রুদ্র দেবতার স্বরূপ

ঋকবেদ অনুসারে রুদ্র দেবতার স্বরূপ আলোচনা করা হল । রুদ্র সূক্তের ঋষি, ছন্দ ও দেবতা ও রুদ্র দেবতার মাহাত্ম‍্য বর্ণিত হল ।

Table of Contents

ঋকবেদ অনুসারে রুদ্র দেবতার স্বরূপ

অবস্থানঋগ্বেদ- দ্বিতীয় মন্ডল – ৩৩ তম সূক্ত
ঋষি
ভৃগুর পুত্র গৃৎসমদ
ছন্দ
ত্রিষ্টুপ
দেবতা
রুদ্র
মন্ত্র সংখ্যা১৫ টি
রুদ্র দেবতার স্বরূপ

ঋকসংহিতার দ্বিতীয় মন্ডলের ৩৩ তম সূক্তের দেবতা হলেন রুদ্র । রুদ্র সূক্তকে অবলম্বন করে রুদ্র দেবতার স্বরূপ বর্ণনা করো।


রুদ্র দেবতার স্বরূপ / ভূমিকা:-

ঋগ্বেদের দেব সমাজে রুদ্রের সথান গৌণ। তবে বিষ্ণুর মতই মহিমান্বিত। মাত্র তিনটি পূর্ণাঙ্গ সূক্তে তাঁর স্তুতি আছে। অবশ্য অপর একটি সূক্তের অংশবিশেষে সোমের সহিত তাকে আহ্বান করা হয়েছে। তার ভয়ংকর রূপি ঋগ্বেদে বিশেষভাবে প্রকটিত। জীবলোকে সকলেই তাঁকে ভয় করে। রুদ্র ওষধিপতি, চিকিৎসক। রুদ্রই পরবর্তীকালে শিব হয়ে প্রধান তিন দেবতার একজন হয়েছেন।

রুদ্র শব্দের অর্থ :-

ঐতরেয় ব্রাহ্মণে রুদ্র শব্দের ব্যুৎপত্তি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে –

“স জাত এবারোদীৎ তদ্ রুদ্রস‍্য রুদ্রত্বম্ “।

তিনি জাত হয়েই ভীষণ রোদন করেছিলেন, সেই জন্য তাহার নাম রুদ্র। পণ্ডিতদের মতে, রোদন হলো বজ্রধ্বনি।রুদ্রই বজ্র। যাস্কের মতে, রুদ্র শব্দ রু ধাতু থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে।আবার রুদ্ ধাতু থেকেও রুদ্র শব্দ নিষ্পন্ন হয়।রুদ্র শব্দ করেন। শব্দ করা অর্থ মেঘ গর্জন করা। আবার পৌরাণিক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যিনি সকলকে জীবনের শেষ মুহূর্তে রোদন করান তিনি রুদ্র। সায়নাচার্য পৌরাণিক ব্যাখ্যার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেছেন।

রুদ্র সূক্তের ঋষি, ছন্দ,দেবতা :-

ঋকসংহিতার দ্বিতীয় মন্ডলের ৩৩ তম সূক্তের দেবতা হলেন রুদ্র। ঋষি হলেন ভৃগু পুত্র শৌণক গৃৎসমদ। ছন্দ ত্রিষ্টুপ্। আলোচ‍্য সূক্তটি ১৫টি মন্ত্রের সমাহার।

রুদ্র দেবতার স্বরূপ :-

এই সূক্তে রুদ্র দেবতার যে স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে তা নিম্নে বর্ণিত হয়েছে-

রুদ্র দেবতা মরুৎগণের পিতা :-

রুদ্রকে বলা হয়েছে মরুৎগণের পিতা।

সায়ণাচার্য বলেছেন-

“মরুৎসংজ্ঞানাং দেবাণামুৎপাদক এব।”

ঋষির দৃষ্টিতে-

“আ তে পির্তমরুতাং সুম্নমেতু মা নঃ সূর্যস‍্য সংদৃশো যুযোথাঃ।
অভি নো বীরো অর্বতি ক্ষমেত প্র জায়েমহি রুদ্র প্রজাভিঃ।।”

রুদ্র দেবতা শ্রেষ্ঠ ভিষক :-

রুদ্র শ্রেষ্ঠ ভিষক। রুদ্রের কাছে সকলে প্রার্থনা করে যে রুদ্র প্রদত্ত ওষুধের দ্বারা শত বৎসর জীবন ধারণ করতে পারে।

রুদ্র দেবতা বজ্রবাহু ও জ্ঞানী :-

রুদ্রের একটি প্রসিদ্ধ বিশেষণ হল বজ্রবাহু। কারণ তার হস্তে সর্বদায় থাকে তীক্ষ্ণ আয়ুধ। তিনি জ্ঞানীগণের মধ‍্যে অতিশয় শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী।

” শ্রেষ্ঠো জ্ঞাতস‍্য রুদ্র শ্রিয়াসি তবস্তমস্তবসাৎ বজ্রবাহো।
পর্ষি ণঃ পারমংহসঃ স্বস্তি বিশ্বা অভীতী রপসো যুযোধি।।”

রুদ্র দেবতা অভীষ্টবর্ষী:-

রুদ্র হলেন কামনা বর্ষণকারী। আমরা অশোভন স্তুতির দ্বারা অথবা বিসদৃশ দেবগনের সহিত রুদ্রকে একত্রে আহ্বান করি যাতে রুদ্রের বিরাগভাজন না হই।

মৃদূদরবিশিষ্ট, বভ্রুবর্ণ,শোভনঅনুবিশিষ্ট ও শোভননাসিকাযুক্ত রুদ্র দেবতা

রুদ্র মৃদুদর বিশিষ্ট, বভ্রুবর্ণ, শোভনঅনুবিশিষ্ট অথবা শোভননাসিকাযুক্ত। শোভন আহ্বান শুনলে তিনি আহ্বানকারীর নিকট উপস্থিত হন।

দীপ্তঅন্নপ্রদায়ী রুদ্র দেবতা

মরুৎযুক্ত ও অভীষ্ঠ বর্ষণকারী রুদ্র সকলকে দীপ্ত অন্নদ্বারা বিশেষভাবে তৃপ্ত করেন।

সুখপ্রদ হস্তবিশিষ্ট রুদ্র দেবতা

রুদ্রের হস্তের প্রশংসা করে বলা হয়েছে রুদ্রের হস্ত সুখকর, কারণ ঐ হস্ত দ্বারা তিনি ঔষধ প্রস্তুত করে ব‍্যাধি সমূহের নাশ করেন।

রুদ্র দেবতা ভুবনের অধিপতি ও ভর্তা:-

রুদ্রের অঙ্গসমূহ বলিষ্ঠ, তিনি বহু বিশিষ্ট, তেজস্বী, বভ্রুবর্ণ ও জাজ্বল‍্যমান সুবর্ণ অলঙ্কারে বিভূষিত। তিনি বিশ্বত্রিভুবনের অধিপতি ও পালক।

ঋষির দৃষ্টিতে-

” স্থিরেভিরঙ্গৈঃ পুরুরৃপ উগ্রো বভ্রুঃ শুক্রেভিঃ পিপিশে হিরণ‍্যৈঃ।
ঈশানাদস‍্য ভুবনস‍্যভূরের্ণ বা উ যোষদ্রুদ্রাদসুযম্।।”

রুদ্র দেবতা ওজস্বী

রুদ্র সর্বদায় ধনু ও বান ধারণ করে আছেন। তিনি নিত‍্যই বিশ্বজগতকে রক্ষা করেছেন। রুদ্রের ন‍্যায় ওজস্বী দেবতা আর কেউ নেই।

শত্রু বিনাশক রুদ্র দেবতা

রুদ্র স্তপ করলে তিনি আমাদের সুখী করেন, তাঁর সেনা শত্রুকে বিনাশ করে।

বহুধনদাতা ও মর্ত্তলোকের পালক রুদ্র দেবতা

রুদ্র হলেন বিবিধ সম্পদের দাতা, যারা সজ্জন রুদ্র তাদের সর্বদা পালন ও রক্ষণ করেন।

ঋষির দৃষ্টিতে-

” কুমারশ্চিৎপিতরং বন্দমানং প্রতি ননাম রুদ্রোপযন্তম্।
ভূরের্দাতারং সৎপতিং গৃণীষে স্তুতস্ত্বং ভেষজা রাস‍্যস্মে।।”

রুদ্র দেবতা সুখপ্রদায়ী :-

রুদ্রের ঔষধ রোগভয় নিবারিত করে সকলকে সুখদান করবে এটাই আশা।

রুদ্র দেবতা সর্বজ্ঞাত

রুদ্র হলেন সর্বজ্ঞ। যে প্রকারেই তাঁকে আমরা আহবান করি, তিনি আমাদের আহ্বান শ্রবণ করেন।

” এবা বভ্রো বৃষভ চেকিতান যথা দেব ন হৃণীষে ন হংসি।
হবনশ্রুন্নো রুদ্রেহ বোধি বৃহদ্বদেম বিদথে সুবীরা।।”

রুদ্র দেবতার মাহাত্ম‍্য

উপসংহার:- রুদ্রের দুটি রূপের পরিচয় পাই- একটি সংহাররূপ, অপরটি কল্যাণময় রূপ। ঋকবেদে রুদ্রের ভয়ঙ্কর মূর্তিটিই বেশি দেখি। তিনি পাপিগনের বিনাশক। শত্রুগনকে বান বিদ্ধ করেন এবং দূরদেশে বিতাড়িত করেন। এইরূপ রুদ্রকে ঋষি বারংবার নমস্কার করেছেন।

আরো পড়ুন –

Leave a Comment