শিশুপালবধম্ মহাকাব‍্য: উদ্ধবের চরিত্র বিশ্লেষণ

শিশুপালবধম্ মহাকাব‍্য হতে উদ্ধবের চরিত্র বিশ্লেষণ কর।

উদ্ধবের চরিত্র বিশ্লেষণ – শিশুপালবধম্


উ:- সংস্কৃত সাহিত্যের জগতে মহাকবি কালিদাসের অনুপম কাব্যশিল্পের পাশাপাশি যে কয়েকজন কবি অনুপ্রাণিত হয়ে কাব্যের স্বতন্ত্র কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন শিশুপালবধম্ মহাকাব্যের রচয়িতা মহাকবি মাঘ।  এই মহাকাব্যটি মাঘকে সংস্কৃত কাব্যজগতে অতি উচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত করেছে-

‘ কাব‍্যেষু মাঘঃ কবি কালিদাসঃ ‘।

মহাকবির কাব‍্য যতবার পড়া যায় ততবারই তার মধ্যে অভিনবত্ব ও নতুন নতুন তাৎপর্য পাওয়া যায়। কারণ মহাকবির ধর্ম হল যথার্থ রমণীয় বস্তু সংগ্রহ-

” ক্ষণে ক্ষণে যন্নবতামুপৈতি তদেব রূপং রমনীয়তায়া।”

     মূলত  উপমায় শ্রেষ্ঠ মহাকবি কালিদাস, অর্থগৌরবে শ্রেষ্ঠ ভারবি এবং পদলালিত‍্যে শ্রেষ্ঠ শ্রীহর্ষ। কিন্তু উক্ত তিন কবির রচনা বৈশিষ্ট‍্য মাঘের রচনায় একত্রে পরিলক্ষিত হয়-

মাঘে সন্তি ত্রয়োগুনাঃ।”

তাঁর লেখনীর স্পর্শে প্রতিটি চরিত্র বাস্তবমুখী ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

মহাকবি মাঘ রচিত শিশুপালবধম্ মহাকাব‍্যের দ্বিতীয় সর্গের প্রথমেই শ্রীকৃষ্ণ যখন একদিকে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে যোগদানের আমন্ত্রণ, অন‍্যদিকে দেবর্ষি নারদের মাধ‍্যমে বিজ্ঞাপিত দেবতাদের প্রার্থনা অনুসারে শিশুপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা অর্থাৎ মিত্রকার্য ও দেবকার্য এই দুটির মধ‍্যে কোনটি আগে করণীয় তা স্থির করতে পারছিলেন না, তখন তিনি অগ্রজ বলরাম ও মহামতি উদ্ধবের সঙ্গে পরামর্শ করার জন‍্য মন্ত্রণা গৃহে গভন করেন। সেই সময় মহামন্ত্রী উদ্ধব শ্রীকৃষ্ণকে যে গূঢ় রাজনৈতিক নির্ভর অর্থগৌরবযুক্ত আলোক সামান‍্য বাক‍্যগুলি অনুদ্ধতভাবে বলেছিলেন তা অসাধারন।

উদ্ধব একজন প্রাজ্ঞমন্ত্রী। তার বিনয়, সৌজন‍্য, শিষ্টাচার দৃষ্টান্ত স্থানীয়। তিনি ছিলেন বিদ্বান ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। কিন্তু সেই বিদ‍্যা তাকে অহংকারী করে তোলেনি বরং বিনয়ী করেছে।

তাই তিনি শ্রদ্ধা ও বিনয় জ্ঞাপন করে বলেছেন- আমরা নীতিশাস্ত্রের জ্ঞান আবৃত্তির দ্বারা দৃঢ় হব বলে নীতি শাস্ত্রধীত আপনার সামনে অধীত নীতি শাস্ত্রকে আবৃত্তি করছি মাত্র-

” বিশেষবিদুষঃশাস্ত্রং যত্তবোদ্ গ্রাহ‍্যতে পুরঃ।
হেতুঃ পরচয়স্থৈর্য‍্যে বক্তুর্গুননিকৈব সা।।”

     পরবর্তী উদ্ধবের উক্তিগুলি তিনি বলরামের মতকে খন্ডন করার জন‍্য উক্ত করেছেন। উদ্ধব ধৈর্যশীল, পরিণাম দর্শী। বলরামের মতো সহসা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া তার স্বভাব বিরুদ্ধ। তাই বলরামের প্রতি বচনবান নিক্ষেপ করে তিনি বলেছেন-

“বহুস্পৃশাপি স্থূলেন স্থীয়তে বহিরশ্মবত্।”

অর্থাৎ তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব‍্যাক্তি বাণের মতো অল্প জায়গা স্পর্শ করে খুব গভীরে প্রবেশ করে। কিন্তু মন্দবুদ্ধির লোকেরা বাইরে থেকে যায়। তিনি শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ‍্য করে বলেছেন অজ্ঞরা কাজ করে অল্প কিন্তু ব‍্যস্ত থাকেন খু বেশি আর বুদ্ধিমানেরা ঠিক এর বিপরীত-

” মহারম্ভাঃ কৃতধিয়াস্তিষ্ঠন্তি চ নিরাকুলাঃ।”

এই উক্তি থেকে বোঝা যায় যে উদ্ধবের বাগ্মীতা বলরামের থেকে অনেক তীক্ষ্ণ এবং তিনি স্বয়ং তত্ত্বের ও সত‍্যের মূর্তিমান বিগ্রহ।

       প্রাজ্ঞ মন্ত্রী উদ্ধব ছিলেন কালদর্শী। তিনি রাজাকে কালজ্ঞ সম্পর্কে বলেছেন- রসজ্ঞ কবিরা যেমন কেবল ওজোগুন বা প্রসাদগুনকে আশ্রয় করেন না, তেমনি কালজ্ঞ রাজার পক্ষে কখনো একান্তভাবে তেজ বা ক্ষমা কোন একটি গুণকে আশ্রয় করা উচিত নয়-

” তেজঃ ক্ষমা বা নৈকান্তং কালজ্ঞস‍্য মহীপতে নৈকমোজ প্রসাদো বা রসভাববিদঃ কবেঃ।।

    তিনি বলেছেন মৃদুতার দ্বারা আবৃত্ত তেজ সিদ্ধি লাভে সমর্থ্য হয়। প্রদীপ তার মধ্যবর্তী বাতির দ্বারা যেমন তেল গ্রহণ করে-

“প্রদীপঃ স্নেহমাদত্তে দশয়াভ‍্যন্তরস্থয়া।”

    তিনি আরও বলেছেন একটি রসের নিষ্পত্তিতে যেমন অনেকগুলো ব্যভিচার ভাব প্রবর্তিত হয় অনুরূপ ধৈর্যশালী এক বিজিগীষু রাজার জন্য অন্য রাজারা কার্য সম্পাদন করেন-

“স্থায়িণোঅর্থে প্রবর্তন্তে ভাবাঃ সঞ্চারিণো যথা রসস‍্যৈকস‍্য ভূয়াংসস্তথা নেতুর্মহীভৃতঃ।।”

       শুধুমাত্র ধৈর্যই নয়, প্রজ্ঞা ও উৎসাহের গুনতা বক্তব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি বলেছেন প্রজ্ঞারূপ বলসমন্বিত প্রকান্ত মূল বিশিষ্ট অত‍্যুচ্চ উৎসাহ বৃক্ষ সংগৃহীত কার্যের দ্বারা বর্ধনীয় বিপুল প্রভুশক্তিরূপ ফল দান করবে-

“করপ্রচেয়ামুত্তুঙ্গঃ প্রভুশক্তিং প্রথীয়সীম্।
প্রজ্ঞাবলবৃহন্মূলঃ ফলত‍্যুৎসাহপাদপঃ।।”

সুতরাং চেদিরাজ শিশুপালকে অবজ্ঞা করা উচিত হবে না।

     তিনি এই মন্ত্রণার পরিণতির দিকে গিয়ে বলেছেন যে, চেদিরাজকে একাকী ভেবে তাকে জয় করা সহজ হবে একথা তিনি যেন মনে না করেন। রাজযক্ষের মতে শিশুপাল বহু রাজার সমষ্টি। তাছাড়াও তমোগুন সম্পন্ন বলে যবন, রুক্মি, শাল্ব প্রভৃতি রাজারা তাকে অনুগমন করবে। তাই যে প্রকৃত বলবান সে শক্তির প্রতি বিলম্বে বল প্রয়োগ করলেও তার কার্যসিদ্ধ হবে। কিন্তু কোনো কারনে বন্ধু লোকের মন প্রতিকূল করে তুললে চিত্তানুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে-

” চিরাদপি বলাত্কারোবলিনঃ সিদ্ধয়েঅরিষু।
ছন্দানুবৃত্তিদুঃসাধ‍্যাঃ সুহৃদো বিমনীকৃতাঃ।।”

        এমনকি শ্রীকৃষ্ণের গুপ্তচরেরা যখন একযোগে যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞে উপস্থিত হবেন তখন যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করবেন। তাতে চঞ্চলচিত্ত, বিদ্বেষী শত্রুরা স্বতঃ প্রবৃত্ত হয়ে কৃষ্ণের বিরূদ্ধাচরন করবে। তখন আত্মভিজ্ঞ বহু রাজা শিশুপালের পক্ষত‍্যাগ করবেন। ফলে দর্পিত ও অস্থির শত্রুগন শ্রীকৃষ্ণের প্রত‍াপালনে পতঙ্গের ন‍্যায় আত্ম সমর্পন করবে-

” সহজচাপলদোষসমুদ্ধতশ্চলিতদুর্বলপক্ষপরিগ্রহঃ।
তব দুরাসদবীর্য‍্যবিভাবসৌশলভতাং লভতামসুহৃদ্ গণঃ।।” 

     পরিশেষে উল্লেখ করা যায় যে মন্ত্রী উদ্ধবের মধ্যে অসামান্য ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ প্রজ্ঞা, শিক্ষণীয় বিষয় ও সৌজন্যবোধ ফুটে উঠেছে। নীতিশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই তার যুক্তিযুক্ত ও শাস্ত্রাপুমোদিত বক্তব্য শ্রীকৃষ্ণের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে হয়েছিল। এক কথায় বলা যায় উদ্ধব কেবল ধুরন্দর রাজনীতিবিদ নন। সেই সঙ্গে শাস্ত্রজ্ঞ, স্থিতধী ও যথার্থ মন্ত্রী।

Leave a Comment