ভট্টিকাব‍্যের দ্বিতীয় সর্গে রামকর্তৃক শরৎকালের বর্ণনা

ভট্টিকাব‍্যের দ্বিতীয় সর্গে রামকর্তৃক দৃষ্ট শরৎকালের বর্ণনা দাও।কবি ভট্টি শরৎঋতুর এক অপূর্ব সৌন্দর্য বর্ণনায় নিজেকে যেন প্রকৃতির সঙ্গে উজোড় করে দিয়েছেন। এই শরৎকালের বর্ণনা আলোচনা করা হল।

ভট্টিকাব‍্যের দ্বিতীয় সর্গে রামকর্তৃক দৃষ্ট শরৎকালের বর্ণনা


উ:- মহাকবি কালিদাসোত্তর যুগের  পরবর্তীকালে যে কয়েকজন মহাকবির আবির্ভাব হয়েছিল তাদের মধ্যে কবি ভট্টি অন‍্যতম উজ্জ্বল জ‍্যোতিষ্ক স্বরূপ। তাঁর রচিত ভট্টিকাব‍্য ২২ টি সর্গে রচিত। কবি ভট্টি শরৎঋতুর এক অপূর্ব সৌন্দর্য বর্ণনায় নিজেকে যেন প্রকৃতির সঙ্গে উজোড় করে দিয়েছেন। যদিও কালকে প্রত‍্যক্ষ করা যায় না তথাপি প্রকৃতি জগতের কালের আবির্ভাব ব‍্যঞ্জক, বিবিধ ও বিচিত্র চিহ্ন বা প্রকাশ থেকে কালের উপস্থিতি বোধগম‍্য হয়। এই প্রসঙ্গে প্রখ‍্যাত টীকাকার ভরত মল্লিকের উক্তিটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ- 

” যদ‍্যপি কালস‍্য প্রত‍্যক্ষতা নাস্তি তথাপি তদ্ব‍্যঞ্জক লিঙ্গাদিদর্শনাৎ তথা ব‍্যপদেশাঃ।”

এছাড়াও জয়মঙ্গলা টীকায়ও বলা হয়েছে-

“কালস‍্য অপ্রত‍্যক্ষত্বাৎ কার্যনাং দর্শনাৎ তদ্ দর্শনমিতি মন‍্যতে।।”

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে আদি কবি বাল্মিকীর রামায়ণে শরৎকালের বর্ণনা রয়েছে, মহাকবি কালিদাসেরঘুবংশে ও ঋতুসংহারে ও  এক অপূর্ব চিত্র ফুটে উঠেছে।  এছাড়াও মহাকবি ভারবি রচিত কিরাতার্জ্জুনীয়ম্   মহাকাব্যে শরদ্বর্ণনা প্রকাশিত হয়েছে। মহাকবিরা প্রত্যেকেই স্ব স্ব দৃষ্টিকোণ থেকে আপন আপন কবি শক্তি বলে শরতের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা স্বাদে ভিন্ন ভিন্ন হলেও বর্ণনার উপাদানসমূহে মোটামুটি অভিন্ন। মহাকবির লেখনীর স্পর্শে সেই শরৎপ্রকৃতি সজীব ও মনোহারিনী।

রামকর্তৃক দৃষ্ট শরৎকালের বর্ণনা

যুদ্ধাভিগামী রামচন্দ্রও সর্বেন্দ্রীয় সুখকর শর‍ৎশোভা দেখতে দেখতে পথশ্রম ভুলে গেছেন, তা সত্ত্বেও রামচন্দ্র আরও মনোযোগ সহকারে প্রত‍্যক্ষ করেছেন শরৎসৌন্ধর্যের লীলামাধূর্য। কবির ভাষায়-

   বনস্পতীনাং সরসাং নদীনাং
   তেজস্বিনাং কান্তিভৃতাং দিশাঞ্চ
   নির্যায় তস‍্যাঃ স পুরঃ সমন্তাৎ
   শ্রিয়ং দধানাং শরদং দদর্শ।।”

শর‍ৎ সমূহের বর্ণনায় জলাশয় সমূহের প্রস্ফুটিত রক্তাপদ্মের উপর ভ্রমর গুঞ্জনের শোভা এই মধুলোপী ভ্রমরদের পুষ্পে পুষ্পে এরূপ আনাগোনা কবির ভাষায় এ যেন ধূম্রবেষ্টিত চঞ্চল অগ্নিশিখা-

  ” তরঙ্গসঙ্গাচ্চপলৈঃ পলাশৈ
    র্জ্বালাশ্রিয়ং সাতিশয়ং দধন্তি
    সধূমদীপ্তাগ্নিরুচীনি রেজু
    স্তাম্রোৎপলান‍্যাকুলষট্ পদানি।।”

শরৎকালে কি জল, কি স্থল সর্বত্রই বিচিত্র বর্ণের বিবিধ কুসুমের অজস্র সমারেোহ। নদীতীরে সমূহ স্বীয় বনরাজিকে নির্মল জলে প্রতিবিম্বিত হতে দেখে জল তাদের পুষ্প সম্পদ অপহরন করেছে বিবেচনা করে যেন জলপদ্মের মত স্থলপদ্ম বিকাশের দ্বারা সৌন্দর্য বিস্তার করতে লাগল। যেমন-

    “বিম্বাগতৈস্তীরবনৈঃ সমৃদ্ধিং
    নিজাং বিলোক‍্যাপহৃতাং পয়োভিঃ
    কুলানি সামর্ষতয়েব তেনুঃ
    সরোজলম্মীং স্থলপদ্মহাসৈঃ।।”

শরৎ প্রভাতের বর্ণনায় কবি প্রকৃতির মানবীকরণ করে কল্পনা করেন যে চন্দ্রবিরহিনী  কুমুদ্বতীব দুঃখে কাতর হয়ে তটস্থিত বৃক্ষ সমবেদনায় অশু বর্ষণ করছে।  বৃক্ষ পত্রাগ্রভাগ থেকে প্রভাতে ঝরে পড়া শিশির বিন্দু গুলি তার অশ্রু, বৃক্ষশাখার পক্ষিকুলের কলরব তার ক্রন্দনধ্বনি তখন ব্যাকরণের কাঠিন্য ছাপিয়ে এক মরমী কবির অন্তরে প্রতিফলিত হয়-

” নিশাতুষারৈর্নয়নাম্বুকল্পৈঃ
   পত্রান্তপর্যাগলদচ্ছবিন্দুঃ।
   উপারুরোদেব নদৎপতঙ্গঃ
   কুমুদ্বতীরং তীরতরুর্দিনাদৌ।।”

আবার কুমুদিনী পরাগলাঞ্ছিত ভ্রমরকে প্রভাত বায়ুর আঘাতে কম্পিতা পদ্মিনী তার নিকটে আসতে দিচ্ছে না দেখে প্রাকৃতিক দৃশ‍্যে অভিভূত কবি যখন পদ্মিনী খন্ডিতা নায়িকা রূপে কল্পনা করেন তখন তাঁর অসাধারণ কবি সত্তা আমাদের মুগ্ধ করে দেয়-

” প্রভাতবাতাহতিকম্পিতাকৃতিঃ
  কুমুদ্বতীরেণুপিশঙ্গবিগ্রহম্।
  নিরাসভৃঙ্গং কুপিতেব পদ্মিনী
  ন মানিনীশং সহতেঅন‍্য সঙ্গমম্।।”

শারদ প্রভাতে ভ্রমরগণের মধুর গুঞ্জরনের প্রতি আকৃষ্ট চিত্ত নিশ্চল হরিণকে বধ করতে ইচ্ছুক হলেও, ব‍্যাধ ক্রীড়াসক্ত হংসসমূহের নিনাদ শ্রবণ করতে করতে মুগ্ধ হয়ে লক্ষ‍্যের প্রতি মনের একাগ্রতা রক্ষা করতে ব‍্যর্থ হল। শরৎকালের মধুর গুঞ্জন ও হৃদয়গ্রাহী নিনাদের এমন আশ্চর্যরকম মাদকতা। যেমন-

   ” দত্তাবধানং মধুলেহিগীতৌ
     প্রশান্তচেষ্টং হরিণং জিঘাংসু
     আকর্ণয়ন্নুৎসুকহংসনাদান্
     লক্ষে সমাধিং ন দধে মৃগাবিৎ।।”

শরৎকালে বর্ণসমীকরণের এক অপূর্ব চিত্রও  এবর্ণনায় দুর্লভ নয়, যেমন শ্বেতপদ্ম সমূহে এবং শুভ্র ফেন পুঞ্জাবৃত সৈকতদেশী সমূহে  নিলীন কুন্দ ধবল কলহংসশ্রেনী অদৃশ‍্য হওয়ায় নিনাদের দ্বারাই কেবল তাদের অবস্থান প্রকাশ পেল। তাই বৈয়াকরণ কবি বলেন-

  ” সিতারবিন্দপ্রচয়েষু লীনাঃ
    সংসক্তফেনেষু চ সৈকতেষু।
     কুন্দাবদাতাঃ কলহংসমালাঃ
     প্রীতিয়িরে শ্রোতসুখৈর্নিনাদৈঃ।।”

শরৎকালের অপূর্ব বর্ণনা একটি উপমা বা সাদৃশ‍্যের দৃষ্টান্ত দেখা যায়, জলপূর্ণ গিরিগহ্বরে কোন এক সিংহ স্বকৃত গর্জনের প্রতিধ্বনি শুনে তাকে অন‍্য সিংহের গর্জন মনে করে ক্রোধে উল্লম্ফনের জন‍্য প্রস্তুত হল-

”  গর্জন্ হরিঃ সাম্ভসিশৈলকুঞ্জে
   প্রতিধ্বনীনাত্মকৃতান্দ নিশম‍্য।
   ক্রমং ববন্ধ ক্রমিতুং সকোপঃ
    প্রতর্কয়ন্নন‍্যমৃগেন্দ্রনাদান্।।”

শারদশোভার বর্ণনায় উপসংহার অপূর্ব হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে  একাবলী অলংকারের মাধ‍্যমে। যেমন- এমন কোন জলাশয় ছিল না যাতে মনোহর পদ্ম বিকশিত হয়নি, এমন কোন পদ্ম ছিল না যাতে ভ্রমর উপবিষ্ট হয়নি, এমন কোন ভ্রমর ছিল না যা মধুর সুরে গুঞ্জন করেনি, এমন কোন গুঞ্জন ছিল না যা সকলের মন হরণ করেনি। কবির ভাষায় বলি-

  ” ন তজ্জলং যন্ন সুচারুপঙ্কজম্
   ন পঙ্কজং তদ্ যদলীনষট্ পদম্।
   ন ষট্ পদোঅসৌ ন জুগুঞ্জ যঃ কলং
   ন গুঞ্জিতং যন্ন জহার যন্মনঃ।।”

এভাবে রামচন্দ্র তাঁর যাত্রা পথে সর্বেন্দ্রিয় সুখকর শরৎশোভা প্রত্যক্ষ করে পথশ্রম বিস্মৃত হয়েছিলেন।  ব্যাকরণ শিক্ষার উদ্দেশ্যে এই কাব্য রচিত হলেও ভট্টির কাব্য প্রতিভায় এই শরৎবর্ণনা  ভাস্বর।

Leave a Comment