অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের চতুর্থ অঙ্ক সর্বশেষ্ঠ কেন?

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের কোন অংক কে সর্বতম বলা হয় এবং কেন? যুক্তি সহ আলোচনা কর।অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের চতুর্থ অঙ্ক সর্বশেষ্ঠ কেন?

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের কোন অংক কে সর্বতম বলা হয় এবং কেন?অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের চতুর্থ অঙ্ক সর্বশেষ্ঠ কেন?

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের কোন অঙ্ক সর্বশেষ্ঠ?


উ:-  বাণীর বরপুত্র মহাকবি কালিদাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হল অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটক। এই নাটকের পাঠ শেষে আমার মনে হয় নাটকের চতুর্থ অংকটি সর্বশেষ্ঠ। ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ ‘  সম্পর্কে তাই বলা হয়-

” কাব‍্যেষু নাটকং রম‍্যং তত্র রম‍্যা শকুন্তলা
তত্রাপি চ চতুর্থঃ অঙ্কঃ যত্র যাতি শকুন্তলা।।”

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের চতুর্থ অঙ্ক সর্বশেষ্ঠ বিষয়ে মতবিরোধ

কিন্তু নাটকের কোন অঙ্কটি সর্বশ্রেষ্ঠ এই বিষয়ে অনেক মতপার্থক রয়েছে। কোনো কোনো সমালোচক চতুর্থ অঙ্ক অপেক্ষা পঞ্চম অঙ্ককে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন। তবে অধিকাংশ সমালোচকগণ নাটকের চতুর্থ অঙ্কটিকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করেছেন। কারণ-

  • প্রথমত, নাটকের চতুর্থ অঙ্কের প্রথমেই ‘বিষ্কম্ভক’ অংশে আমরা দেখি দুর্বাসা অভিশাপ বৃত্তান্ত–  যা নাটকটিকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। প্রেম পবিত্র হলেও তা যদি মানুষকে সামাজিক সংস্কার ভুলিয়ে দেয়,  সেই প্রেম কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না। তাই অতিথি সৎকারে অবহেলার দায়ে প্রতি চিন্তায় নিমগ্না শকুন্তলার জীবনে নেমে এসেছে ঋষি দুর্বাসার বজ্রকঠোর অভিশাপ। অভিশাপ বৃত্তান্তটি না থাকলে নাটকটি সপ্তম অঙ্ক পর্যন্ত গড়াত না।
  • দ্বিতীয়ত, চতুর্থ অঙ্কে মানবের সাথে প্রকৃতির এক নিবিড় আত্মীয়তার চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশ্বসাহিত‍্যে অন‍্য কোথাও এত সুন্দর প্রকৃতির ছবি চোখে পড়ে না।
  • তৃতীয়ত, শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রাকালে আশ্রমের তরুলতাও তাঁকে সাজাতে ব‍্যস্ত হয়ে উঠেছে। শকুন্তলা যেন তাদের কাছে যাত্রার অনুমতি প্রার্থনা করছেন। বৃক্ষরাজিও যেন শকুন্তলাকে আকাশবাণীর মাধ‍্যমে আশীর্বাদ জানাচ্ছিল। আশ্রমের মৃগশিশুটিও তাঁর আঁচল ধরে টেনেছিল।
  • চতুর্থত, কালিদাস মূলত শৃঙ্গার রসের কবি হলেও এই অঙ্কে কন‍্যার প্রথম পতিগৃহে যাত্রাকালের মর্মস্পর্শী বিচ্ছেদ বেদনার যে করুণরস সৃষ্টি করেছেন-
  • তাও চতুর্থ অঙ্কের শ্রেষ্ঠত্বের অন‍্যতম কারণ। পালিতা কন‍্যার আসন্ন বিচ্ছেদে কণ্বমুনির পক্ষেও চোখের জল ধরে রাখা কঠিন হয়েছিল।
  • পঞ্চমত, চতুর্থ অঙ্কে বর্ণিত হয়েছে শকুন্তলার দুই প্রিয় সখী অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার বিচ্ছেদ বেদনা। প্রিয় সখী শকুন্তলাকে ছাড়তে তাদের মন চায় না। তপোবন প্রকৃতিও যেন আসন্ন বিচ্ছেদ বেদনায় ব‍্যাকুল হয়ে উঠেছে।
    • কবিগুরুর ভাষায়-
    • মৃগের গলি পড়ে মুখের তৃণ, ময়ূর নাচে না যে আর।
    • খসিয়া পড়ে পাতা লতিকা হতে, যেন সে আঁখি জলধার।।”
  • ষষ্ঠত, চতুর্থ অঙ্কেই আছে শকুন্তলার প্রতি কণ্বমুনির উপদেশ। যাত্রাকালে শকুন্তলাকে তিনি বলেছেন- পতিগৃহে গিয়ে শকুন্তলা যেন গুরুজনদের সেবা করেন,  অন্যান্য মহিষীদের সঙ্গে যেন প্রিয় সখীর মতো আচরণ করেন, দাস-দাসীদের প্রতি যেন সদয় ব্যবহার করেন।  এই উপদেশ সকল যুবতীরই শিরোধার্য।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের চতুর্থ অঙ্ক সর্বশেষ্ঠ বিচার

উপসংহার:- পরিশেষে বলা যায় যে, শৃঙ্গার রস মূলক অভিজ্ঞানশকুন্তলম্  নাটকের  চতুর্থ অঙ্কে করুনরস বর্তমান। কাব্য গুনের দিক থেকে বিচার করলে চতুর্থ অঙ্ককে শ্রেষ্ঠ অঙ্ক বলা যেতে পারে। কিন্তু নাটকের মধ্যে কাব‍্যত্ব বেশি প্রকট হলে , তা নাটক থাকে না। যদিও সপ্তম অঙ্ক বিশিষ্ট এই নাটকে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঙ্ককে প্রাধান্য দেওয়া নাটকটির সামগ্রিকতার উপর অবিচার করা হয়,  তথাপি প্রশ্নানুসারে একথা বলতেই হয় যে,  অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকের চতুর্থ অঙ্কটি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে।

অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটক হতে অন্যান্য পোস্টগুলি

Leave a Comment