মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুনাঃ – ব‍্যাখ‍্যা কর

মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুনাঃ – ব‍্যাখ‍্যা কর

মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুনাঃ – ব‍্যাখ‍্যা কর।


উ:- কাব্যের জনক বা জননী যেহেতু কবি, সেহেতু কবিকে না জানলে তাঁর কাব্যের সামগ্রিক তাৎপর্য অজানা রয়ে যায়। সংস্কৃত সাহিত্যে মহাকবি কালিদাসের পূর্বযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান কবি হলেন শিশুপালবধম্ মহাকাব্যের জনক মহাকবি মাঘ। আলংকারিক আনন্দবর্ধন তাঁর ধ্বন্যালোক গ্রন্থে বলেছেন সেই ধ্বনিরূপা ভারতী বা প্রতীয়মান অর্থ মহাকবিদের সাহিত্যকর্ম থেকে নিঃসৃত হয়ে তাঁদের আলোক সামান্য প্রতিভাকে বিশ্বের কাব‍্যরসিকদের কাছে পরিচিত করে থাকে।

মহাকবির কাব্য যতবার পড়া যায় ততই তার মধ্যে অভিনবত্ব ও নতুন নতুন তাৎপর্য পাওয়া যায়। কারণ মহাকবির কবিকর্ম হল যথার্থ রমণী বস্তু সংগ্রহ-

‘ক্ষণে ক্ষণে যন্নবতামপৈতি তদেব রূপং রমণীয়তায়াঃ।’

এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, কালিদাস প্রভৃতি মহাকবিদের মতো মহাকবি মাঘ ও অপূর্ববস্তুনির্মাণক্ষমা প্রজ্ঞা ও প্রতিভার অধিকারী।

মাঘ সম্বন্ধে প্রাচীন ভারতীয় বিদ্বত সমাজে ও সাহিত্য গোষ্ঠীতে সুন্দর সুন্দর অনেক শ্লোক প্রচলিত আছে। কেউ বলেছেন-

” পুষ্পেষু জাতী নগরেষু কাঞ্চী
নারীষু রম্ভা পুরুষেষু বিষ্ণুঃ
নদীষু গঙ্গা নৃপতৌ চ রামঃ
কাব‍্যেষু মাঘঃ কবি কালিদাসঃ।।”

আবার কেউ বলেন- ” তবদ্ভাঃ ভারবের্ভাতি যাবন্মাঘস‍্য নোদয়ঃ।”

আবার কেউ কেউ বলেন- ‘মাঘে মাঘে গতং বয়ঃ। ‘

এইসব মন্তব্যের মধ্যে সর্বাধিক প্রচলিত এবং সারগর্ভ উক্তি হল-

“উপমা কালিদাসস‍্য ভারবেরর্থগৌরবম্।
নৈষধে পদলালিত‍্যং মাঘে সন্তি ত্রয়োগুণাঃ।।”

উপমা, অর্থগৌরব এবং পদলালিত‍্য- এই ত্রিবিধ কাব্য গুনের অধিকারী হলেন মহাকবি মাঘ। মূলত উপমায় শ্রেষ্ঠ কালিদাস, অর্থ গৌরবে শ্রেষ্ঠ ভারবি এবং পদলালিত‍্যে শ্রেষ্ঠ শ্রীহর্ষ। কিন্তু উক্ত তিন কবির রচনা বৈশিষ্ট‍্য মাঘের রচনায় একত্র উপলব্ধ হয়। এরা প্রত্যেকে প্রথম শ্রেণীর কবি, তাই এদের প্রতিভা প্রকাশের ক্ষেত্রে তারতম‍্য রয়েছে। যে মাঘ ভক্ত কবিকে উক্ত তিনটি গুণের অধিকারী বলে বর্ণনা করেছেন, লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই তিনটি গুণ প্রকৃতপক্ষে অলংকার শাস্ত্রসম্মত গুণ নয়। অলংকার শাস্ত্রে দশটি কাব্যগুনের কথা আছে। যেমন শ্লেষ, প্রসাদ, সমতা, মাধুর্য প্রভৃতি। এক প্রসিদ্ধ টীকাকার শিশুপালবধকাব্য সম্পর্কে বলেছেন-

“এতে গুনাঃ প্রায়ঃ সর্বেঅপি অত্র কাব‍্যে সন্তি এব।”

একথা সত্য যে দশটি গুন যুক্ত কাব্যসাহিত্য জগতে বিরল। কাব্য প্রকাশ গ্রন্থের প্রণেতা আচার্য মম্মট মাধুর্য ওজঃ ও প্রসাদ এই তিনটি গুনই স্বীকার করেছেন-

“মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুনাঃ।” – এই উক্তির মধ্যে মম্মট কথিত তিনটি গুনই বোঝাতে পারে।

মাঘের কাব‍্যে উপমা অলংকারের প্রাচুর্য আছে। তার মতে অনেক উপমাই কালিদাসের উপমার মতো লালিত‍্যপূর্ণ ও রস নিবিড়।
শিশুপালবধম্ মহাকাব্যের দ্বিতীয় সর্গে শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্য অভ্যুদয়কামী রাজার শত্রু বৃদ্ধিতে কেন উদাসীন থাকা উচিত নয় তা যুক্তি সহযোগে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে মহাকবি উপমার প্রয়োগ তুলে ধরেছেন-

“উত্তিষ্টমানস্তু পরো নোপক্ষ‍্যঃ পথ‍্যমিচ্ছতা।
সমৌ হি শিষ্টৈরাম্নাতৌ বর্তস‍্যন্তাবাময়ঃ স চ।।”

এই সর্গে রয়েছে একটি অনবদ্য উপমা-

“অনুত্ সূত্র পদন‍্যাসা সদ্ বৃত্তিঃ সন্নিবন্ধনা।
শব্দবিদ‍্যেব নো ভাতি রাজনীতিরপস্পশা।।”

কালিদাসের উপমার মতো এই উপমাও বাইরে থেকে আরোপিত নয়, কাব্য ভাবনা থেকে জাত এবং কাব্যরসের সঙ্গে সংযুক্ত প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে এক অভিনব উপমা প্রয়োগের জন্য মাঘকে অনেকে ঘন্টামাঘ বলে উল্লেখ করেন। চতুর্থ সর্গে রৈবতক পর্বতের বর্ণনায় উপমার সুন্দর প্রয়োগ দেখা যায়। একপাশে উদিত সূর্য ও অন্যপাশে অস্তুোমুখ চন্দ্রকে ধারণ করে রৈবতক দুপাশে ঘন্টাযুক্ত হাতির মতো প্রণীত হচ্ছে।

কাব্যে অর্থগৌরব পূর্ণ রচনার জন্য ভারবি মানদণ্ডরূপে স্থিত। তাই অর্থগৌরব বা অর্থ গাম্ভীর্য মাঘের রচনারও অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বহু শাস্ত্রনিষ্ণাত স্বচ্ছ বুদ্ধির জন্যই মহা কবিদের কাব্যে স্বতঃই অর্থগৌরব যুক্ত বাণীর উদয় হয়। অর্থগাম্ভীর্যের যে নিদর্শন রূপে শিশু পার্ক কাব্যে নবম স্বর্গে উল্লেখিত হয়েছে বিধাতা প্রতিকূল হলে সবকিছু উপায়ও বিফল হয়। অস্তোন্মুখ সূর্যের সহস্র কিরণ পতনের সময় সূর্যকে ধরে রাখতে সমর্থ হয় না-

“প্রতিকূলতামুপগতেহি বিধৌবিফলত্বমেতি বহুসাধনতা
অবলম্বনায় দিনভর্ত্তুরভূন্ন পতিষ‍্যতঃ করসহস্রমপি।।”

দ্বিতীয় সর্গে বলরামের ভাষণের পর বয়ঃ জ‍্যেষ্ঠ উদ্ধবের গুনাবলী প্রসঙ্গে গভীর অর্থপূণ‍্যবাক‍্যে মহাকবি বলেছেন। অর্থগাম্ভীর্যের আরেকটির প্রসিদ্ধ উদাহরণ একাদশ সর্গে উদ্ধৃত একটি শ্লোকে পাওয়া যায়। যেখানে আকাশ জননীর কোলে বালক সূর্যের পতন ও ক্রীড়া বর্ণিত হয়েছে।

পদলালিত‍্য প্রতিভাবান কবির অব‍্যভিচারী দৃষ্টান্ত। রমনীয় পদসন্নিবেশই কাব‍্যিক চমৎকারিত্ব সৃষ্টির মূল কথা। শ্রীহর্ষ পাঠান্তরে দণ্ডী এই পদলালিত‍্যের জন‍্য খ‍্যাত হলেও মহাকবি মাঘের রচনায় পদলালিত‍্যপূর্ণ কবিতার ঝংকার প্রায়ই শোনা যায়। মাঘের কোমলকান্ত পদাবলী পাঠকের মন মোহিত করে। এরকম পদলালিত‍্যের চমৎকার দৃষ্টান্ত রয়েছে ‘শিশুপালবধম্’ মহাকাব‍্যের একাদশসর্গের ৬৪ সংখ‍্যক শ্লোক।

প্রকৃতির চিত্র বর্ণনায়ও পদলালিত‍্যের পরিচয় আছে ষষ্ঠ সর্গে বসন্তবর্ণনার এই শ্লোকে-

“নব পলাশপলাশবনং পুরঃ স্ফুটপরাগপরাগতপঙ্কজম্ মৃদুলতান্তমলোকয়ত্ স সুরভিং সুরভিং সুমনোহরৈঃ।।”

সম্মুখে নবপত্রে সমাচ্ছাদিত পলাশবৃক্ষসমূহ, প্রকটিত পরাগে ব‍্যাপ্ত পদ্ম,কেবল ও আত পতাপে কিঞ্চিত ম্লান, কুসুমসমৃদ্ধিতে মনোহর বসন্তকাল শ্রীকৃষ্ণ দর্শন করলেন।

পাণ্ডিত‍্যপূর্ণ বাক‍্যবন্ধের প্রতি মাঘের কালের কবিদের গভীর প্রীতি লক্ষ‍্য করা যায়। মাঘও তাঁর কাব‍্য পূর্বসূরী ভারবির অনুসরনে দ্ব‍্যর্থবোধক শব্দযুক্ত পদ রচনা করেছিলেন। ভিন্নার্থযুক্ত একবর্ণের বিচিত্র বাক‍্যবন্ধও ব‍্যবহার করেছিলেন। এতে মাঘের রচনা কিছুটা ক্লিষ্ট হয়তো হয়েছে কিন্তু সমগ্র কাব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তা নগণ্য। বস্তুত অর্থ গাম্ভীর্যপূর্ণ, উপমা সমৃদ্ধ ও পদলালিত‍্য পূর্ণ রচনার গুনে মাঘ সংস্কৃত সাহিত্যে অদ্বিতীয় কবি।

Leave a Comment