মাঘে সন্তি ত্রয়োগুণাঃ- এই উক্তিটি আলোচনা কর

শিশুপালবধ অনুসারে “মাঘে সন্তি ত্রয়োগুণাঃ “- এই উক্তিটি আলোচনা কর।

মাঘেরশিশুপালবধ অনুসারে “মাঘে সন্তি ত্রয়োগুণাঃ “- এই উক্তিটি আলোচনা কর।

সংস্কৃত ভাষায় একটি জনপ্রিয় শ্লোক অনুযায়ী:

उपमा कालिदासस्य भारवेरर्थगौरवं

दन्डिन: पदलालित्यं माघे सन्ति त्रयो गुणः||

(উপমা কালিদাসস্য ভারবেরর্থগৌরবং।

দণ্ডিনঃ পদলালিত্যং মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুণঃ।।)

অর্থাৎ, কালিদাস তার উপমার জন্য প্রসিদ্ধ, ভারবি প্রসিদ্ধ তার অন্তর্দৃষ্টির জন্য, দণ্ডির প্রসিদ্ধি পদলালিত্যের জন্য; কিন্তু মাঘ এই তিন গুণের আকর।

কবি জন্মান:-

একথা সর্বজনবিদিত যে কবিত্ব একটি সহজাতগুন- যাকে দণ্ডী ‘কাব‍্যাদর্শ’ -এ বলেছেন- ‘নৈসর্গিকী প্রতিভা’। কবি জন্মান, তৈরি হয় না। তাঁদের মধ‍্যে ‍যাঁরা মহাকবিপদবাচ‍্য, তাঁরা বিশেষ প্রতিভার অধিকারী।

মাঘের বৈদগ্ধ‍্য বা পাণ্ডিত্য:-

বৈদগ্ধ‍্য বা পাণ্ডিত্য কি কবিত্বের সঙ্গে সমার্থক? কবিকে কি পণ্ডিত হতেই হবে? এরকম কূট প্রশ্নের উত্তর যাওয়া খুব মুশকিল। কবির পণ্ডিত হওয়া জরুরি না হলেও কবিকে বহু বিষয় জানতে হবে। মনুষ‍্য -সংসারে বিষয়ের বৈচিত্র‍্য বিদ‍্যমান, জীবনও বহুব‍্যাপ্ত। কবি যেহেতু মানবমনের আশ্চর্য চিত্রকর, জগতের রূপকার ও কালের ভাষ‍্যকার, সেহেতু কবিকে বহুব‍্যাপ্ত জগৎ ও জীবনকে জানতে হবে। এই জানাই তাঁর গায়ে পরিয়ে দেয় পাপ্তিত‍্যের অভেদ‍্য বর্ম। আসলে কাব‍্যের বিষয় হতে পারে যে কোনো বিষয়।

আলংকারিক ভাবহ বলেছেন-

“ন স শব্দো ন তদ্বাচ‍্যং ন স ন‍্যায়ো ন সা কলা।
জায়তে যন্ন কাব‍্যাঙ্গমহো ভাবো মহান্ কবেঃ।।”

      ভামহের এই কথার প্রতিধ্বনি আমারা পাচ্ছি ইদানীং কালের কবিতায়, রাশিয়ার কবি vasily kazin- এর ‘brick layer’ ( ইঁটগাথুনিয়া) কবিতায়, যেখানে প্রভাতবেলা ইঁট-গাথুনিয়া মজুরের মতো আকাশের ছাছে তুলে ধরেছে লাল টুকটুকে একটি ইঁট-

” and morning, too, like a worker
carried up a red brick at its own.”

      অতএব, যে কোনো বিষয়-বস্তু নিয়ে কবি কাব‍্যের আনন্দলোক নির্মাণ করতে পারেন।

মাঘে সন্তি ত্রয়োগুণাঃ

মাঘ সম্বন্ধে প্রচলিত দুটি প্রশস্তি বাক‍্য খুবই প্রসিদ্ধ ও আলোচনার অবকাশ রাখে। একটি হল- “মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুনাঃ।” এবং অন‍্যটি হল “মাঘে মেঘে গতং বয়ঃ।”

     “মাঘে সন্তি ত্রয়োগুণাঃ”- কথার অর্থ হল- মাঘের কাব‍্যে তিনটি গুন আছে। প্রবাদ বাক‍্যের প্রথম তিন চরনে বলা হয়েছে-

“উপমা কালিদাসস‍্য ভারবেরর্থগৌরবম্।
নৈষধে পদলালিত‍্যং মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুনাঃ।।”

অর্থাৎ কালিদাসের কাব‍্যে উপমা, ভারবির কাব‍্যে অর্থগৌরব ও নৈষধকাব‍্যে পদলালিত‍্য আছে। আর মাঘের কাব‍্যে এই তিনটি গুনই আছে। কিন্তু একথা বললে মাঘের মাহাত্ম‍্য বাড়ে না। কেননা, কালিদাস, শ্রীহর্ষ, ভারবি, মাঘ – সকলেই প্রথম শ্রেণীর কবি, এদের মধ্যে প্রতিভা প্রকাশের ক্ষেত্রে শুধু তারতম্য আছে। তবে যে মাঘভক্ত কবিকে উক্ত তিনটি গুণের অধিকারী রূপে বর্ণনা করেছেন, লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে উক্ত তিনটি গুণ প্রকৃতপক্ষে অলংকার শাস্ত্র সম্মত গুন নয়। তবুও প্রশস্তিবাচক শ্লোকে যখন উপমা প্রভৃতি তিনটি গুণের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তখন উক্ত তিনটি গুণের ক্ষেত্রে মাঘ কবির কৃতিত্ব আলোচনা করা যেতে পারে।

উপমা:-

মাঘের কাব্যে উপমা অলংকারের প্রাচুর্য আছে। তার মধ্যে অনেক উপমাই কালিদাসের উপমার মতো লালিত‍্যপূর্ণ ও রস নিবীড়।  শিশুপালবধ কাব্যের দ্বিতীয় সর্গে এইরকমই একটি অনবদ্য উপমা রয়েছে-

“অনুৎসূত্র পদন‍্যাসা সদ্বৃত্তিঃ সন্নিবন্ধনা।
শব্দবিদ‍্যেব নো ভাতি রাজনীতিরপস্পশা।।”

কালিদাসের উপমার মতো এই উপমাও বাইরে থেকে আরোপিত নয়, কাব‍্য ভাবনা থেকে জাত এবং কাব‍্য রসের সঙ্গে সংযুক্ত।

অর্থগৌরব:-

মাঘের রচনায় অর্থগৌরবযুক্ত ও চিরন্তন সত্যের দ‍্যোতক বহু বাক্য বন্ধ আছে। মাঘ যে পরিণত প্রজ্ঞার অধিকারী কবি ছিলেন- এ থেকেই তা প্রমাণ হয়।

উদাহরণস্বরূপ নবম সর্গের ষষ্ঠ শ্লোকটি  উদ্ধৃত করা হয়-


” প্রতিকূলতামুপগতে হি বির্ধৌ
          বিফলত্বমেতি বহুসাধনতা।
অবলম্বনায় দিনভর্তুরভূন্ন
          পরিষ‍্যতঃ করসহস্রমপি।।”

অর্থাৎ বিধাতা প্রতিকূল হলে সব কিছু উপায়ও বিফল হয়। অস্তোমুখ সূর্যের সহস্র কিরন পতনের সময় সূর্যকে ধরে রাখতে সমর্থ হয়নি।

পদলালিত‍্য:-

ভাবের উপযোগী শব্দবিন্যাস তার কাব্যকে বিশিষ্টতা দান করেছে যেখানে যুদ্ধের বর্ণনা সেখানে যেমন করে এবং সমাসবদ্ধ শব্দ প্রয়োগ করেছেন তেমনি যখন প্রকৃতির বর্ণনা করেছেন তখন তাঁর রচনার ললিত পদবিন্যাসে মধুর হয়ে উঠেছে যেমন বসন্তের বর্ণনায়-

“মধুরয়া মধুবোধিতমাধবী মধুসমৃদ্ধিসমেধিতমেধয়া।
মধুকরাঙ্গনয়া মুহুরুস্মদ্দধ্বনিভৃতা নিভৃতাক্ষরমুজ্জগে।।”

আচার্য দণ্ডীর মতে, কাব্যের শ্লেষ, প্রসাদ, মাধুর্য প্রভৃতি দশটি গুণ থাকা আবশ্যক। এক প্রসিদ্ধ টীকাকার শিশুপালবধ কাব্য সম্পর্কে বলেছেন-

“এতে গুণাঃ প্রায়ঃ সর্বেঅপি অত্র কাব‍্যে সন্তি এব।”

মল্লিনাথও একাদশ সর্গে ঊনিশসংখ‍্যক শ্লোকের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন-

“আচার্যোক্তা দশগুণাঃ প্রায়েণাত্র সম্ভবন্তি।।”

তবে একথা সত্য যে শ্লোকটি দশটি গুণ যুক্ত কাব্যজগতে বিরল।

       বস্তুত উপমা সমৃদ্ধ,অর্থগাম্ভীর্যপূর্ণ, পদলালিত‍্যপূর্ণ রচনার গুণে সংস্কৃত সাহিত্যে অদ্বিতীয় কবি। অতএব বলা যায় মাঘের প্রশস্তি ক্ষেত্রে “মাঘে সন্তি ত্রয়োগুণাঃ“- উক্ত প্রশস্তিবাক‍্যটি সার্থক ও সর্বাঙ্গ।

Leave a Comment