শিশুপালবধম্ মহাকাব্যে বর্ণিত উদ্ধবের উক্তি সংক্ষেপে বর্ণনা কর এবং এ প্রসঙ্গে বক্তার চরিত্র অঙ্কন কর।
শিশুপালবধম্ মহাকাব্যে বর্ণিত উদ্ধবের উক্তি সংক্ষেপে বর্ণনা কর এবং এ প্রসঙ্গে উদ্ধবের চরিত্র অঙ্কন কর
ভূমিকা:- একদিকে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে যোগদানের আমন্ত্রণ, অন্যদিকে চেদিরাজ শিশুপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা এই দুই কার্যের মধ্যে কোনটি আগে করণীয়- তা স্থির করতে না পেরে শ্রীকৃষ্ণ অগ্রজ বলরামের সঙ্গে ও মহামতি উদ্ভবের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য মন্ত্রণাগৃহে প্রবেশ করলেন। সেখানে বলরাম অতিসত্বর শিশুপালকে বধ করা উচিত বলে মহামত জানালেন। বলরামের বক্তব্য শোনার পর শ্রীকৃষ্ণ মহামতি উদ্ভবকে কিছু বলার জন্য অনুমতি প্রদান করলেন। শ্রীকৃষ্ণের ইঙ্গিতে উদ্ভব তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন।
শিশুপালবধম্ মহাকাব্যে বর্ণিত উদ্ধবের উক্তি সংক্ষেপে বর্ণনা
উদ্ভব প্রথমেই বক্তা বলরামের উক্তিকে সিদ্ধান্ত দিয়েও বললেন যে, যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ তাকে গুরুজন বলে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন, তাই শ্রদ্ধায় আকৃষ্ট হয়েই তিনি কিছু বলতে পরিচিত হয়েছেন।
লরামের মতকে খন্ডন করার জন্য উদ্ধবের উক্তি
এরপর তাঁর সমস্ত কথাই বলরামের মতকে খন্ডন করার জন্য উক্ত হয়েছে। নিজমত প্রকাশের শুরুতেই তিনি শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে বললেন যে, নিজের মধ্যে বুদ্ধি ও উৎসাহ সৃষ্টি করার জন্য চেষ্টা করা তাঁর কর্তব্য। কারন এদুটি বিজিগীষু রাজার শক্তির মূল কারণ।
বলরামের প্রতি উদ্ধবের উক্তি
এরপর বলরামের প্রতি বচনবান নিক্ষেপ করে তিনি বলেছেন-
” স্পৃশন্তি শরবৎ তীক্ষ্ণাঃ স্তোকমন্তার্বিশন্তি চ।
বাহুস্পৃশাপি স্থূলেন স্থীয়তে বহিরশ্মবৎ।।”
অর্থাৎ তীক্ষবুদ্ধি ব্যাক্তিরা বানের মতো অল্প জায়গা স্পর্শ করে খুব ভিতরে প্রবেশ করেন, কিন্তু মন্দবুদ্ধি ব্যাক্তিরা বেশি জায়গা স্পর্শ করেও বাইরেই থেকে যান।
রাজনীতি জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে উদ্ধবের উক্তি
এরপর তিনি রাজনীতি জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে বললেন-
“বুদ্ধিশস্ত্রঃ প্রকৃত্যঙ্গো ঘনসংবৃত্তি কঞ্চুকঃ।
চারেক্ষণো দূতমুখো পুরুষঃ কোঅপি পার্থিবঃ।।”
অর্থাৎ বুদ্ধিই রাজার অস্ত্র, অমাত্যাদি প্রভৃতি অঙ্গ, মন্ত্রগুপ্তি হল কবচ, চরেরা হল চক্ষু আর দূতেরা হর মুখ। এমন রাজা একজন বিলক্ষণ পুরুষ রাজার কালজতা সম্পর্কে বলেছেন, রাজার কখনো একান্তভাবে তেজ বা ক্ষমা -এদের কোনো একটিমাত্র আশ্রয়নীয় নয়। প্রদীপ যেমন তার মধ্যবর্ত্তী বাতির দ্বারা তেল গ্রহণ করে, তেমনি মৃদুতার দ্বারা আবৃত তেজ সিদ্ধিলাভ সমর্থ হয়।
সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হয়ে উদ্ধবের উক্তি
এরপর সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হয়ে বললেন, চেদিরাজ একাকী ভেবে তাকে কখনো জয় করা সম্ভব বলে মনে করা যায় না। কারণ রাজযক্ষার মতো শিশুপাল বহু রাজার সমষ্টি। তাই উদাত্ত স্বর যেমন অন্য স্বরকে বিনাশ করে, তিনিও সেরূপে একবার পদক্ষেপের দ্বারা মুহূর্তেই শত্রুদের বিনাশ করতে পারেন।
তাছাড়াও রুক্মি, কালযবন শাল্ব, দ্রুম প্রভৃতি যেসব তমগুনযুক্ত দূরচারী রাজা আছেন, তারা সকলেই শিশুপালের অনুগমন করবে। তাই অল্পমাত্রও বায়ু যেমন অগ্নিযুক্ত ইন্ধনকে শীঘ্র প্রদীপ্ত করে, সেইরকম তোমার প্রতি অল্পমাত্র কোপযুক্ত সে সব রাজাদের শিশুপাল কর্তৃক প্রযুক্ত ভেদনীতি শীঘ্রই প্রদীপ্ত করবে-
” উপজাপঃ কৃতস্তেন তানাকোপবতস্ত্বয়ি।
আশু দীপয়িতাস্পোঅপি সাগ্নীন্ ত্রয়ানিবানিলঃ।।”
কেননা অতিক্ষুদ্র ব্যক্তিও মহত্তের সাহায্য পেলে কার্যসিদ্ধি করতে পারে, যে রকম পার্বত্য ক্ষুব্ধ নদী বড় নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।
শিশুপালের শত অপরাধ ক্ষমা প্রসঙ্গে উদ্ধবের উক্তি
তাছাড়া শিশুপালকে আমন্ত্রণ করলে শ্রীকৃষ্ণের শত্রু রাজারা শিশুপালের পক্ষে যাবেন। শিশুপালবধের জন্য দেবতাদেরও নির্দেশ আছে। সেক্ষেত্রে উদ্ভবের উক্তি হল আগে দেবতাদের অভিলষিত যজ্ঞ করাই কর্তব্য। কেননা যজ্ঞে যে আহুতি দেওয়া হয় সেটি প্রকৃত অমৃত। তাছাড়া শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পিসীমার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, শিশুপালের শত অপরাধ ক্ষমা করবেন-
” সহিষ্যে শতমাগাংসি সূনোস্তে যত্ত্বয়া।।”
তাই যেহেতু তারা এখনও শত অপরাধ সম্পন্ন হয়নি, সে কারণে শ্রীকৃষ্ণের অপেক্ষা করা উচিত। তা না হলে তিনি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারি অপবাদ যুক্ত হবেন।
এছাড়া রাজসূয় যজ্ঞে অংশগ্রহণ করলে যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে (শিশুপালকে) বিশেষ সম্মান জানাবেন। ফলে শিশুপালের পক্ষীয় আত্মজ্ঞান দুর্বলতা প্রাপ্ত হবে, তখন পতঙ্গের মতো তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের বীরত্ব বহ্নিতে দগ্ধ হবেন। এভাবে নীতিশাস্ত্র সম্মত পথ অবলম্বন করে উদ্ভব সমস্ত বিষয়ের বিশ্লেষণ করলেন।
শিশুপালবধম্ মহাকাব্যে বর্ণিত উদ্ধবের উক্তির মাধ্যমে উদ্ধবের চরিত্র অঙ্কন
উদ্ভব ছিলেন বৃহস্পতির শিষ্য তথা বিচক্ষণ মন্ত্রী। তাঁর প্রতিটি কথার মধ্যে ফুটে উঠেছে অসামান্য ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ প্রজ্ঞা, অসীম ধৈর্য্য, শিক্ষনীয় বিনয় ও সৌজন্যবোধ, শাস্ত্রসমুদ্রে অদ্ভুত গতিশীলতা এবং তার সঙ্গে ঋষিকল্প দূরদর্শিতা। উদ্ভব তাঁর ভাষণের মধ্যে বলরামের মতো হঠকারীদের মতের বিরুদ্ধ মত খন্ডনের যুক্তির জাল বিস্তার করেছেন। তাঁর স্থৈর্য হিমগিরিতুল্য বললেও বোধহয় অতিশয়োক্তি হবে না। এক কথায় বলা যায়, উদ্ভব কেবল ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ্ নন, সেই সঙ্গে তিনি শাস্ত্রস্থ বিচক্ষণ, স্থিতধী এবং যথার্থ মন্ত্রী।
আরো পড়ুন
- শিশুপালবধম্: শ্লোক সংস্কৃত ব্যাখ্যা
- শিশুপালবধম্: বঙ্গানুবাদ
- মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুনাঃ – ব্যাখ্যা কর
- শিশুপালবধম্ মহাকাব্য: উদ্ধবের চরিত্র বিশ্লেষণ
- শিশুপালবধম্ মহাকাব্য: উদ্ধবের উক্তি সংক্ষেপে বর্ণনা
- মাঘে সন্তি ত্রয়োগুণাঃ- এই উক্তিটি আলোচনা কর
- মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুণাঃ – উক্তিটির যথার্থতা