সাংখ‍্যকারিকা: প্রত্যক্ষ প্রমাণ কি? প্রত্যক্ষের বাধক গুলি কি কি?

প্রত্যক্ষ প্রমাণ কি? প্রত্যক্ষের বাধক গুলি কি কি? সাংখ‍্যকারিকা অনুসরনে আলোচনা কর ।

প্রত্যক্ষ প্রমাণ কি? প্রত্যক্ষের বাধক গুলি কি কি? সাংখ‍্যকারিকা অনুসরনে আলোচনা কর।


প্রত্যক্ষ প্রমাণের সংজ্ঞা:-

‘ প্রতি’ শব্দের সঙ্গে ইন্দ্রিয়বাচী’ অক্ষ’ শব্দের সমাসে প্রত্যক্ষ শব্দটি নিষ্পন্ন হয়। অতএব বিষয়ের সঙ্গে সম্বন্ধে বিশিষ্ট ইন্দ্রিয়ই প্রত্যক্ষ শব্দের অর্থ।

বিষয়েন্দ্রিয় সম্বন্ধরূপ ব্যাপার বিশিষ্ট হওয়ায়’ব‍্যাপারবৎ কারনং করণম্’- করনের লক্ষণ অনুসারে চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ই প্রত্যক্ষ প্রমার প্রতি করন হয় বলে প্রত্যক্ষ প্রমাণ রূপে বিবেচিত হয়। কিন্তু সাংখ‍্য দার্শনিকগণ এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন।


এখানে ‘প্রতিবিষয়াধ‍্যবসায়ো দৃষ্টম্ ‘ এটি ঈশ্বরকৃষ্ণের অভিপ্রেত প্রত্যক্ষের বিশেষ লক্ষণ। এখানে প্রতিবিষয় শব্দের দ্বারা ইন্দ্রিয়কে বোঝানো হয়েছে। ‘বিষয়ং বিষয়ং প্রতি বর্ত্ততে ইতি প্রতিবিষয়মিন্দ্রিয়ম্’। আর এই ইন্দ্রিয়জন্য যে অধ্যবসায় অর্থাৎ নিশ্চয় জ্ঞান, সেটাই প্রত্যক্ষ প্রমাণ। আর এই প্রমাণের ফল পুরুষনিষ্ট বোধই হল প্রত্যক্ষ প্রমা।

প্রত্যক্ষ প্রমাণ

ভূমিকা:-জগতে এরকম অনেক বস্তুই আছে যেগুলি অনেক কারণেই প্রত্যক্ষত উপলব্ধি হয় না। ঐ কারণ গুলিকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির প্রতিবন্ধক বলা হয়। প্রতিবন্ধক সর্বদা কার্য প্রতিরোধী হয়। আমাদের জ্ঞাতব্য, প্রত্যক্ষ উপলব্ধিরূপ কার্যের প্রতিরোধী প্রতিবন্ধক গুলি কি কি, যাদের প্রতিবন্ধকতাবশত বস্তু বিদ‍্যমান হলেও উপলব্ধির গোচর হয় না।

এইরূপ আকাঙ্ক্ষায় ঈশ্বরকৃষ্ণ প্রণয়ন করেছেন, সেটি হল-

“অতিদূরাৎ সামীপ‍্যাদিন্দ্রিয়ঘাতান্মনোঅনবস্থানাৎ
সৌক্ষ্ম‍্যাদ্ব‍্যবধানাদভিভবাৎ সমানাভিহারাচ্চ।।”


প্রকৃত কারিকোক্ত প্রত‍্যক্ষের প্রতিবন্ধকগুলির স্বরূপ নিরূপনই এখন আমাদেরকে আলোচ্য বিষয়।

প্রত‍্যক্ষের বাধকসমূহ / সৎ বস্তুর অনুপলব্ধির কারনসমূহ:-

i) অতিদূরাৎ:-

অতিশয় দূরত্ববশতঃ বস্তুর সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সন্নিকর্ষ হয় না বলে বস্তুর প্রত্যক্ষ উপলব্ধি ঘটে না। যেমন- আকাশের অনেক উঁচুতে শকুনাদি পক্ষীকূল উড়তে থাকলেও অতিশয় দূরত্ববশতঃ আমরা তা দেখতে পাই না।

ii) সামীপ‍্যাৎ:-

অতিদূরাৎ পদ থেকে অতি শব্দের অনুবৃত্তি করে এখানে অতিসামীপ্যাৎ অর্থ বুঝতে হবে। অতিসমীপবর্তী বস্তুর সঙ্গেও ইন্দ্রিয়সংযোগ ঘটে না, তাই বস্তুটি অত্যন্ত নিকটে থাকলেও অতি সামিপ‍্যহেতু আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। যেমন – লোচনস্থ কাজল রেখা আমরা দেখতে পাই না।

iii) ইন্দ্রিয়ঘাতাৎ:-

চক্ষু, কর্ণ প্রভৃতি জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে কোনো বস্তু বিদ্যমান থাকলেও সেই বস্তুর প্রত্যক্ষ হয় না। অতএব, অন্ধত্ব, বধিরত্ব প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের অসামর্থ‍্য দোষগুলি প্রত্যক্ষের প্রতিবন্ধক।

iv) মনোঅনবস্থানাৎ:-

অন্যমনস্কতা বশতঃ পদার্থের প্রত্যক্ষ বিষয় হয়না।

এই অমনোযোগ দু’ভাবে হতে পারে –

  • (ক) গভীর চিন্তায় নিমগ্ন মন যদি বহিরিন্দ্রিয়ের সাথে সংযুক্ত না হয় তবে প্রত্যক্ষ হয়না, যেমন- ক্রোধবশত শত্রুর চিন্তায় যে নিমগ্ন থাকে, সেই ব্যক্তি উজ্জ্বল আলোতেও কোনো বস্তুর প্রত্যক্ষ করতে পারে না।
  • (খ) মনের সঙ্গে যে ইন্দ্রিয়ে সংযোগ হওয়া উচিত তার পরিবর্তে যদি অন্য ইন্দ্রিয় সংযোগ হয় তবে বস্তু থাকলেও তা উপলব্ধ হয় না। যেমন -অতি মধুর গীত শ্রবনে তন্ময় ব্যক্তি সম্মুখে অবস্থিত কোনো চলনশীল ব্যক্তিকে দেখেও দেখতে পায়না।

v) সৌক্ষ্ম‍্যাৎ:-

ইন্দ্রিয়ের সামনে থাকলেও সূক্ষ্মতাবশত বস্তুর উপলব্ধি হয় না। যেমন- আমাদের চক্ষুর সম্মুখে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও আমরা অনু-পরমানু প্রভৃতিকে প্রত্যক্ষ করতে পারিনা।

vi) ব‍্যবধানাৎ:-

ব্যবধান বশত বিষয় ও ইন্দ্রিয়ের সম্বন্ধ না হওয়ায় প্রত্যক্ষ হয় না। যেমন – একই দেওয়ালের ব্যবধানে দুটি পৃথক ঘরে দু’জন’ বিদ্যমান থাকলেও একে অন্যকে দেখতে পায় না।

vii) অভিভবাৎ:-

‘অভিভব’ অর্থাৎ একটি উচ্চ শক্তি পদার্থ দ্বারা যদি অপর নিম্নশক্তি বিশিষ্ট পদার্থ অভিভূত হয়, তাহলে নিম্নশক্তি বিশিষ্ট বস্তুর প্রত্যক্ষ হয় না। যেমন- দিনের বেলায় উচ্চশক্তি বিশিষ্ট সূর্যকিরণে অভিভূত হওয়ার কারণে গ্রহ-নক্ষত্রাদিকে প্রত্যক্ষ করা যায় না। তবে এর দ্বারা প্রমাণ হয় না যে, গ্রহনক্ষত্রাদি নেই।

viii) সমানাভিহারাৎ:-

সমানাভিহার অর্থাৎ দুটি একজাতীয় বস্তুর মিশ্রনের ফলে ঐ বস্তুদুটিকে আলাদা করে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয় না। যেমন – নদী প্রভৃতি জলাশয়ে যে বৃষ্টির জল পড়ে তাকে আলাদা করে প্রত্যক্ষ করা যায় না।

মূল‍্যায়ণ:-

ঈশ্বর কৃষ্ণের বক্তব্য, বস্তু বিদ্যমান থাকলেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে তার উপলব্ধি ঘটে না। সুতরাং, উপলব্ধি হচ্ছে না বলে বস্তু নেই – এমন কথা চার্বাক ভিন্ন কেউ বলেন না।

সাংখ‍্যকারিকা হতে অন্যান্য প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment