শরৎবর্ণনম্ পাঠ্যাংশ অনুসারে যেভাবে শরৎকালের বর্ণনা

শ্রিয়ং বিভজাদ‍্য শরৎ প্রবৃত্তা– উপরিউক্ত উক্তিটি পরিপ্রেক্ষিতে তোমার শরৎবর্ণনম্ পাঠ্যাংশ অনুসারে যেভাবে শরৎকালের বর্ণনা করেছিলেন তার নিজের ভাষায় লেখ।


বিভাতি লক্ষ্মীঃ বহুধার্বিভক্তা- উপরিউক্ত উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে রামচন্দ্র যেভাবে শরৎকে দেখেছেন তা নিজের ভাষায় লেখ।

ভূমিকা-

আদি কবি বাল্মিকী রচিত রামায়ণম্ মহাকাব্যে ভারতবাসীর কাছে গৌরব। প্রকৃতির শোভা চিত্রণে এবং মানুষের বিচিত্র ভাবের সঙ্গে সহমীতার আবেগে ধ্বনিত হয়েছে,এই রামায়ণের অন্তর্গত কিষ্কিন্ধাকান্ডের ত্রিংশতম সর্গে বর্ণিত আলোচ্য কয়েকটি শ্লোকে। এখানে কবি শরদলক্ষ্মীর  এক অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা রামচন্দ্রের মাধ্যমে দিয়েছেন। বর্ষার শরতের আবির্ভাবে বিশ্ব প্রকৃতির অপরূপ বৈচিত্র দেখা যায় তারও একটি সুন্দর ভাষাচিত্র রামচন্দ্র লক্ষণের কাছে তুলে ধরেছেন।

শরৎবর্ণনম্ পাঠ্যাংশ অনুসারে শরৎকালের বর্ণনা


       পদ্মপলাশাক্ষী সীতাকে হারিয়ে রামচন্দ্র সীতার চিন্তায় মগ্ন থেকে মলীন বদনে শরৎকালীন সৌন্দর্য বর্ণনার ছলে নিজের সীতা বিরহ জনিত মনোব্যথাকে অপূর্ব ব্যঞ্জনার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। রামচন্দ্রের দৃষ্টিতে মেঘের দেবতা ইন্দ্র, বৃষ্টি দ্বারা পৃথিবিকে তৃপ্ত ও শস‍্যশালিনী করে কৃতকার্য হয়েছেন।

 “নীলোৎপলদলশ‍্যামাঃ শ‍্যামীকৃত্বা দিশোদশ।
বিমদা ইব মাতঙ্গা শক্তিবেগাঃ পয়োধরাঃ।।”

অর্থাৎ নীলপদ্মের পাপড়ির মতো যে মেঘগুলি দশদিক অন্ধকার করে রাখত তারা মদহীন হস্তির মতো বেগশূন‍্য শান্ত হয়েছে।
     

এইসময় মেঘের গুরু গম্ভীর গর্জন, হাতির ব্রিংহন ধ্বনি, ময়ূরের কেকাবর, ঝর্নার  ঝরঝরে শব্দ শোনা যায় না।তারা সকলে শ্রান্ত, ক্লান্ত হয়ে নিঃশব্দে অবস্থান করছে।


 “শাখাসু সপ্তচ্ছদপাদপানাং
প্রভাসু তারার্ক নিশাকরানাম্।।
লীলাসু চৈবোত্তম বারণানাম্।
শ্রিয়ং বিভজ‍্যাদ‍্য শরৎপ্রবৃত্তা।।”

     অর্থাৎ শরতের ছাতিম গাছের শাখায় শাখায় চন্দ্র, সূর্য, তারার প্রভায়, গজকুলের আনন্দলীলায় তার সৌন্দর্য বিস্তার আবির্ভূত হয়েছে।


       ক্রীড়ন্তি হংসা সহঃ চক্রবাকৈ   অর্থাৎ নদীগুলির বেলাভূমিতে এসে চক্রবাক পক্ষীর সাথে খেলা করে। মেঘহীন আকাশে ময়ূরেরা পেখম না মেলে প্রিয়ার প্রতি অনাসক্ত বসত ধ‍্যানৎপরা হয়ে তপস্বীর মতো বনে বাস করছে। প্রিয়তমা হস্তী ধ্বনির মতো ছাতিম ফুলের গন্ধে উন্মাদ কামভোগ সম্পন্ন মদমত্ত হস্তিগুলির গতি মন্দ হয়েছে।


       হাঁসগুলি কর্দমশূন‍্য বালুকাময় স্বচ্ছলীলা নদীগুলিও আনন্দচিত্তে লাফিয়ে পড়ছে।  স্তব্ধ হয়েছে নির্ঝরের ধ্বনি বায়ুর গর্জন ও ভেকেদের  ডাক। দীর্ঘদিন অনাহারে কাটিয়ে মৃতপ্রায় বিষধর সর্পগুলি পুনরায় গর্তের বাইরে খাদ্যের অন্বেষণে বেরিয়ে আসছে। শরৎ রজনীতে উদিয়মান চন্দ্র যেন তার মুখ, নক্ষত্রগুলি যে তার সচকিত দৃষ্টি। জ্যোৎস্না যেন তার শ্বেতবস্ত্র, এভাবে শরৎ রাত্রিকে শ্বেতবস্ত্র পরিহীতা নারীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। সুপক্কশালি ধান খেয়ে বলকা শ্রেণী অত্যন্ত আনন্দের সাথে বাতাসে কাঁপা মালার মতো ধারণ করে উড়ে যাচ্ছে। শরতে কুমুদ শোভিত বিশাল সরোবরগুলি রাত্রে নক্ষত্রখচিত আকাশের মতো শোভা পাচ্ছে।

নদীর তীরগুলি বায়ুর হিল্লোলে কম্পিত শুভ্রকাশকুসুমে আচ্ছন্ন থাকায় মনে হচ্ছে যেন ধৌত বিমল পট্ট বস্ত্র পরিধান করেছে। নির্মল জল, ফুলের হাসি  ক্রোঞ্চ পক্ষীর ডাক,সুপক্ক শালীধান, নির্মল চন্দ্র, মৃদু মন্দ বাতাস এ সবই বলে দিচ্ছে  শরৎ এর সমাগম। মেঘসমূহ বর্ষন পৃথিবীকে তৃপ্ত করে নদী জলাশয়গুলিকে পূর্ণ করে ধরনীকে শস‍্য শ‍্যামল করে আকাশ ছেড়ে চলে গেছে।


উপসংহার:-

এভাবে রামচন্দ্র শরৎলক্ষ্মীর অপরূপ বর্ণনা লক্ষণের কাছে সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন। আদি কবির এই শরদ বর্ণনা পরবর্তীকালে মহাকাব্যিকদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আদিকবির এই শরদ বর্ণনা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও মনোরম।

Leave a Comment