অর্থশাস্ত্র: ইন্দ্রিয়জয়ের দোষ গুন বিবেচনা

কৌটিল‍্যের অনুসরনে ইন্দ্রিয়জয়ের দোষ গুন বিবেচনা করে উদাহরন সহকারে বিষয়টি ব‍্যাখ‍্যা কর।
অথবা, ইন্দ্রিয়জয় বলতে কৌটিল‍্য কি বুঝিয়েছেন? কৌটিল‍্য প্রদত্ত ইন্দ্রিয়জয়ে সমর্থ  রাজাদের মঙ্গল এবং তাতে অসমর্থ রাজাদের বিনাশ সম্পর্কে উদাহরন দিতে গিয়ে কৌটিল‍্য প্রদত্ত দৃষ্টান্ত গুলির কয়েকটি উল্লেখ কর?

কৌটিল‍্যের অনুসরনে ইন্দ্রিয়জয়ের দোষ গুন বিবেচনা করে উদাহরন সহকারে বিষয়টি ব‍্যাখ‍্যা

উ:- প্রাচীন ভারতের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ‍্যতা ও সমাজে মূলতঃ ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত। আবার সমস্ত ধর্মের মধ‍্যে রাজধর্ম শ্রেষ্ঠ। এ প্রসঙ্গে মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে- ‘সর্বে ধর্মাঃ রাজধর্মঃ প্রধানাঃ।’ কারণ রাজা হলেন একটি সুবিশাল রাজ‍্যের পরিচালক এবং বর্ণাশ্রম ধর্মের রক্ষক। তাই আচার্য মনু বলেছেন-

‘চতুর্ণামাশ্রমানাঞ্চ ধর্মস‍্য প্রতিভূঃ স্মৃতঃ।’

ইন্দ্রিয়জয় বলতে কৌটিল‍্য কি বুঝিয়েছেন?

রাজ‍্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সুশৃঙ্খলভাবে রক্ষা করে রাজ‍্যশাসন করা এবং প্রজাপুঞ্জকে অনুগত রাখার জন‍্য রাজার জন‍্য রাজার পক্ষে উদ‍্যম্ ইন্দ্রিয় প্রবৃত্তিকে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রিক করা একান্ত আবশ‍্যক। এবং আধ‍্যাত্ম বিদ‍্যার শুরু ও সমাপ্তি এই ইন্দ্রিয় জয়ে, সেই কারনে ইন্দ্রিয়জয় রাজার পক্ষে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

ইন্দ্রিয়জয় হল বিদ‍্যা ও বিনয়ের হেতু স্বরূপ। -‘বিদ‍্যাবিনয়হেতুরিন্দ্রিয়জয়ঃ’ বিদ‍্যান ও বিনয়ী রাজাদের অধিকতর বিনয়গুন সম্পন্ন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মহামতি কৌটিল‍্য।

কাম, ক্রোধ, লোভ,মোহ, মদ ও মাৎসর্য এই ষড়রিপু বর্জনের দ্বারা ইন্দ্রিয়জয় আয়ও করতে হয়।-

অরিষড়বর্গত‍্যাগেন ইন্দ্রিয়জয়ং কুর্বীত।’

চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক এই পঞ্চ ইন্দ্রিয় যথাক্রমে স্ব স্ব ভোগ‍্য বিষয়ে অর্থাৎ রূপ , শব্দ, গন্ধ,রস, স্পর্শের প্রতি প্রবৃত্তি রোধকেই বলা হয় ইন্দ্রিয়জয়। আবার শাস্ত্রে প্রতিপাদিত বিষয়ের অনুষ্ঠানকেও ইন্দ্রিয়জয় বলা হয়।
যে রাজা শাস্ত্রবিহিত কর্তব‍্যের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠান করেন এবং যিনি নিজ ইন্দ্রিয় বর্গকে স্বদেশে আনতে পারেননি, তিনি চতুরান্ত অর্থাৎ চার সমুদ্র বেষ্টিত পৃথিবীর অধীশ্বর হলেও তৎক্ষণাৎ বিনাশ প্রাপ্ত হন। –

‘তদ্বিরুদ্ধবৃত্তিঃ অবশ‍্যেন্দ্রিয়ঃ চাতুরন্তোঅপি রাজা সদ‍্যো বিনশ‍্যতি।।’

কৌটিল‍্য প্রদত্ত ইন্দ্রিয়জয়ে সমর্থ  রাজাদের মঙ্গল এবং তাতে অসমর্থ রাজাদের বিনাশ সম্পর্কে উদাহরন দিতে গিয়ে কৌটিল‍্য প্রদত্ত দৃষ্টান্ত গুলির কয়েকটি উল্লেখ কর?

ইন্দ্রিয়জয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন‍্য কৌটিল‍্য কয়েকজন অসংযমী, ইন্দ্রিয় পরায়ণ রাজার উল্লেখ করে তাদের অকালে ধ্বংসের ঘটনার কথা বলেছেন। যেমন- ভোজবংশীয় রাজা দাণ্ডক‍্য ও বিদেহরাজ করাল ব্রাহ্মণ কন‍্যার প্রতি কামাতুর হওয়ায় ব্রাহ্মণের অভিশাপে সবংশে ধ্বংস হয়েছিলেন। ক্রোধবশতঃ রাজা জনমেজয় ব্রাহ্মণের উপর বিক্রম প্রকাশ করতে গিয়ে এবং রাজা তালজঙ্ঘ ভৃগুদের উপর পরাক্রম প্রদর্শন করতে গিয়ে বিনাশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন।-

” দাণ্ডক‍্যো নাম ভোজঃ কামাত্ ব্রাহ্মণকন‍্যামভিমান‍্যমানঃ সবন্ধুরাষ্ট্রোবিননাশ করালশ্চ বৈদেহঃ। কোপাজ্জনমেজয়ো ব্রাহ্মণেষু বিক্রান্তঃ তালজঙ্ঘশ্চ ভৃগুষু।।”

ইলানন্দন পুরুরবা এবং সৌবীর রাজ অজবিন্দু লোভের বশে ব্রাহ্মণের কাছে অতিমাত্রায় ধন হরন করার জন‍্য ধ্বংস হয়েছিলেন।

“লোভাদৈলশ্চাতুর্বর্ণ‍্যমত‍্যাহারয়ণঃ, সৌবীরশ্চাজবিন্দুঃ।”

লঙ্কাধিপতি রাবণ অভিমান বশতঃ সীতাকে রামচন্দ্রের হাতে ফিরিয়ে না দিয়ে এবং দুর্যোধন ও অভিমানের কারনে পান্ডবদের রাজ‍্য না দিয়ে সবংশে ধ্বংস হন-

‘ মানাদ্ রাবণঃ পরদারান প্রযচ্ছন্ দুর্যোধনঃ রাজ‍্যদংশং চ।।’

গর্ববশতঃ প্রজাদিগকে অপমান করে রাজা ডম্বোদ্ভব নর ও নারায়ণের হাতে এবং হৈহয় রাজ কার্তবীর্যার্জুন পরশুরামের হাতে নিহত হয়েছিলেন-

‘মদাদ্ ডম্বোদ্ভবো ভূতাবমানী, হৈহয়শ্চার্জুনঃ।’

হর্ষের বশীভূত হয়ে বাতাপিনামক অসুর অগস্ত‍্য ঋষিকে অতিমাত্রায় আক্রমণ করে এবং বৃষ্ণিসংঘও ব‍্যাসদেবকে অনুরূপভাবেই আক্রমন করে বিনাশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন-

‘ হর্ষাদ্ বাতাদপিরগস্ত‍্যত‍্যাসাদয়ন্, বৃষ্ণিসংঘশ্চ দ্বৈপায়নমিতি।।’

বিপরীতপক্ষে, শত্রুষড়বর্গ বা কামাদি রিপুকে জয় করে জিতেন্দ্রিয় জামদগ্নির পুত্র পরশুরাম, রাজা অম্বরীষ ও নাভাগ দীর্ঘকাল পৃথিবী ভোগ ও শাসন করেছিলেন –

“শত্রষড্ বর্গমুতসৃজ‍্য জামদগ্ন‍্যে জিতেন্দ্রিয়ঃ অম্বরীষশ্চ নাভাগো বুভুজাতে মহীম্।”

ব্রহ্মাচর্যাশ্রমে পালনীয় ধর্ম সমূহের মধ‍্যে ইন্দ্রিয় জয়ের কথা থাকা সত্ত্বেও রাজধর্মে আবার ইন্দ্রিয়জয় উল্লেখ করার ব‍্যাপারে টীকাকার কুল্লূখ ভট্ট বলেছেন-

‘ব্রহ্মচারিধর্মেষু সর্বপুরুষোপাদেয়তয়াঅভিহিতোঅপি ইন্দ্রিয়জয়ো রাজধর্মেষু মুখ‍্যত্ব জ্ঞানার্থমনন্তরবক্ষ‍্যমান ব‍্যসন নিবৃত্তি হেতুত্বাচ্চ পুনরুক্তঃ।’

অর্থাৎ রাজধর্ম সমূহের মধ‍্যে ইন্দ্রিয়জয়ই যে মুখ‍্য ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অবশ‍্য পালনীয় কর্তব‍্য তা বোঝানোর জন‍্য এবং ইন্দ্রিয় জয় যে বক্ষ‍্যমান ব‍্যসন অর্থাৎ অত‍্যধিক ইন্দ্রিয়াসক্তি থেকে নিবৃত্তি থাকার একমাত্র উপায় তা প্রতিপাদনের জন‍্য পুনরায় ইন্দ্রিয় জয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরন প্রসঙ্গে আচার্য মনুর মতটি উল্লেখ করলেও অবান্তর হবে না-

” বহবোঅবিনয়ান্নষ্টা রাজান্ সপরিচ্ছেদাঃ। বনস্থা অপি রাজ‍্যানি বিনয়াৎ প্রতিপেদিরে।।”

অর্থাৎ অবিনয় হেতু অর্থাৎ আত্মসংযমের অভাব হেতু ধনসম্পত্তি যুক্ত হয়েও অনেক নরপতি বিনষ্ট হয়েছেন। যেমন- বেন, নলুষ, পিজবন পুত্র সুদা-

” বেনো বিনষ্টোঅবিনয়ান্নহুষশ্চৈব পার্থিবঃ। সুদাঃ পৈজবনশ্চৈব  সুমুখো নিমিরেব চ।।”

অপরদিকে, অনেক নরপতি বনবাসী হয়েও বিনয় বশতঃ অর্থাৎ আত্মসংযমের হেতু রাজ্য লাভ করেছেন। যেমন পৃথু ও মনুর রাজ‍্যলাভ  এবং ধনসম্পত্তি লাভ করেছিলেন। কুবের ও  বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছিলেন-

” পৃথুশ্চ বিনয়াদ্ রাজ‍্যং প্রাপ্তবান্ মনুরেব চ।
কুবেরশ্চ ধনৈশ্বর্যং ব্রাহ্মণ‍্যঞ্চৈব গাধিজঃ।।”

এ প্রসঙ্গে আচার্য মনু বলেছেন যে ইন্দ্রিয় গণকে বশে রাখার জন‍্য দিবারাত্র রাজা যত্ন করবেন। কেননা, একমাত্র জিতেন্দ্রিয় রাজাই সুশাসক রূপে দীর্ঘকাল পৃথিবী শাসন করতে পারেন এবং প্রজাদের সুখী করতে পারেন-

“ইন্দ্রিয়াণাং জয়ে যোগং সমাতিষ্ঠেদ্দিবানিশম্ জিতেন্দ্রিয়ো হি শক্নোতি বশে স্থাপয়িতুং প্রজাঃ।”

পরিশেষে প্রাচীন স্মৃতিকার, ধর্মশাস্ত্রকার ও নীতিশাস্ত্রকারদের সাথে সহমত পোষন করে বলা যায় যে মহামতি কৌটিল‍্য জিতেন্দ্রিয় রাজা রূপে ইন্দ্রিয় জয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

Leave a Comment