্ণ গুহায় প্রবেশ করে। সেখানে রাশি রাশি সোনা-রুপা মূল্যবান রত্নের ভাণ্ডার দেখে সে বিস্মিত হয়। পরে ভেবেচিন্তে কয়েক বস্তা রত্ন গাধার পিঠে করে নগরে পৌঁছোয়। এইভাবে দেখা যাচ্ছে, এই গল্পে বনের মধ্যস্থিত একটি গুহা উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে।

মূল্যায়ন :

আলোচ্য ‘বনগতা গুহা’ বনের গুহা গল্পটি প্রথম ভাগ পাঠ করে জানতে পারি যে, বনের গুহাকে কেন্দ্র করেই চোর থেকে অলিপর্বা সকলের কার্যকলাপ বর্ণিত হয়েছে বলে অনুবাদকর্তা নিজেই এই ভাগের নাম করেছেন ‘বনগতা গুহা’, যা গভীর অর্থবহ হয়ে ওঠে। সুতরাং, সেদিক দিয়ে দেখলে গল্পটির নামকরণ সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত ও সার্থক হয়েছে বলে মনে হয়। পাঠ্যাংশের কাহিনি বিশ্লেষণ করে বলা যায় “বনগতা গুহা” নামকরণ সবদিক দিয়ে সার্থক হয়েছে।

Leave a Comment