পুরুষের বহুত্বসাধক প্রমাণসমূহ ঈশ্বর কৃষ্ণের মতানুসারে আলোচনা

পুরুষের বহুত্বসাধক প্রমাণসমূহ ঈশ্বর কৃষ্ণের মতানুসারে আলোচনা কর। Evidence of male multiplicity.

পুরুষের বহুত্বসাধক প্রমাণসমূহ


ভূমিকা:- প্রতি শরীরে আত্মা ভিন্ন ভিন্ন অথবা সর্বশরীরে এক আত্মা বিরাজমান, এ বিষয়ে আচার্যগনের মধ্যে প্রবল মতবিরোধ লক্ষ্য করা যায়। শঙ্কর প্রমুখ অদ্বৈত বৈদান্তিক গনের দৃষ্টিতে আত্মা এক। কিন্তু গৌতম কণাদ প্রভৃতি ন‍্যায়বৈশেষিকগণের প্রেক্ষিতে আত্মা একত্ব খন্ডনপূর্বক আত্মার বহুত্বকে নির্ধারণ করেছেন।

পুরুষের বহুত্বসাধক যুক্তিসমূহ/ প্রমাণসমূহ

‘সাখ‍্যকারিকা’ র ১৭তম কারিকায় ঈশ্বরকৃষ্ণ ‘সংঘাত পরার্থত্বাৎ’ ইত্যাদি হেতু দ্বারা অসংহত পুরুষের অস্তিত্বকে প্রমাণিত করে নিম্নোদ্ধৃত ১৮তম কারিকায় পুরুষের বহুত্ব প্রতিপাদনকল্পে কতকগুলি প্রমাণ উপন্যাস করেছেন-


” জন্মমরণকরণানাং প্রতিনিয়মাদযুগপৎপ্রবৃত্তেশ্চ।
পুরুষবহুত্বং সিদ্ধং ত্রৈগুণ‍্যবিচার্যয়াচ্চৈব।।”

১) ‘জন্মমরণকরণানাং প্রতিনিয়মাৎ’ :-

জন্ম-মৃত্যু ও করণ অর্থাৎ প্রত্যক্ষজ্ঞান করণ ইন্দ্রিয়ের বিশেষ নিয়ম হেতু পুরুষের বহুত্ব সিদ্ধ হয়। প্রকৃতিসম্ভূত লিঙ্গশরীরের অদৃষ্টাখ‍্য সংস্কারবশত বাহ‍্য শরীরের সঙ্গে যে সম্বন্ধ হয়, তাকেই জন্ম বলে। আর মৃত্যু হল ফলভোগ বশত করে আরব্ধ কর্মক্ষয়ে লিঙ্গ শরীরের স্থূল শরীর ত্যাগ। এই জন্ম ও মরণ বিষয়ে প্রত্যেক পুরুষে বিশেষ নিয়ম দেখা যায়। অনাদি লোকব‍্যবহারে দেখা যায়, জন্মান্তরীণ কর্মনুসারে কেউ কখনো জন্মায়, আবার কেউ কখনো মৃত্যুবরণ করে।

জীবের সকল শরীরে যদি একই আত্মা থাকে, তবে একজনের জন্মে সকলেরই জন্ম হত, আবার একজনের মরনে সকলেরই মৃত্যু হত। কিন্তু তা হয় না। আর সকল শরীরের একটি আত্মা থাকলে একজন অন্ধ হলে সকলেই অন্ধ হত। অথবা একজন দেখলে সকলে দেখতে পেত।এইভাবে এক পুরুষত্ব পক্ষে বিষয় এই রকম নানা অব‍্যবস্থা আসন্ন হত। সুতরাং এই অব্যবস্থা নিরসন করতে প্রতি শরীরে পুরুষকে স্বীকার করতে হবে।

এ বিষয়ে সাংখ‍্যসূত্রকার বলেছেন –

‘ জন্মাদিব‍্যবস্থাতঃ পুরুষবহুত্বম্।’

২) ‘অযুগপৎপ্রবৃত্তেশ্চ’-

একই সময়ে একজনের গমণনাদি ক্রিয়ায় প্রভৃতি দেখা যায়। আর অন্য জনের তাদের নিবৃত্তি দেখা যায়। প্রযত্নলক্ষণ প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি যদিও অন্তঃকরণ বিশিষ্ট, পুরুষে সেটি উপচরিত (আরোপিত) হয়। পুরুষ যদি এক হয়, তবে একটি শরীরের চালনের দ্বারা সমস্ত শরীর যুগপৎ চলিত হত।  কিন্তু পুরুষের বহুত্বপক্ষে এরূপ কোনো দোষের উদ্ভব হয় না।

৩) ‘ ত্রৈগুন‍্যবিপর্যয়া’ :-

নানা পুরুষে ত্রৈগুণ‍্যের  বৈলক্ষন‍্য  দেখা যায়। যেমন – দেব, দানব ও পশুভেদে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ-এর বৈলক্ষণ‍্য দেখা যায়। কিন্তু পুরুষ যদি এক হত তবে পুরুষভেদে এরূপ বৈলক্ষণ‍্য সিদ্ধ হতো না। ঈশ্বরকৃষ্ণ ‘ত্রৈগুন‍্যবিপর্যয়াচ্চ’ এই সন্দর্ভে একথাই ব্যক্ত করেছেন।

আরো এক কথা,  পুরুষের একত্ব কল্পনায় একজন পুরুষের মুক্তিতে সকলেরই মুক্তি প্রসঙ্গে হবে এবং এতে শাস্ত্রোক্ত বন্ধমোক্ষ ব‍্যবস্থা ব্যাহত হবে।  আর মোক্ষসাধন তত্ত্ব জ্ঞানের অন্বেষণেও প্রেক্ষাবান্ ব্যক্তিদের প্রবৃত্তি হবে না।

পুরুষের বহুত্বসাধক প্রমাণসমূহ মূল‍্যায়ণ:-

এই সকল যুক্তির ভিত্তিতে সাংখ‍্যাচার্যগণ পুরুষের বহুত্বকেই  প্রমাণিত করেছেন। সাংখ‍্যসমাদৃত পুরুষবহুত্ববাদ শ্রুতিবিরুদ্ধ নয়। ‘ অজামেকাম্’ ইত‍্যাদি শ্রুতিতে পুরুষের বহুত্বই উপবিষ্ট হয়েছে। আর “একমেবাদ্বিতীয়ম্ ‘-এই  উপনিষদবাক‍্যে পুরুষের একত্ব বিবক্ষিত হয়নি। এখানে  একজাতিপরত্বই বিবক্ষিত হয়েছে। সাংখ‍্যসূত্রে অভিহিত হয়েছে-‘নাদ্বৈতশ্রুতিবিরোধো জাতিপরত্বাৎ’।

সাংখ‍্যকারিকা হতে অন্যান্য প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment