অর্থশাস্ত্র: ত্রয়ী বলতে কী বোঝ? চতুবর্ণ ও চতুরাশ্রমের কর্তব‍্য ও কার্যাবলী

ত্রয়ী বলতে কী বোঝ? কৌটিল‍্যের অর্থশাস্ত্রে উল্লেখিত চতুবর্ণ ও চতুরাশ্রমের কর্তব‍্য ও কার্যাবলী নির্দেশ করে ত্রয়ী বিদ‍্যা সমুদ্দেশের মুখ‍্য আধারতা প্রমাণ কর।

ত্রয়ী বলতে কী বোঝ? চতুবর্ণ ও চতুরাশ্রমের কর্তব‍্য ও কার্যাবলী

উ:- মহামহিমশালী কুটিলমতি আচার্য কৌটিল‍্যের অতি জনপ্রিয় গ্রন্থ অর্থশাস্ত্রের বিদ্যাসমুদ্দেশ প্রকরণে ত্রয়ীর সংজ্ঞা নিরূপণ করে বলেছেন- ঋগ্বেদ, সামবেদ ও যজুর্বেদকে একত্রে ত্রয়ী বলে –

‘সামৃগযজুর্বেদাস্ত্রয়স্ত্রয়ী।’

অথর্ববেদ,ইতিহাস (মহাভারত -পুরাণাদি) কে বলা হয় বেদ।-

অথর্ববেদেতিহাতিহাসৌচ বেদাঃ।’

শিক্ষা, কল্প, ব‍্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দোবিচিত ও জ‍্যোতিষ এই ছয়টিকে বেদাঙ্গ বলা হয়-

‘শিক্ষা কল্পো ব‍্যাকরণং নিরুক্তং ছন্দোবিচিতির্জ‍্যোতিষমিতি চাঙ্গানি।’

আচার্য কৌটিল্য তার বিখ্যাত অর্থশাস্ত্রের প্রথমমধিকরণে বিদ্যাসমুদ্দেশ এবং ত্রয়ীস্থাপনা নামক তৃতীয় অধ্যায়ে ব্রাহ্মণাদি চারবর্ণের এবং ব্রহ্মচর্যাদি চার আশ্রমের স্বধর্ম বা প্রধান কর্তব্য আলোচনা করেছেন।

১ ) চতুবর্ণের প্রধান কর্তব‍্য:-

চারবর্ণ বলতে বোঝায় ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্র। কৌটিল‍্য প্রাচীন ভারতীয় সমাজের সুষ্ঠু জীবনযাত্রা নির্বাহের উপযোগী চার বর্ণের স্বধর্ম বা প্রধান করণীয় বিষয়ে বর্ণনা করেছেন-

ক) ব্রাহ্মণের স্বধর্ম বা কর্তব‍্য:-

ব্রাহ্মরের স্বধর্ম বা কর্তব্য হলো –

  • i) অধ্যয়ন অর্থাৎ বেদাদিপাঠ বা স্বাধ‍্যায়।
  • ii)  অধ্যাপনা অর্থাৎ ছাত্রের পাঠদান করা।
  • iii) যজন অর্থাৎ নিজের মঙ্গলের জন্য যজ্ঞাদি সম্পাদন।
  • iv)  যোজন অর্থাৎ পরহিতার্থে যজ্ঞ সম্পাদন।
  • v)  দান অর্থাৎ অন্যকে অর্থ দ্রব্যাদি স্বত্ব ত্যাগপূর্বক দেওয়া।
  • vi)  প্রতিগ্রহ অর্থাৎ অন্যের দান গ্রহণ করা।

“স্বধর্মো ব্রাহ্মণসাধ‍্যয়নমধ‍্যাপনং যজনং যাজনং দানং প্রতিগ্রহশ্চেতি।”

খ) ক্ষত্রিয়ের স্বধর্ম:-

অধ‍্যয়ন, যজন, দান, শস্ত্র দ্বারা জীবিকা অর্জন ও প্রাণীবর্গকে রক্ষা করা। এই হলো ক্ষত্রিয়ের স্বধর্ম বা কর্তব্য-

” ক্ষত্রিয়স‍্যাধ‍্যয়নং যজনং দানং শস্ত্রাজীবো ভূতরক্ষণং চ।”

গ) বৈশ‍্যের স্বধর্ম:-

অধ্যয়ন যজন দান কৃষি কর্ম পশুপালন ও বাণিজ্য বৈশ‍্যের স্বধর্ম বা কর্তব্যরূপে নির্ধারিত- ‘বৈশ‍্যস‍্যাধ‍্যয়নং যজনং  দানং কৃষিপশুপাল‍্যে বণিজ‍্যো চ।’

ঘ) শূদ্রের স্বধর্ম:-

দ্বিজাতির সেবা,কৃষি কর্ম, পশু পালন ও বাণিজ্য, শিল্পীকর কাজ, কুশীলবাদি চারণাদি কর্ম ইত‍্যাদি শূদ্রের স্বধর্ম বা কর্তব‍্য। “শূদ্রস‍্য দ্বিজাতিশুশ্রূষা বার্তা কারু কুশীলবকর্ম চ “।

২) চতুরাশ্রমের স্বধর্ম বা প্রধান কর্তব‍্য :-

প্রাচীন ভারতের ব্রাহ্মণাদি চতুবর্ণের জীবন আবার চারটি আশ্রম এবং পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। সেগুলি হল -i) ব্রহ্মচর্য ii) গার্হস্থ‍্য  iii) বানপ্রস্থ ও iv) সন্ন্যাস।

ক) ব্রহ্মচর্যের স্বধর্ম :-

ব্রহ্মচর্যের ধর্মগুলি হল-

i) উপকুর্বাণ ব্রহ্মচারী:-

সমাবর্ত্তনা না হওয়া পর্যন্ত গুরুগৃহবাসী ব্রহ্মচারীকে উপকুর্বাণ বলে।

ii) নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী:-

নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী আচার্যের সন্নিধানে থাকেন।

উপকুর্বাণ ব্রহ্মচারীর স্বধর্ম হল:-

স্বাধ‍্যায় অর্থাৎ নিজ নিজ বেদশাখার অধ‍্যয়ন, অগ্নির উপাসনা অর্থাৎ নিয়মিত আহুতি দান, স্নান ও ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করা।

নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারীর স্বধর্ম হল :-

ব্রহ্মচারীর সকল ধর্মপালন এবং আজীব আচার্যের সন্নিধানে থাকা। আচার্য বা গুরুর অভাবে গুরুপুত্র সমীপে অবস্থান অথবা সমান শাখাধ‍্যায়ী বৃদ্ধ সমীপে অবস্থান করা।-

‘ব্রহ্মচারিণস্ স্বাধ‍্যায়োঅগ্নিকার্যাভিষেকৌ ভৈক্ষ‍্যব্রতত্বমাচার্যে প্রাণান্তিকী বৃত্তিস্তদভাবে গুরুপুত্রে সব্রহ্মচারিণি বা।।’

খ) গার্হস্তের স্বধর্ম:-

নিজে নিজে বর্ণের জন্য ব্যবস্থিত কর্ম দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা, সমান বর্ণের অসগোত্রের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা, ঋতু রক্ষার জন্য পত্নী গমন করা,দেবতা, পিতৃপুরুষ, অতিথি ও ভৃত‍্যগণকে খাদ্যাদি দান করার পর দান অবশিষ্ট ভোজন করা-

” গৃহস্থস‍্য স্বকর্মাজীবস্তুল‍্যৈরসমানর্ষিভিবৈবাহ‍্য মৃত‍ুগামিত্বং দেবপিত্রাতিথি -ভৃত‍্যেষু ত‍্যাগশ্ শেষভোজনং চ।”

গ) বাণপ্রস্থের স্বধর্ম :-

এই আশ্রমের স্বধর্ম হল ব্রহ্মচর্যব্রতপালন, ভূমিতে শয‍্যা গ্রহণ, জটা ও মৃগচর্ম ধারণ, নিয়মিত অগ্নিতে আহুতি প্রদান, ত্রিকাল স্নান  দেবতা, পিতৃপুরুষ অতিথি সেবা এবং বন্য ফরমূলাদি ভক্ষণ।

” বাণপ্রস্থস‍্য ব্রহ্মচর্যং ভুমৌ শয‍্যা জটাজিনধারণমগ্নিহোত্রাভিষেকৌ দেবতাপিত্রতিথি পুজা বন‍্যশ্চাহারঃ।”

ঘ) সন্ন‍্যাসের স্বধর্ম :-

চতুর্থ আশ্রম হল সন্ন্যাস। সন্ন্যাস মানে সর্বত‍্যাগী। এদের স্বধর্ম হল ইন্দ্রিয় সংযম অভ্যাস, সকাম কর্মত্যাগ,কোন বস্তুতেই স্বত্ব না রাখা, সর্বসাধারণের সঙ্গ পরিহার, জীবিকা নির্বাহের জন্য বহু স্থলে ভিক্ষা গ্রহণ, অরণ্যে বাস এবং দেহের বাহ‍্য ও আভ্যন্তরীণ শুদ্ধ রাখা। –

” পরিব্রাজকস‍্য সংযতেন্দ্রিয়ত্বমনারম্ভো নিষ্কিঞ্চণত্বং সঙ্গত‍্যাগো ভৈক্ষ‍্যমণেকত্রারণ‍্যবাসো বাহ‍্যমভ‍্যন্তরং চ শৌচম্।”

প্রাচীর ভারতীয় দণ্ডনীতির শাস্ত্রকার আচার্য বৃহস্পতি ও তার মত অবলম্বীরা ত্রয়ীকে বিদ্যারূপে মর্যাদা না দিলে মহামতি কৌটিল্য ত্রয়ীকে পৃথক এবং মুখ্য বিদ্যারূপে বর্ণনা করেছেন। কারণ হিসাবে তিনি বলেছেন-

  • i) অন্যান্য বিদ্যার মতো ত্রয়ীর মাধ্যমেও ধর্ম অর্থের জ্ঞান হয়।
  • ii) ত্রয়ীতে প্রতিপাদিত ধর্ম চার বর্ণের ও চার আশ্রমের নিজ নিজ ধর্মে সকলকে নিয়ন্ত্রিত করে রাখে বলে জনসাধারণের পরম উপকার সাধন হয়।
  • iii) সমাজ ও দেশ যাতে সুশৃঙ্খভাবে পরিচালিত হয় সেই জন্য বর্নাশ্রমের স্বধর্ম পালিত ব্যক্তিদের এবং যোগ্য রাজার স্বর্গে গমন ও মোক্ষলাভের কথা বলা হয়েছে ত্রয়ীতে। ফলে সমাজে কর্মসংকট ও বর্ণ সংকট দেখা দেবে না।

তাই কৌটিল‍্যের নির্দেশ –

” তস্মাদ্ স্বধর্মভূতানাং রাজা ন ব‍্যভিচারয়েৎ।।”

অর্থাৎ প্রাণীকূল যাতে সতর্ক থেকে চূত না হয়, সে বিষয়ে রাজার সতর্ক থাকা উচিত। তাঁর মতে-

“ব‍্যবস্থিতার্যমর্যাদঃ কৃতবর্ণাশ্রমস্থিতিঃ
ত্রয‍্যা হি রক্ষিণো লোকঃ প্রসীদতি ন সীদতি।।”

ব্রাহ্মনাদি চতুবর্ণ ও ব্রহ্মচর্যাদি চতুরাশ্রম ব্যবস্থা ত্রয়ীতে বর্ণিত হওয়ায় ধর্ম সকলের উপকার সাধন করে এবং এর দ্বারা বর্ণাশ্রম ব্যবসা সুরক্ষিত থাকে। ত্রয়ীতে সকল ধর্ম ও ধর্মের আশ্রমে নিজ নিজ কর্তব্য নির্দেশ করা হয়েছে।

বেদের প্রতি কৌটিল্যের ধারণা বর্নাশ্রম ধর্মের প্রতি আনুগত্য জ্ঞাপন ও আস্থা স্থাপন। বেদের শিক্ষা, সংস্কার,সনাতন ভারতীয় জীবন দর্শন, মন্ত্র, যজ্ঞ, জ্ঞান ইত্যাদি সব কিছুর প্রতি মহামতি কৌটিল‍্য শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

Leave a Comment