অপাণিনীয় ব‍্যাকরণ প্রস্থানে মুগ্ধবোধ ব‍্যাকরণের মাহাত্ম‍্য

অপাণিনীয় ব‍্যাকরণ প্রস্থানে মুগ্ধবোধ ব‍্যাকরণের মাহাত্ম‍্য লেখ।

অপাণিনীয় ব‍্যাকরণ প্রস্থানে মুগ্ধবোধ ব‍্যাকরণের মাহাত্ম‍্য


ভূমিকা:- অপাণিনীয় ব‍্যাকরণগ্রন্থগুলির মধ‍্যে মুগ্ধবোধ ব‍্যাকরণের একটি বিশিষ্ট স্থান আছে। জনপ্রিয়তার মাপকাঠি দিয়ে বিচার করলে এই ব‍্যাকরণ সম্প্রদায়ের গুরুত্ব আজও স্বীকার করতে হয়। বঙ্গদেশে এবং ভারতের আরও কোনো কোনো প্রদেশে এই ব‍্যাকরণের এখনও চর্চা বা পঠন – পাঠন প্রচলিত আছে।

মুগ্ধবোধের ব‍্যাকরণের রচয়িতা ও তাঁর পরিচয়:-

এই মুগ্ধবোধ নামক সংস্কৃত ব্যাকরণটির রচয়িতা হলেন বোপদেব। এক সময় এই বোপদেবকে  বাঙালি বলেই মনে করা হত। বস্তুত, বঙ্গদেশেই এই ব‍্যাকরণের  বিশেষ চর্চা দেখা যায়। যাই হোক এখন আর বোপদেবকে বাঙালি বলে মনে করা হয় না। তাঁকে মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ বলেই মনে করা হয়।

বোপদেবের সময়কাল:-

বিভিন্ন প্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে আধুনিক পন্ডিতগণ বোপদেবকে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর লোক বলে অনুমান করেন। সুতরাং, খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীকে বোপদেবকে সময়কাল বলে ধরা হয়।

বোপদেবের রচনাবলী:-

কৈবল‍্যদীপিকা নামক একটি গ্রন্থে একটি শ্লোকে বলা আছে যে বোপদেব ব‍্যাকরণশাস্ত্র বিষয়ে ১০ টি, বৈদ‍্যকশাস্ত্রবিষয়ে ৯টি, সাহিত‍্যবিষয়ে ৩টি, তিথি নির্ণয়  সম্বন্ধে ১টি এবং শ্রীমদ্ভাগবতপুরাণ বিষয়ে ৩টি- মোট  ২৬ খানি গ্রন্থ রচনা করেন।

              বোপদেবের ব‍্যাকরণবিষয়ক গ্রন্থগুলির মধ‍্যে প্রধান গ্রন্থটি হল- মুগ্ধবোধ ব‍্যাকরণ। এছাড়া তাঁর কবিকল্পদ্রুম এবং কাব‍্যকামধেনু-র মধ‍্যেও ব‍্যাকরণের প্রসঙ্গ আছে। আবার অনেকের মতে, তিনি পরিভাষ‍াভাষ‍্য, মহাভাষ‍্য -এর টীকা প্রভৃতির রচনা করেছিলেন। রামচন্দ্রের রচিত ‘প্রক্রিয়াকৌমুদী’ -র অন‍্যতম প্রসিদ্ধ টীকাকার বিঠ্ঠলাচার্য বোপদেবের ‘বিচারচিন্তামণি’ নামে অপর একটি ব‍্যাকরণগ্রন্থের উল্লেখ করেছেন।

মুগ্ধবোধের ব‍্যাকরণের বিষয়বস্তু:-

বোপদেবের রচিত ব্যাকরণ গ্রন্থ গুলির মধ্যে মুগ্ধবোধ-ই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। এই গ্রন্থে কোনো কোনো সংস্করণে ১৭ টি অধ্যায় দেখা গেলেও অধিকাংশ সংস্করণেই ১০টি অধ্যায় আছে। প্রতিটি অধ্যায় ৪টি করে পাদে বিভক্ত। মোট সূত্রসংখ‍্যা নিয়েও মতান্তরে আছে, তবে অধিকাংশ পন্ডিতই মোট সূত্রসংখ‍্যা ১১৬৫ অথবা ১১৮৪ বলেই উল্লেখ করেছেন। গ্রন্থারম্ভে ‘ওম্ নমঃ শিবায়ঃ’ -কেও কেউ কেউ নমস্কার সূত্ররূপে গণ্য করেছেন, সর্বশেষ সূত্রটি হল ‘বহুলং ব্রহ্মণি’।

মুগ্ধবোধ ব‍্যাকরণের বৈশিষ্ট্য :-

মুগ্ধবোধ ব্যাকরণের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল- অত‍্যধিক সংক্ষিপ্ততা। প্রচলিত পাণিনীয় ব‍্যাকরণগুলির মধ্যে মুগ্ধবোধ বোধ হয় সবচেয়ে ক্ষুদ্র জনপ্রিয় সংস্কৃত ব্যাকরণ কত অল্প সময়ের মধ্যে একজন বিদ‍্যার্থীকে সংস্কৃত ব্যাকরণ শেখানো যায়, সেই চেষ্টাতেই যেন মুগ্ধবোধকার বিশেষভাবে নিমগ্ন ছিলেন। এই সংক্ষেপ করার চেষ্টা ব‍্যাকরণটির সর্বত্রই চোখে পড়ে।  যেমন- পাণিনী ব্যাকরণের ভিত্তি রূপে ব্যবহৃত ১৪ টি শিবসূত্র বা মহেশ্বর সূত্র বা প্রত‍্যাহারসূত্রকে কমিয়ে মুগ্ধবোধে ১০টি সূত্রে পরিণত করা হয়েছে। এই ব‍্যাকরণের বিষয়বস্তু বিন‍্যাস বেশ প্রশংসনীয় -সংজ্ঞা, সন্ধি, শব্দ,  স্ত্রী-প্রত্যয়, কারক, সমাস, তদ্ধিত প্রত‍্যয়, ধাতু এবং প্রকরণ। পরবর্তীকালে এই ধরনের বিষয় বিন্যাস পাণিনীয় ব‍্যাকরণের প্রক্রিয়াক্রমে রচিত সিদ্ধান্তকৌমুদী প্রভৃতি গ্রন্থকে প্রভাবিত করেছিল বলেও কেউ কেউ মনে করেছেন। যাইহোক, বলা চলে যে মুগ্ধবোধ ব্যাকরণের বিষয় – বিন্যাস এবং আলোচনা পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক যুক্তিনিষ্ঠ এবং গ্রন্থাকারের মূল উদ্দেশ্যের পরিপোষক। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতি সংক্ষিপ্ততার দিকে নজর দিতে গিয়ে কৃত্তিমতা ও দুর্বোধ্যতার দায়েও অভিযুক্ত হয়েছেন বোপদেব। যেমন- অনেক এই প্রসঙ্গে ‘ ঢ্রেঢ্রির্ঘশ্চানুঃ’ সূত্রটির উল্লেখ করেছেন।

মুগ্ধবোধ ব‍্যাকরণের টীকাসমূহ:-

মুগ্ধবোধ ব্যাকরণের ওপর বহুটীকা – টীপ্পনীও রচিত হয়েছে। টীকাকারদের মধ‍্যে রামচন্দ্র তর্কবাগীশ, দুর্গা দাশ বিদ্যাবাগীশ,  কাশীশ্বর ভট্টাচার্য, ভরত মল্লিক দেবিদাস চক্রবর্তী প্রভৃতির নাম করা চলে। এদের মধ্যে আবার রামচন্দ্র তর্কবাগীশের প্রমোদজননী (নামান্তর অশোক মালিকা) এবং দুর্গাদাশ বিদ্যাবাগীশের ‘সুবোধা’ টীকাই সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ।

মুগ্ধবোধ ব‍্যাকরণের পরিশিষ্ট:-

মুগ্ধবোধের অপর পরিশিষ্ট জাতীয় রচনাও লেখা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে নন্দকিশোর শর্মার রচিত-‘ মৌগ্ধবোধং পরিশিষ্টম্’ নামক রচনাটির নাম করা চলে।

মূল‍্যায়ণ:-

মুগ্ধবোধ ব‍্যাকরণকেও অবলম্বন করে পরবর্তীকালে পদ‍্যে ও গদ‍্যে আরও অনেক ছোট – বড় ব্যাকরণগ্রন্থও রচিত হয়েছিল। যেমন- হরনাথ বিদ‍্যারত্নের লেখা সুগম মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ, ভরতমল্লিকের দ্রুতবোধ প্রভৃতি। এসব থেকে বোঝা যায় যে, মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ পরবর্তীকালের বৈয়াকরণগনদের ওপর কী বিরাট প্রভাব  ফেলেছিল।

Leave a Comment