স্বপ্নবাসবদত্তম্:(প্রথম অঙ্ক) ব্রহ্মচারীর চরিত্রটির অবতারনার নাটকীয় তাৎপর্য

‘ স্বপ্নবাসবদত্তম্’ নাটকের প্রথম অঙ্কে ব্রহ্মচারীর চরিত্রটির অবতারনার নাটকীয় তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।

স্বপ্নবাসবদত্তম্ নাটকের প্রথম অঙ্কে ব্রহ্মচারীর চরিত্রটির অবতারনার নাটকীয় তাৎপর্য


উ:- সংস্কৃত সাহিত‍্যের জগতে নাট‍্যকার ভাসের উজ্জল জ্যোতিষ্ক স্বরূপ। মহাকবি কালিদাস, কবি বানভট্ট, রাজশেখর প্রভৃতি সংস্কৃত সাহিত্যের প্রতিভাবান কবিদের মধ্যে মহাকবি ভাস উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করেছেন। মহাকবি ভাসের তেরখানি নাটক রচনা সম্বন্ধে পন্ডিত মহলে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। তথাপি  এই বিতর্কের মধ্যে না গিয়ে কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এই তেরখানি  নাটকের বিষয়বৈচিত্র ও নাটকীয় নৈপুণ্যের দিক দিয়ে উন্নত মানের নাট্য প্রতিভার পরিচয় বহন করে। এই ১৩খানি নাটকের মধ্যে স্বপ্নবাসবদত্তম্ নাটকটি শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে। আলংকারিক রাজশেখরের সূক্তি রত্নাবলিতে ভাসের নাট্য প্রতিভা সম্বন্ধে বলা হয়েছে

” ভাসনাটকচক্রেঅপি ছেকৈঃ ক্ষিপ্তে পরীক্ষিতুম্
স্বপ্নবাসবদত্তস‍্য দাহকোঅভুন্ন পাবকঃ।।”

‘স্বপ্নবাসবদত্তম্ ‘ নাটকটির বিষয়বস্তু প্রাচীন উদয়ন কথা থেকে সংগৃহীত হয়েছে। শত্রুরাজ আরুনি বৎসরাজ আক্রমণ করে উদয়নকে পরাস্ত ও রাজ‍্য থেকে বিতাড়িত করেন। উদয়ন ও তাঁর স্ত্রী বাসবদত্তা সহ লাবাণক গ্রামে শিবির স্থাপন পূর্বক বাস করতে লাগলেন। তৎসময় রাজার বিচক্ষণ, তীক্ষ্ণধী কূটনীতিজ্ঞ প্রধান মন্ত্রী যৌগন্ধরায়ণ প্রভুর হৃতরাজ‍্য পুনরূদ্ধার কল্পে তৎপর হয়ে উঠলেন। এবং শক্তিশালি মগধরাজ দর্শকের ভগিনী পদ্মাবতীর সঙ্গে উদয়নের দৈবজ্ঞগণের ঘোষনা অনুযায়ী দ্বিতীয় বিবাহ দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু স্ত্রী বাসবদত্তার জীবিত অবস্থায় উদয়ন যে দ্বিতীয় বিবাহ করতে রাজি হবেন না তা যৌগন্ধরায়ণ জানতেন, তাই তিনি বাসবদত্তার সম্মতি নিয়ে এক গোপন পরিকল্পনা করলেন, সেই পরিকল্পনা অনুসারে একদা রাজা উদয়ন মৃগয়ায় বহির্গত হলে মন্ত্রী যৌগন্ধরায়ণ লাবাণক গ্রামে অগ্নি সংযোজনের ঘটনা ঘটিয়ে মিথ‍্যা সংবাদ রটনা করা হল যে- বাসবদত্তা ও যৌগন্ধরায়ণ উভয়েই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছেন। শোকবিহ্বল রাজ‍া  উদয়নকে সামলাবার ভার অন‍্যান‍্য অমাত‍্যগণের উপর দিয়ে যৌগন্ধরায়ণ ও বাসবদত্তা ছদ্মবেশে সেখান থেকে নির্গত হয়ে মগধরাজ্যের প্রান্তবর্তী তপোবনে প্রবেশ করলেন এবং যৌগন্ধরায়ন ধর্মপ্রিয়া রাজকুমারী পদ্মাবতীর কাছে বাসবদত্তাকে গচ্ছিত রাখবার প্রার্থনা জানালে তা তিনি  স্বীকার করে নিলেন।
          ঠিক সেই সময়ে লাবাণক গ্রাম থেকে আগত এক ব্রহ্মচারী এসে আশ্রমে প্রবেশ করলেন। এই ব্রহ্মচারী লাবাণক গ্রামে বেদ অধ্যয়নের জন্য গিয়েছিলেন কিন্তু সেখানে এক নিদারুন অগ্নি সংযোগের ফলে তিনি বেদপাঠ অসমাপ্ত রেখে সে স্থান ত্যাগ করেন-

” শ্রুতিবিশেষণার্থং বৎসভূমৌ লাবাণকং নাম গ্রামস্তত্রোষিতবানস্মি। তত্র খলু অতিদারুণং বাসবনং সংবৃত্তম্।”

সেই সময় মন্ত্রী যৌগন্ধরায়ণ তার কাছে সেই বিপদ বার্তা জানতে চাইলে তিনি বলেন যে লাবাণক গ্রামে উদয়ন পত্নী বাসবদত্তা ও মন্ত্রী যৌগন্ধরায়ণ রাজার অনুপস্থিতিতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন- রাজা উদয়ন প্রত‍্যাবর্তনের পর জানতে পারলেন যে, তাঁর প্রিয়তমা পত্নী বাসবদত্তা মৃত। সেই সংবাদ পেয়ে রাজা গভীর শোকে বিহ্বল হয়ে পড়লেন-

” হা বাসবদত্তে! হা অবন্তিরাজপুত্রি! হা প্রিয়ে! হা প্রিয়শিষ‍্যে!”

এই বলে বিলাপ করতে থাকলেন। কখনো আবার শোকের তীব্র আঘাত সহ‍্য করতে না পেরে মূর্ছিত হয়ে পড়েছেন, পুনরায় সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে সে আগুনে আত্মহুতি দিতে উদ‍্যত হলে, অমাত‍্য রূমন্বানের প্রয়াসে ব‍্যর্থ হন। এখন অমাত‍্য রূমন্বান দিবারাত্র অসহায় রাজার সেবা পরিচর্যা করে চলেছেন।

ব্রহ্মচারী বৃত্তান্তটি অবতারনার মাধ্যমে কয়েকটি নাটকীয় উদ্দেশ‍্য সাধন

এইভাবে স্বপ্নবাসবদত্তম্ নাটকের প্রথম অঙ্কে বর্ণিত ব্রহ্মচারী বৃত্তান্তটি শুধুই একটি ঘটনা মাত্র নয়। নাট্যকার ভাস এই বৃত্তান্তটির অবতারনার  মাধ্যমে কয়েকটি নাটকীয় উদ্দেশ‍্য সাধন করেছেন। তা নিম্নে  আলোচনা করা হল-

  • প্রথমত, অগ্নিকাণ্ডের পর লাবাণক গ্রামের বৃত্তান্ত যৌগন্ধরায়ণ,  বাসবদত্তা এবং  পদ্মাবতী স্বকর্ণে শুনলেন এবং সকলের উপর এর প্রভাব পড়ল।
  • দ্বিতীয়ত, লাবাণকে অগ্নিকান্ডের বাসবদত্তা এবং যৌবনধরায়ন দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন – এই বার্তা চারদিকে প্রচারিত হওয়ায় বিচক্ষণমন্ত্রী যৌগন্ধরায়নের গোপন পরিকল্পনাগত প্রয়াস সার্থক হয়েছে।
  • তৃতীয়ত, প্রিয়তমা বাসবদত্তার শোকে কাতর ও অসহায় রাজা উদয়ন অমাত‍্য রুমন্বান কর্তৃক নিরন্তন সেবিত হচ্ছেন জেনে যৌগন্ধরায়ন ও বাসবদত্তা উভয়ে আশ্বস্ত হয়েছেন- ” দিষ্ট‍্যা সুনিশ্চিত ইদানীমার্যপুত্রঃ।”
  • চতুর্থত, অগ্নিদগ্ধ হয়ে বাসবদত্তার আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত জীবনাবসনের শোকে রাজা উদয়ন উন্মাদের মত প্রলাপ করছেন শুনে অবন্তিকার বেশধারিনী বাসবদত্তা নিজেকে ধন্য মনে করলেন- ” জানামি জানাম‍্যার্যপুত্রস‍্য ময়ি সানুক্রোশত্বম্।”
  • পঞ্চমত, বাসবদত্তার প্রতি রাজা উদয়নের প্রণয় এত গভীর ও নিবিড় ছিল যে, বাসবদত্তা জীবিত থাকলে রাজা অন্য কোন রাজকন্যার পানি গ্রহণ করবেন না – তা পদ্মাবতী বুঝতে পেরেছিলেন, কিন্তু সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডে বাসবদত্তা দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, এতে উদয়নের পুনর্বিবাহের পথ প্রশস্ত হল এবং পদ্মাবতী রাজা উদয়নের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতে লাগলেন – ” মম হৃদয়েনৈব সহ মন্ত্রিতম্।” সুতরাং বৎসরাজ উদয়নের প্রতি মগধরাজ কন‍্যা পদ্মাবতীর হৃদয়ে অনুরাগ রঞ্জিত প্রবণতা সঞ্চারের উদ্দেশ্যেও ব্রহ্মচারী চরিত্রটির অবতারণার প্রয়োজন ছিল।
  • ষষ্ঠত, ব্রহ্মচারী ইতিবৃত্ত থেকে নাটকের নায়ক উদয়নের চরিত্রের যে পরিচয় দর্শকগণ পায় তা বিশেষ আকর্ষণীয়। ব্রহ্মচারীর উক্তি শুনে তাপসী মন্তব্য করেছেন- “স খলু গুনবান্ নাম রাজা য আগন্তুকেনাপি অনেন এবং প্রশস‍্যতে।” অন্যদিকে লাবাণক গ্রাম থেকে উদয়নকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর সমগ্র গ্রামের যেন শ্রীহীন অবস্থা – “ততঃ নিষ্ক্রান্তে রাজনি প্রোষিতনক্ষত্রচন্দ্রমিব নভঃ অরমণীয়ঃ সংবৃত্তঃ স গ্রামঃ।”

সুতরাং বিভিন্ন দিক দিয়ে বিচার করলে স্বপ্নবাসবদত্তম্  নাটকের  প্রথম অঙ্কে ব্রহ্মচারীর প্রবেশমূলক অপ্রধান ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে।

Leave a Comment