মুণ্ডকোপনিষদ: আত্মতত্ত্বলাভের উপায় ও আত্মজ্ঞান লাভের পর আত্মজ্ঞ ব‍্যাক্তির অবস্থা

মুণ্ডকোপনিষদ পাঠ‍্যাংশ অবলম্বনে আত্মতত্ত্বলাভের উপায় বর্ণনা কর। আত্মজ্ঞান লাভের পর আত্মজ্ঞ ব‍্যাক্তির কীরূপ অবস্থা হয়?

মুণ্ডকোপনিষদ অনুসারে আত্মতত্ত্বলাভের উপায় বর্ণনা কর

উ:-  উপনিষদগুলি প্রাচীন ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব। আর্য ঋষিগন এই উপনিষদ গুলির মধ্যে তাদের বিজ্ঞান চেতনার অপূর্ব মন্ত্রজাল প্রকাশ করেছেন। শ্রীমান শংকরাচার্য বলেছেন- জীবঃ ব্রহ্মৈব না পরঃ- হঠাৎ সকল উপনিষদ গুলির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল জীবাত্মা ও পরম আত্মার মধ্যে ঐক্য স্থাপন। উপনিষদে বর্ণিত বিদ্যা ব্রহ্মবিদ্যা নামে পরিচিত। আমাদের পাঠ্যাংশ মুণ্ডকোপনিষদ্-এ আমরা সেই ব্রহ্মবিদ‍্যা লাভের উপায় এবং ব্রহ্মবিদ‍্যা লাভ করার পর আত্মজ্ঞ ব্যক্তির কিরূপ অবস্থা হয় তার বর্ণনা করা হয়েছে।

       আত্মজ্ঞান তথা ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করতে হলে সাধকের অবিচল সত্য,অবিরাম একাগ্রতা এবং নিত্য ব্রহ্মচর্য পালনের প্রয়োজন।  মনের কামনা বাসনা দূর করে চিত্তকে সম্পূর্ণরূপে নির্মল করে তুলতে হয়। চিত্তকে সম্পূর্ণরূপে নির্মল করতে পারলেই সাধকের আত্মা উপলব্ধি অর্থাৎ ব্রহ্মের স্বরূপকে জানা যায়, অন্যথায় নয়। ঋষি অঙ্গিরা এ প্রসঙ্গে বলেছেন-

” ন চক্ষুষা গৃহ‍্যতে নাপি বাচা
নান‍্যৈর্দেবৈস্তপসা কর্মণা বা।
জ্ঞানপ্রসাদেন বিশুদ্ধসত্ত্ব-
স্ততস্তু তং পশ‍্যতে নিষ্কলং ধ‍্যায়মানঃ।।”

      সাধক যখন সকল প্রকার কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে বিষয়াসক্তি শুন্য হয়ে আত্মতত্ত্বকে একমাত্র বরণীয় তথা গ্রহণীয় মনে করেন তখনই তিনি নিজ হৃদয়াকাশে আত্ম উপলব্ধি করতে পারেন। সুতরাং ব্রহ্ম জিজ্ঞাসায় আত্ম  উপলব্ধির চরম ও প্রকৃষ্ট উপায় তাই ঋষি বলেছেন-

“যমেবৈষ বৃণুতে তেন লভ‍্য-
স্তস‍্যৈষ আত্মা বিবৃণুতে তনুংস্বাম্।”

আত্মজ্ঞান লাভের পর আত্মজ্ঞ ব‍্যাক্তির কীরূপ অবস্থা হয় মুণ্ডকোপনিষদ অনুসারে বর্ণনা কর

উপনিষদগুলিতে যেমন আত্মজ্ঞান লাভের উপায় বর্ণনা  করা হয়েছে,  তেমনি আত্মজ্ঞান লাভের পর আত্মজ্ঞ ব্যাক্তির কিরূপ অবস্থা হয়, সে সম্বন্ধেও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

    আমাদের পাঠ‍্যাংশে ‘মুণ্ডকোপনিষদ’ এর মতে সাধকের আত্মজ্ঞান লাভ হলে সেই আত্মজ্ঞ ব্যাক্তি পরমাত্মার সঙ্গে অভিন্ন হয়ে, আসক্তি ও ইন্দ্রিয় ভোগ থেকে মুক্ত হয়ে পরম তৃপ্তি লাভ করেন।আত্মজ্ঞান লাভের ঠিক পরেই সাধকের অবিদ‍্যা জনিত সকল কামনা -বাসনাগুলির বিনাশ ঘটে। তাঁর সকল প্রকার সংশয় দূর হয় এবং সমস্ত কর্মফল ক্ষয়প্রাপ্ত হয়-

” ভিদ‍্যতে হৃদয়গ্রন্থিশ্ছিদ‍্যন্তে সর্বসংশয়াঃ
ক্ষীয়ন্তে চাস‍্য কর্মাণি তস্মিন্ দৃষ্টে পরাবরে।।”

আত্মজ্ঞান লাভের সঙ্গে সঙ্গেই আত্মজ্ঞ ব‍্যাক্তি   সকল প্রকার শোক থেকে মুক্ত হন- ” তস‍্য মহিমানমিতি বীতশোকঃ।” আত্মজ্ঞান লাভ করার পর ব্যক্তি জীবদ্দশায় সর্বব্যাপী ব্রহ্মের সঙ্গে অভেদ উপলব্ধিতে মগ্ন থেকে দেহত‍্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মের সঙ্গেই বিলীন হন।  যেভাবে গঙ্গা-যমুনা প্রভৃতি নদ নদী গুলি বিভিন্ন নাম ধারণ করে থাকলেও তারা যখন সমুদ্রে গিয়ে পতিত হয় তখন তারা নাম ও রূপ পরিত্যাগ করে সমুদ্রের সঙ্গে এক এবং অভিন্ন হয়ে যায়। তেমনি আত্মজ্ঞান লাভ করার পর আত্মজ্ঞ ব্যক্তি পূর্বের যাবতীয় বন্ধন ছিন্ন করে পরমাত্মা তথা ব্রহ্মের সঙ্গেই বিলীন হয়ে যান। অর্থাৎ পরমব্রহ্মকে লাভ করার পর আত্মজ্ঞ ব্যক্তি স্বয়ং ব্রহ্ম হয়ে যান।

Leave a Comment