ভারতীয় দর্শন: চৈতন‍্য বিশিষ্ট দেহই আত্মা – চার্বাক মতবাদের ব‍্যাখ‍্যা ও গ্রহণযোগ‍্যতা

চৈতন‍্য বিশিষ্ট দেহই আত্মা – চার্বাকদের এই মতবাদের ব‍্যাখ‍্যা কর? এই মতবাদ গ্রহণযোগ‍্য কিনা তা আলোচনা কর।
অথবা, চার্বাক দেহাত্মবাদ সবিচারসহ আলোচনা কর।

চৈতন‍্য বিশিষ্ট দেহই আত্মা – চার্বাকদের এই মতবাদের ব‍্যাখ‍্যা

উ:- ভারতীয় দর্শন আস্তিক ও নাস্তিক ভেদে দ্বিবিধ। বেদবিরোধী তিনটি নাস্তিক দর্শন সম্প্রদায়ের মধ্যে চার্বাক দর্শন অন্যতম। চার্বাক দার্শনিকেরা দেহাত্মবাদ স্বীকার করেন। ন‍্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, মীমাংসা, বেদান্ত,জৈন প্রভৃতি আধ্যাত্মবাদী ভারতীয় দার্শনিকদের মত চার্বাকেরা দেহাতিরিক্ত আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। চার্বাকরা বলেন চৈতন্যের আধাররূপে আত্মার প্রত্যক্ষ হয়না। সুতরাং ঐরূপ আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করা অযৌক্তিক। আধ্যাত্মবাদী ভারতীয় দার্শনিকদের মতে আত্মা দেহ-মন ইন্দ্রিয় প্রভৃতি থেকে ভিন্ন এক স্বতন্ত্র সত্তা। আত্মা দেহের আশ্রিত হলেও দেহ থেকে ভিন্ন একটি সস্তা কিন্তু আত্মা থেকে ভিন্ন এক চেতন সত্তা দেহ অনিত্য হলেও আত্মা নৃত্য আত্মা উৎপত্তি অভিনাশ হীন শরীর বিনষ্ট হল আত্মা বিনষ্ট হয় না- ‘ ন অন‍্যতে অন‍্যমানে শরীরে।’ কিন্তু চার্বাকগণ আত্মার অস্তিত্ব সম্পর্কে এই চিরাচরিত ধারণাতে বিশ্বাসী নয়।

চার্বাক দেহ সর্বস্ব। প্রত্যক্ষ ভিন্ন দেহের অতিরিক্ত আত্মা বলে কিছু নেই, চৈতন্য বিশিষ্ট দেহই আত্মা-‘ চৈতন‍্য বিশিষ্ট দেহ এব আত্মা।’ আত্মা বলে স্বতন্ত্র কিছু নেই। চৈতন্য দেহরই এক নতুন গুন। এই চৈতন্য পৃথিবী, জল, অগ্নি ও বায়ু এই ভূত চতুষ্টয়ের সমন্বয়ে গঠিত। এই ভূতচতুষ্টয়ের সংমিশ্রণে দেহ সৃষ্টির লগ্নে চৈতন্য সৃষ্টি হয়। চতুর্ভূত স্বভাবে জড় হলেও পরস্পরের মিলনে চৈতন্য নামক নতুন গুনের আবির্ভাব হয়।

চতুর্ভূত থেকে চৈতন্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চার্বাকরা বলেছেন – পান, চুন, খয়ের, সুপারি এর কোনটির মধ্যে লাল রং দেখা যায় না। কিন্তু এরা পৃথকভাবে লাল না হলেও এদের একত্র চর্বণ করলে সেই মিশ্রণে লাল রঙের আবির্ভাব ঘটে। চৈতন্যেই সেই ভূতচতুষ্টয়ের মিশ্রণের ফলে উৎপন্ন হয়। আবার কিন্ব বা বৃক্ষ বিশেষের নির্যাস ইত্যাদির বিকার বা পরিনাম হতে যেমন মাদকতা শক্তির উৎপত্তি হয়, সেইরূপ ভূত চতুষ্টয় বিকারগ্রস্থ বা পরিণত হলে চৈতন্য গুণ উৎপন্ন হয়- ‘মদশক্তিবৎ চৈতন‍্যমুপজায়তে।’ কাজেই চৈতন‍্য মানব দেহের গুন বিশেষ। কিভাবে জোড়া দেখি চৈতালি অ্যালবাম উঠে এবং কিভাবে তার বিনাশ ঘটিয়ে তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চার্বাকগণ বলেছেন- কিন্বাদি দ্রব‍্য থেকে যেমন মত শক্তি জন্মায় তেমনি নেহাকারে পরিণত ভূত চতুষ্টয় থেকে চরিত্রাভিনয় এই কারণে দেহাতি রূপে পরিণত হতো এরপর আর চৈতন‍্য দৃষ্ট হয় না। বার্হস্পত‍্য সূত্রে বলা হয়েছে-

” চৈতন‍্যবিশিষ্ট দেহ এব আত্মা,
দেহাতিরিক্ত আত্মনি প্রমাণাভাবাৎ।।”

অর্থাৎ দেহের অতিরিক্ত আত্মার প্রমাণের অভাবে চৈতন্য বিশিষ্ট দেহই আত্মা তা প্রমাণিত হয়। এর সমর্থনে চার্বাক ষষ্ঠীতে বলা হয়েছে- ‘আমি কৃশ’, আমি স্থূল’ এরূপ দেহের সঙ্গে আত্মার সামানাধিকরণ‍্য বা অভেদ জ্ঞান সকলেরই প্রত‍্যক্ষসিদ্ধ। তাছাড়া স্থূলদেহ ব‍্যাতীত আত্মার কোন প্রত‍্যক্ষ সম্ভব নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, যদি দেহ ও আত্মা অভিন্ন হয় তাহলে দেহের প্রতীতিকালে ‘আমার দেহ’ এইরূপ প্রতীতি হয় কেন ? আত্মা ও দেহ অভিন্ন হয় তাহলে দেহের প্রতীতিকালে ‘আমার দেহ’ এইরূপ প্রতীতি হওয়া উচিত ছিল। এই ধরনের আপত্তির উত্তরে চার্বাকগণ বলেন যে, ভাষার অপব্যবহারের ফলেই আমরা ‘আমার দেহ’ বলে থাকি। যদিও শির ব্যতীত রাহুর আর কোনো সত্তাই নেই তথাপি আমরা ‘রাহুর শির’ এইরূপ ভাষা ব্যবহার করি। সেই রূপ আত্মার কোন অস্তিত্ব না থাকলেও ‘আমার দেহ’ এইরূপ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বস্তুতপক্ষে ‘ আমি দেহ ‘ ও ‘আমার দেহ ‘ এই দুটি উক্তির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। চৈতন বিশিষ্ট দেহই যখন আত্মা দেহের বিনাশের সাথে সাথে জীবনেরও বিনাশ ঘটে। তাই চার্বাকরা বলেছেন-

‘ভষ্মীভূতস‍্য দেহস‍্য পুনরাগমনং কুতঃ।’

দেহ ভষ্মীভূত হলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। দেহাতিরিক্ত আত্মা নেই- ‘চৈতন‍্য বিশিষ্টকায়ঃ পুরুষ’ (আত্মা) ইহলোক একমাত্র অস্তিত্বশীল,পরলোক বলে কিছু নেই। আত্মা সম্পর্কে চার্বাকদের এই মতবাদ দেহাত্মবাদ বা ভূতচৈতন্যবাদ নামে পরিচিত।

চার্বাক মতে চৈতন্য দেহের উপর নির্ভর করে। তাই বার্ধক্যে দেহ বিকল হলে স্নায়ুমণ্ডল তদীয় উপাদান ভূতচতুষ্টয়ে বিলীন হয় এবং চৈতন্যের বিলুপ্তি ঘটে। ছান্দোগ্য উপনিষদে এই মতকে অনুসরণ করে বলা হয়েছে যে-

‘ য এষ আক্ষিণি পুরুষো দৃশ‍্যতে এষ আত্মোতি।’

চক্ষুতে যে পুরুষকে দেখা যায় তিনিই আত্মা।

চৈতন‍্য বিশিষ্ট দেহই আত্মা -এই মতবাদ গ্রহণযোগ‍্য কিনা তা আলোচনা / দেহাত্মবাদ খণ্ডন:-

চার্বাকদের দেহাত্মবাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য ভারতীয় দর্শন সম্প্রদায় তীব্র সমালোচনা করেছেন। গুলো নিম্নরূপ-

i) একদেহে বহু চৈতন‍্যের আবির্ভাব :-

চৈতন্যদেহের ধর্ম হলে একই দেহের বিভিন্ন অঙ্গ পতঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন চেতনা স্বীকার করতে হয়।অর্থাৎ একই দেহে অনেক চেতনার অস্তিত্ব মানতে হয়। এইভাবে এক দেহে বহু চৈতন্যের প্রভাবে পরস্পর বিরুদ্ধ ইচ্ছার উৎপত্তি হলে দেহ হলে নিষ্ক্রিয় হতে বাধ্য হয়। ভাষা পরিচ্ছেদে বিশ্বনাথ বলেছেন- শরীর যদি চৈতন‍্যবান হত তবে মৃত শরীর ও চৈতন্যের প্রত্যক্ষ হত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় মৃত দেহে চৈতন্যের উপস্থিতি নজরে আসে না-

“শরীরস‍্য ন চৈতন‍্যং মৃতেষু ব‍্যাভিচারতঃ”।

ii) দেহের বাল‍্যযৌবনাদি অবস্থাভেদ:-

দেহাত্মবাদের স্মৃতি প্রকৃতির ব্যাখ্যা হয়না। দেহ পরিবর্তনশীল। কাজেই দেহাত্মবাদ মানলে পূর্বদিনের অভিজ্ঞতার বিষয় পরেরদিন স্মরণে আসতে পারে না। বাল‍্যের শরীর যৌবনে থাকেনা, যৌবনের শরীর বাদ্ধর্কে থাকেনা। শরীর নিয়ত পরিবর্তনশীল। নৈয়ায়িকরা বলেন – পরিমাণের ভেদ হলে দ্রব‍্যেরও ভেদ সিদ্ধ হয়। বাল‍্যে শরীরের পরিমান যৌবনে নষ্ট হয়। উপলব্ধ হয় যে, সেই পরিমাণের আশ্রয় দ্রব্য নষ্ট হয়েছে। ন‍্যায়কুসুমাঞ্জলী হরিদাসী টীকায় বলেছেন-

” শরীরস‍্য চৈতন‍্যেবাল‍্যদশায়ামনুভূতস‍্য যৌবনে স্মরণং ন স‍্যাৎ।”

অতএব অবস্থার ভেদে শরীর ভিন্ন এক চৈতন্য অন‍্য চৈতন্য অনুভূত বিষয় স্মরণ করবে কিভাবে। অথচ এরূপ অনুভব সকলেরই হয়। সুতরাং কালক্রয় ব‍্যাপী আত্মা ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তনশীল দেহ হতে পারে না। অতএব স্থায়ী সত্তাই আত্মা।

iii) একের কর্মে অন‍্যে ভোগ করতে পারে না:-

নৈয়ায়িকগণ মনে করেন চার্বাক দেহাত্মবাদ মানলে কর্ম কর্তৃ বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেহাত্মবাদ অনুযায়ী যে দেহ কর্ম করে সেই চৈতন্য দেহই তাঁর দৈহিক কর্ম প্রত্যক্ষ করে, তাহলে একই দেহরূপ জ্ঞাতার কর্তা ও কর্ম হওয়ার দোষ দেখা যায়।

iv) সাংখ‍্য দার্শনিকগণ চার্বাক আত্মাতত্ত্বের সমালোচনা

সাংখ‍্য দার্শনিকগণ চার্বাক আত্মাতত্ত্বের সমালোচনা করেছেন। দেহের গুন যদি চেতনাই হত, তাহলে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যেও চেতনা বিরাজ করতো। কিন্তু শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন অঙ্গ – পতঙ্গের মধ্যে চেতনা থাকে না। তাই দেহের গুন চেতনা নয়।

v) চেতনা জড় দেহের ধর্ম নয়

দেহের ধর্ম যদি চেতনা হত, তাহলে দেহ কখনও চেতনা হত না। অর্থাৎ স্থূল শরীরের মৃত‍্যু ঘটত না। সুতরাং চেতনা জড় দেহের ধর্ম নয়।

vi) চেতনা প্রত্যক্ষ নয়

যদি দেহের ধর্ম চেতনা হত, তাহলে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা যেমন দেহের অন্য সব ধর্ম প্রত্যক্ষ করা যায়। চেতনাকেও সেরকম প্রত্যক্ষ করা যেত। কিন্তু তা হয় না। চেতনার কোন রূপ, গন্ধ ও স্বাদ নেই।

চৈতন‍্য বিশিষ্ট দেহই আত্মা -এই মতবাদ গ্রহণযোগ‍্য কিনা আলোচনা

পরিশেষে বলা যায় যে, চার্বাকদের মত অনুসরণ করে চার্বাক দেহাত্মবাদ খন্ডন করা যায়। দেহাত্মবাদ মেনে নিলে শ্রুতিবিরোধ ঘটে। শ্রুতি অনুসারে উৎক্রান্তিকালে হৃদয়স্থ বাসনা বিদ‍্যা কর্মানুসারে ভাবীদেহ স্পর্শ করে। মহৎ কর্মের অনুসরণে মহৎলোক, নিন্দিত কর্মের অনুশীলনে নিন্দিত লোক পুণ‍্যকর্মের অনুশীলনে নিন্দিত লোক পুণ‍্যকর্মের অনুশীলনে পুন‍্যবান এবং পাপকর্মের দ্বারা পাপী এই শুভাশুভ কর্মফলবাদ দেহাত্মবাদ মানলে অসিদ্ধ হয়। ভারতীয় দর্শনের অন‍্যতম শিক্ষাই হল- ” সাধুকারী সাধুভবতি পাপকারী পাপোভবতি, পুণ‍্যপুণ‍্যে ন কর্ম না ভবতি পাপঃ পাকোন” – অতএব, সিদ্ধান্ত হল দেহাত্মবাদ চার্বাকদের কথা শুনে কোন বুদ্ধিমান না লঙ্ঘিত হন-

‘ কঃ প্রেক্ষঃ শৃন্বন্নাপি ন লজ্জতে।’

ভারতীয় দর্শন হতে অন্য পোস্ট গুলি

Leave a Comment