তার্কিক সম্মত অসৎকার্যবাদ খন্ডন করে সৎকার্যবাদ সাংখ‍্যকারিকা অনুসারে ব্যাখ্যা

তার্কিক সম্মত অসৎকার্যবাদ খন্ডন করে সৎকার্যবাদ সাংখ‍্যকারিকা অনুসারে ব্যাখ্যা করো।

তার্কিক সম্মত অসৎকার্যবাদ খন্ডন করে সৎকার্যবাদ সাংখ‍্যকারিকা অনুসারে ব্যাখ্যা


ভূমিকা:- জগতের মূল কারণ কি? সেটা সৎ না অসৎ? তা নিয়ে বিভিন্ন আচার্যগণ পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেন।

  • ১) অসৎকারণবাদী মাধ্যমিক বৌদ্ধগণ বলেন, জগতের মূল কারণটি অসৎ (শূণ‍্য)। অসৎ থেকেই সাংবৃতিক জগতের জন্ম হয়।
  • ২) সৎকারণবাদী অদ্বৈত বৈদান্তিকগণ বলেন, এক পরমার্থ সৎ কারণ থেকে অবিদ্যাকল্পিত মিথ্যা জগতের সৃষ্টি হয়। এই মতে, কার্য সৎও নয়, অসৎ নয়। কার্য সদসদ্বিলক্ষণ অনির্বচনীয়।
  • ৩) অসৎকার্যবাদী নৈয়ায়িকগন মনে করেন, সৎ কারণ থেকে অসৎ কার্যের উৎপত্তি হয়। উৎপত্তির পূর্বে কার্য ছিলনা। উৎপত্তির পর কার্য সৎরূপে সিদ্ধ হয়।


সেখানে সাংখ্য শাস্ত্রকারগণের মন্তব্য, সৎ কারণ থেকে সৎ কার্যেরই উৎপত্তি হয়। অর্থাৎ কার্য উৎপত্তির পরে যেমন সৎ তেমনি উৎপত্তির পূর্বেও সৎ। কার্য উৎপত্তির পূর্বে সূক্ষরূপে কারণ শরীরে বিদ্যমান থাকে, আর পরে স্থূলরূপে আবির্ভূত হয়।

সৎকার্যবাদ প্রতিপাদনে যুক্তিসমূহ

সাংখ‍্যাচার্যগণ উক্ত বিরোধী মতগুলির সিদ্ধান্তরূপে সৎকার্যবাদকে প্রতিবাদন করার জন্য পাঁচটি যুক্তি দেখিয়েছেন-

“অসদকরণাদুপাদানগ্রহনাৎ সর্বসম্ভবাভাবাৎ।
শক্তস‍্য শক‍্যকরনাৎ কারনভাবাচ্চ সৎকার্য‍্যম্।।”

i) অসৎকরনাৎ

সৎকার্যবাদ পক্ষে সাংখ‍্য সম্প্রদায়ের প্রথম যুক্তি এইযে, কার্য যদি অসৎ হয় তাহলে কার্যের উৎপত্তি কখনো সম্ভব হবে না। যেমন- অসৎ গগন কুসুমকে কেউ কখনো সৃষ্টি করতে পারে না।

সুতরাং উৎপত্তির পূর্বে কার্যকে সৎ বলেই মানতে হবে। আর বীজ ও মৃত্তিকাদির বিনাশের পরেই অঙ্কুর ও ঘটাদির উৎপত্তি হতে দেখা যায়। সুতরাং অসৎ থেকেই সৎ কার্যের উৎপত্তি হয়। মাধ্যমিক বৌদ্ধগনের একথা সমীচীন নয়। কেননা এসকল স্থানে বীজের নাশটা অঙ্কুরের কারণ নয় এবং মৃত্তিকার নাশটাৎ ঘটের কারণ নয়। কিন্তু বীজাদির অবয়বরূপ ভাবটিই অঙ্কুরাদির উপাদান কারণ।

অঙ্কুরাদি কার্যের অব্যক্ত অবস্থাই হল বীজাদি। সুতরাং কারণ ব্যাপারের পূর্বেই কার্যটি বিদ্যমান থাকে। কারণ ব্যাপারের পূর্বে কার্যটি অসৎ হলে কেউ তা করতে সমর্থ হত না। কারণ ব্যাপারের পূর্বে কার্যটি যদি অসৎ হলে কেউ তা করতে সমর্থ হত না। সত সহস্র শিল্পী মিলিত হলেও নীলকে পীত করতে পারবে না।

“ন হি নীলং শিল্পিসহস্রেনাপি পীতং কর্ত্তুং শক‍্যতে”।

যদিও অসৎ কারণ থেকে সৎ কার্যের উৎপত্তি হত, তাহলে যেটি যেখানে থাকে না সেটিও সেখানে জন্মাতে পারত। মৃত্তিকা থেকে ঘট না হয়ে বীজ থেকেও ঘট হতে পারত। কিন্তু তা কখনো হয় না। সুতরাং শূন্যবাদীদের অসৎ কারণবাদ পর্যুদস্ত হয় ও সাংখ‍্যের সৎকার্যবাদই উৎপন্ন হয়।

ii) উপাদানগ্রহণাৎ

‘ সৎকার্যবাদ’ পক্ষে সাংখ‍্যবিদগনের দ্বিতীয় যুক্তি উপাদান গ্রহণ। উপাদান শব্দের অর্থ প্রকৃতি কারণ। গ্রহণ শব্দের অর্থ সম্বন্ধ। যে কারণ যে কার্যের সঙ্গে নিহত সম্বন্ধযুক্ত সেই কারণেই সেই কার্যের জনক হতে পারে। অন্যথা মৃত্তিকা থেকে বস্ত্রের উৎপত্তি এবং তন্তু থেকে ঘটের উৎপত্তি হয় না কেন? উৎপত্তির পূর্ব থেকে কার্যের সঙ্গে কারণের সম্বন্ধ স্বীকার করলে আর ওই আপত্তি উঠেনা। বস্তুতপক্ষে যে কারণের সঙ্গে যে কার্যের সম্বন্ধ আছে সেই কারণ থেকেই সেই কার্য উৎপন্ন হতে পারে। ঘটের সঙ্গে মৃত্তিকার সম্বন্ধ আছে, কিন্তু বস্ত্রের সঙ্গে তার সম্বন্ধ নেই। তাই মৃত্তিকা থেকে ঘটের উৎপত্তি হয়, বস্ত্রের উৎপত্তি হয় না। সুতরাং কারণের সঙ্গে কার্যের নিয়ত সম্বন্ধ যেহেতু অবশ্য স্বীকার্য, সেহেতু উৎপত্তির পূর্বেও কার্যের সত্তা স্বীকার করতে হয়, উৎপত্তির পূর্বে ঘট অসৎ হলে তার সঙ্গে সৎ মৃত্তিকার সম্বন্ধ স্থাপিত হতে পারেনা। কারণ সৎ ও অসৎ এর মধ্যে কোন সম্বন্ধ সম্ভব নয়। অতএব উৎপত্তির পূর্বেও কার্যকারণে সৎ রূপেই থাকে, একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে।

বাচস্পতি মিশ্রের উক্তি-

” এতদুক্তং ভবতি, কার্যেন সম্বন্ধং কারনং কার্যস‍্য জনকং সম্বন্ধশ্চ কার্যস‍্যাসতো ন সম্ভবতি তস্মাৎ সদিতি”(তত্ত্বকৌমুদী)।

iii) সর্বসম্ভবাভাবাৎ

সর্বত্র সবকিছুর উৎপত্তি হয় না বলে সৎকার্যবাদ সিদ্ধ হয়। এখানে অসৎকার্যবাদী ন‍্যায়বিদগনের আক্ষেপ এই- উৎপত্তির পূর্বে কারণের মধ্যে যদি কার্য থাকে তবে বস্তুর উৎপত্তির জন্য কারণ ব্যাপার নিষ্ফল হয়ে যায়। তাই উৎপত্তির পূর্বে কার্য না থাকায় কার্যের সঙ্গে অসম্বন্ধ কারণ থেকেই কার্যের উৎপত্তি স্বীকার করতে হবে। অতএব অসৎ কার্যই উৎপন্ন হবে।

এইরূপ প্রতিপক্ষের সমাধানকল্পে সাংখ্যাচার্যরা বলেন, অসম্বন্ধ কারণ থেকে যদি কার্য উৎপন্ন হয় তবে উৎপত্তির পূর্বে কার্যের সঙ্গে কারণের অসম্বন্ধ বা সম্বন্ধাভাবের কিছু বিশেষ না থাকায় যেকোনো কারণ থেকেই সকল কার্যের উৎপত্তি প্রসঙ্গ হবে। কিন্তু যে কোনো কারণ থেকে যেকোনো কার্য উৎপন্ন হতে পারে না। কোন কারন থেকে কার্য উৎপন্ন হবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকায় অবশ্যই স্বীকার্য যে, উৎপত্তির পূর্বে কার্যের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত হয়েই কারণ কার্যের উৎপাদক হবে। এর দ্বারা সৎকার্যবাদই প্রতিষ্ঠিত হবে।

অতএব সাংখ‍্যাচার্যরা অসৎকার্যবাদের প্রতিরোধকল্পে বলেছেন-

“অসত্ত্বে নাস্তি সম্বন্ধঃ কারনৈঃ সত্ত্বসঙ্গিভিঃ।
অসম্বন্ধস‍্য চোৎপত্তিমিচ্ছতো ন ব‍্যবস্থিতিঃ।।”

iv) শক্তস‍্য শক‍্যকরণাৎ

এটি সৎকার্যবাদ পক্ষে চতুর্থ যুক্তি। শক্ত কারণই শক্তিলভ‍্য কার্যকে উৎপন্ন করে অসমর্থ কারণ থেকে কার্যের উৎপত্তি কখনো হয়না। কারণের মধ্যেই কার্যানুকূল শক্তি নিহিত থাকে। যেমন- মৃত্তিকার মধ‍্যেই ঘটজননশক্তি নিহিত আছে। তাই মৃত্তিকা থেকে ঘটেরই উৎপত্তি হয়, বৃক্ষাদির উৎপত্তি হয় না। সুতরাং উৎপত্তির পূর্বে কার্য সৎ, অসৎ নয়, সাংখ্যশাস্ত্রকারে এটাই সিদ্ধান্ত।

v) কারণভাবাচ্চ

সৎকার্যবাদের পক্ষে পঞ্চম ও অন্তিম যুক্তি হলো কার্য ও কারণের তাদাত্ম‍্য বা অভেদ সম্বন্ধ। অভিপ্রায় এই, কার্য কারণাত্মক হয় অর্থাৎ উপাদান কারণেই কার্যের স্বরূপ হয় বলে উপাদান কারণ থেকে কার্য ভিন্ন নয়।যেমন সুবর্ণ নির্মিত বলয় সুবর্ণাত্মক হওয়ায় সুবর্ণ থেকে ভিন্ন নয়- অভিন্ন, তেমনই সকল ক্ষেত্রে উপাদান ও তার কার অভিন্ন। সেখানে কারণটি সৎ হওয়ায় কারণের অভিন্ন কার্যটিও সৎই হবে।

অসৎকার্যবাদ খন্ডন করে সৎকার্যবাদ মূল্যায়ন:-

উপরিউক্ত পাঁচটি যুক্তির দ্বারা সাংখ্যদার্শনিকরা বিরুদ্ধবাদীদের অসৎকার্যবাদকে খন্ডন করে সৎকার্যবাদকে প্রতিষ্ঠা করেছেন -একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

সাংখ‍্যকারিকা হতে অন্যান্য প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment