কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুসরণে বিদ্যার স্বরূপ

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুসরণে বিদ্যার স্বরূপ আলোচনা কর। অথবা, চতস্র এব বিদ‍্যাঃ– উক্তিটি কার?  বিদ্যা বিষয়ে অন্যান্য অভিমত গুলি কি কি?  ত্রয়ী এবং বার্তার স্বরূপ আলোচনা কর।

বিদ্যা কয়টি চারটি
চারটি বিদ্যাআন্বীক্ষিকী,ত্রয়ী, বার্তা ও দণ্ডনীতি
আন্বীক্ষিকীআধ‍্যাত্মবিদ‍্যা বা হেতুবিদ্যা
ত্রয়ী বর্ণাশ্রমাদির জ্ঞান
বার্তা কৃষি কর্ম, পশুপালন পদ্ধতি ও বাণিজ্য বিষয়ক জ্ঞান
দণ্ডনীতি রাজনীতিবিদ্যা

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুসরণে বিদ্যার স্বরূপ আলোচনা

একথা বলা অসমীচীন হবে না যে প্রাচীন ভারতবর্ষে দণ্ডনীতি শাস্ত্রে অর্থশাস্ত্রে প্রভৃতি বিষয়ে একটি সমৃদ্ধ ধারা গড়ে উঠেছিল। মহামতি কৌটিল্যের রচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে তার পূর্বে বৃহস্পতি পরাশর বিশালাক্ষ প্রভৃতি বহু আচার্য এ বিষয়ে তাদের সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেইসব গ্রন্থ গুলি আজ দুষ্প্রাপ্য। তাই পূর্বাচার্যদের মত সংকলন করে আচার্য কৌটিল‍্য তার অর্থশাস্ত্র নামক গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছেন।

মহামতি কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রের বিনয়াধিকরণের প্রথম অধিকরণের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম প্রকরণে বিদ‍্যাসমুদ্দেশ অর্থাৎ বিদ‍্যাসমূহের পরিগণনা করেছেন। যদিও অর্থশাস্ত্র রাজনীতি বিষয়ে গ্রন্থ তথাপি বিদ্যা অর্থাৎ শাস্ত্র জ্ঞান ব্যতিরেকে রাজার পক্ষে সুষ্ঠভাবে প্রজাপালন ও প্রজারক্ষন করা সম্ভব নয়। তাই প্রখর বুদ্ধিমান কূটনীতিবিদ কৌটিল‍্য রাজাকে জ্ঞানী হওয়ার জন্য বিদ্যালাভের কথা বলেছেন।

কৌটিলের মতে, চতস্র এব বিদ‍্যা- অর্থাৎ বিদ্যা চারটি।  এই চারটি বিদ্যা হল-

“আন্বীক্ষিকী ত্রয়ী বার্তা দণ্ডনীতিশ্চেতি বিদ‍্যাঃ।”

অর্থাৎ আন্বীক্ষিকী,ত্রয়ী, বার্তা ও দণ্ডনীতি।

  • আন্বীক্ষিকী বলতে আচার্য কৌটিল‍্য আধ‍্যাত্মবিদ‍্যা বা হেতুবিদ্যা অর্থাৎ যুক্তিতর্ক বিষয়ক জ্ঞানকে বুঝিয়েছেন।
  • ত্রয়ী বিদ‍্যা হল- ঋক, সাম ও যজুঃ – এই তিনটি বেদের প্রতিপাদিত বর্ণাশ্রমাদির জ্ঞান।
  • বার্তা মানে কৃষি কর্ম, পশুপালন পদ্ধতি ও বাণিজ্য বিষয়ক জ্ঞান।
  • দণ্ডনীতি হল রাজনীতিবিদ্যা।

বিদ্যা প্রসঙ্গে আচার্য কৌটিল‍্য তার পূর্বসূরী আচার্যগণের মত উল্লেখ করে সেগুলোর যথার্থতাও বিচার করেছেন। মনু ও তাঁর অনুগামীদের মতে, বিদ্যা তিন প্রকার। যথা- ত্রয়ী, বার্তা, দণ্ডনীতি-

” ত্রয়ী বার্তা দণ্ডনীতিশ্চেতি।”

কারণ তাদের মতে, আন্বীক্ষিকী বিদ্যা ত্রয়ী বিদ্যার অর্থ বিচার করে বলে তাকে পৃথক বিদ‍্যারূপে গণ্য করা হয় না, ত্রয়ীরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়-

‘ত্রয়ীবিশেষোঅ‍্যান্বীক্ষিকীর্তি।’

আবার আচার্য বৃহস্পতি ও তার শিষ‍্যদের মতে বিদ‍্যা দুটি। বার্তা ও দণ্ডনীতি।

“বার্তা দণ্ডনীতিশ্চেতি বার্হস্পত‍্যাঃ।”

কারন বার্তা ও দণ্ডনীতিশাস্ত্রে অভিজ্ঞব‍্যাক্তিদের কাছে ত্রয়ী আচ্ছাদশ মাত্র অর্থাৎ নাস্তিকতা জনিত নিন্দা থেকে আত্মরক্ষা করার উপায় মাত্র।

‘সংবরনমাত্রং হি ত্রয়ী লোকাযাত্রাবিদ্ ইতি।’

সুতরাং ত্রয়ীর বিদ‍্যাত্ব স্বীকারের প্রয়োজন নাই।

ঔশনস্ বা শুক্রাচার্যের মতে, বিদ‍্যা কেবল একটিই এবং তা হল – দণ্ডনীতি।

‘দণ্ডনীতিরেকা বিদ‍্যেত‍্যোশনসাঃ।’

কেননা, দণ্ডনীতিতেই অন‍্যান‍্য সকল বিদ‍্যা প্রতিষ্ঠিত এবং একমাত্র দণ্ডনীতিই সকল বিদ‍্যার যোগক্ষেম সাধনে সক্ষম।

কিন্তু আচার্য কৌটিল‍্যের মতে- চতস্র এব বিদ‍্যা অর্থাৎ আন্বীক্ষিকী, ত্রয়ী, বার্তা ও দণ্ডনীতি, এই চারটিরই বিদ‍্যাত্ব আছে। যেহেতু এই চারটি বিদ‍্যার দ্বারাই লোকের ধর্ম ও অর্থের জ্ঞান হয়। তাই এই চারটি বিদ‍্যার মধ‍্যেই বিদ‍্যাত্ব আছে।

“চতস্র এব বিদ‍্যা ইতি কৌটিল‍্যঃ। তাভিঃ ধর্মার্থৌ যদ্বিদ‍্যাত্তবিদ‍্যানাং বিদ‍্যাত্বম্।”

বিদ্যার গুরুত্ব এবং উপযোগিতা

কৌটিল‍্য এই চারটি বিদ্যার গুরুত্ব এবং উপযোগিতা সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করেছেন-

i) আন্বীক্ষিকী

আন্বীক্ষিকী বিদ‍্যার স্বরূপ প্রসঙ্গে আচার্য কৌটিল‍্য বলেছেন-

“সাংখ‍্যং যোসো লোকায়তং চেত‍্যান্বীক্ষিকী।”

অর্থাৎ সাংখ‍্য, যোগ ও লোকায়ত এই তিনটি শাস্ত্রকে আন্বীক্ষিকী বলা হয়েছে। আন্বীক্ষিকী বিদ‍্যা ব‍্যসনে ও অভ‍্যুদয়ে অর্থাৎ বিপদে ও সম্পদে মানুষের বুদ্ধিকে অবিচলিত রাখে এবং মানুষের বুদ্ধিকে অবিচলিত রাখে এবং মানুষের জ্ঞান, বাক‍্য ব‍্যবহার ও কর্মশক্তির নৈপুণ‍্য সাধন করে। তাই আন্বীক্ষিকী বিদ‍্যার প্রশংসা করে কৌটিল‍্য বলেছেন-

” প্রদীপঃ সর্ববিদ‍্যানামুপায়ঃ সর্বকর্মণাম্।
আশ্রয়ঃ সর্বধর্মাণাং শশ্বদান্বীক্ষিকী মতা।।”

অর্থাৎ আন্বীক্ষিকী বিদ‍্যা অন‍্যান‍্য সকল বিদ‍্যার প্রদীপ স্বরূপ, সকল কর্মের উপায় স্বরূপ এবং সকল ধর্মের আশ্রয় স্বরূপ রুপে স্বীকৃত হয়ে থাকে।

ii) ত্রয়ী

আচার্য কৌটিল‍্যের মতে সামবেদ, ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদ- এই তিন বেদকে একত্রে ত্রয়ী বলে। -‘সামৃগযজুর্বেদাস্ত্রয়স্ত্রয়ী।’ কৌটিল‍্যের মতে অথর্ববেদ ও ইতিহাস, মহাভারত, রামায়ণ, পুরাণ ইত্যাদি বেদের অন্তর্গত। শিক্ষা, কল্প, ব‍্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দোবিচিত ও জ‍্যোতিষ বেদাঙ্গ শাস্ত্র বলে ত্রয়ীর অন্তর্গত। ত্রয়ীতে ধর্ম ও অধর্মই প্রধানত প্রতিপাদিত হয়েছে। ত্রয়ীতে ব্রাহ্মণাদি চারবর্ণের এবং ব্রহ্মচর্যাদি চার আশ্রমের পালনীয় কর্ম এবং ধর্ম সুনির্দিষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে। উক্ত ত্রয়ীতে বর্ণাশ্রম ধর্মের যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা লঙ্ঘিত হলে সামাজিক স্থিতি বিপন্ন হয়। তাই কৌটিল‍্যের নির্দেশ-

“তস্মাৎ স্বধর্ম ভূতানাং রাজা ন ব‍্যভিচারয়েৎ

আচার্য কৌটিল‍্য ত্রয়ীর প্রশংসা করে বলেছেন যে সমাজে সদাচার এবং সামাজিক নিয়ম সুপ্রতিষ্ঠিত, যেখানে বর্ণাশ্রম ধর্ম মেনে চলা হয় এবং যে সমাজ ত্রয়ীর বিধান দ্বারা পরিচালিত সেই সমাজ ত্রয়ীর বিধান দ্বারা পরিচালিত সেই সমাজ সুখ সমৃদ্ধি থেকে কখনোই ভ্রষ্ট হয় না।

iii) বার্তা

আচার্য কৌটিল‍্য বার্তা নামক বিদ‍্যার আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন- ‘কৃষিপাশুপাল‍্যে বণিজ‍্যা চ বার্তা’  অর্থাৎ কৃষি, পশুপালন, বানিজ‍্য এই তিনটিকে বার্তা বলা হয়।

আচার্য কৌটিল‍্য এর উপযোগিতা সম্পর্কে বলেছেন-

“ধান‍্যপশুহিরণ‍্যকুপ‍্যবিষ্টিপ্রদানা দৌপকারিকী।”

অর্থাৎ ধান‍্য, পশু, স্বর্ণ, কুপ‍্য অর্থাৎ স্বর্ণরৌপ‍্যাদি ব‍্যতিরিক্ত তাম্র প্রভৃতি তৈজস পদার্থ এবং সারদারু প্রভৃতি অতৈজস পদার্থ এবং বিষ্টি অর্থাৎ কর্মকর প্রদানে সহায়তা করে বলে বার্তা বিদ‍্যা মানব সমাজের প্রভূত উপকার সাধন করে।

বার্তাই রাজ্যের অর্থ ও অর্থনৈতিক উৎসকে উপেক্ষা করলে রাজ্যের কোষাগার রিক্ত থাকবে ও সৈন্যদল বৃদ্ধি পাবে না। সেই জন্য বলা হয় বার্তার দ্বারা উৎপন্ন কোষ ও দন্ডের মাধ্যমে রাজা স্বপক্ষ ও পরপক্ষকে বশীভূত করতে সমর্থ হন।

iv) দণ্ডনীতি

কৌটিল‍্য দণ্ডনীতিতে অর্থশাস্ত্র নামে অভিহিত করেছেন। আবার একে রাজনীতি শাস্ত্রও বলা হয়। দণ্ডনীতির স্বরূপ নির্ণয় প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- ‘আন্বীক্ষিকীত্রয়ীবার্তাণাং যোগক্ষেমসাধনো দণ্ডঃ। তস‍্য নীতির্দণ্ডনীতিঃ।।’ অর্থাৎ আন্বীক্ষিকী, ত্রয়ী ও বার্তা এই তিন বিদ‍্যার যোগক্ষেম সাধন করে দণ্ড। দন্ড প্রয়োগের নীতিকেই বলা হয় দন্ডনীতি। রাজা রাজ্যশাসন পদ্ধতিতে যে সামাজিক উপায় চতুষ্টয় প্রয়োগ করেছেন দন্ড তাদের মধ্যে অন্যতম।  সাম দান ভেদ ব্যর্থ হলে দন্ড প্রয়োগ করা হয়। মনুর মতে দণ্ডই রাজা বা রাজকীয় শক্তি। রাজা তীব্র দণ্ড প্রদান করলে সকল প্রাণীর উদ্বেগের কারণ হবেন। আর মৃদু দণ্ড প্রদান করলে সকল প্রাণী পরাভব বরণ করবে। তাই রাজাকে যথার্থ দন্ডধর হতে হবে।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুসরণে বিদ্যার বিধান নির্দেশ

পরিশেষে মহামতি কৌটিল্য সুষ্ঠুভাবে রাজ্য শাসন পরিচালনার জন্য এবং একজন সার্থক রাজার কর্তব্যরূপে চারটি বিদ্যার বিধান নির্দেশ করে বিশেষ শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

Leave a Comment