ভারতীয় আর্যভাষার বিভিন্ন স্তর সম্বন্ধে যা জান লেখো

উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ (WBCHSE ) কর্তৃক প্রকাশিত দ্বাদশ শ্রেণীর সংস্কৃত  ভাষাতত্ত্ব ( Higher Secondary Sanskrit bharatiya arya bhasar bivinno stor ) এর বড় প্রশ্ন ভারতীয় আর্যভাষার বিভিন্ন স্তর সম্বন্ধে যা জান লেখো।

ভারতীয় আর্যভাষার বিভিন্ন স্তর সম্বন্ধে যা জান লেখো।

 উ: মূল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী আর্যজাতির একটি শাখা ইন্দো-ইরানীয় শাখা ইরাক, ইরান-পারস্যের পর ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। এই শাখার ভাষাকেই বলা হয় ইন্দো-ইরানীয় বা আর্যভাষা।পরবর্তীতে এই শাখাটি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়, যার একটি শাখা গিয়েছিল ইরান —পারস্যে।এই শাখার প্রাচীনতম নিদর্শন পাওয়া যায় প্রাচীন পারসিকদের ধর্মগ্রন্থ আবেস্তা -য় এবং খামেনীয় সম্রাটদের প্রাচীন প্রত্নলিপিতে।

 ইন্দো-ইরানীয় অপর শাখাটি প্রবেশ করে ভারতবর্ষে, যা ভারতীয় আর্যভাষা নামে পরিচিত।ভারতবর্ষে অনুপ্রবেশের কাল থেকে আজ পর্যন্ত হিসাব করলে ভারতে আর্যভাষার বিস্তৃতিকাল প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর।

এই সুদীর্ঘ সময়কাল যাবৎ ভারতীয় আর্যভাষা যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, সেই পরিবর্তনকে তিনটি প্রধান স্তরে ভাগ করা যায়।

1. প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা

প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার আনুমানিক বিস্তৃতিকাল হিসাবে ১৫০০-১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সময়কে ধরা হয়ে থাকে।

এই যুগে ভারতীয় আর্যভাষার মূল নির্দশন হিসাবে বেদ-কে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বেদ বলতে বেদের সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ্—এই চারটি অংশকেই বুঝতে হবে।শুধু তাই নয়, পরবর্তীকালীন সূত্রসাহিত্যও এই অংশের অন্তর্ভুক্ত।এছাড়াও ইতিহাস, পুরাণ ও রামায়ণ মহাভারতের ভাষাও এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত।

এই স্তরের বৈশিষ্ট্যগুলিকে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা যেতে পারে

  • 1. এই স্তরে হ্রস্ব-দীর্ঘ প্লুত ভেদে প্রতিটি স্বরবর্ণ, স্পর্শ-উষ্ম-অন্তঃস্থ ইত্যাদি সকল ব্যঞ্জনবর্ণ, তিন প্রকার শিষ্ ধ্বনি এবং অনুনাসিক মিলিয়ে বর্ণমালা ছিল। একাধিক ব্যঞ্জনের যুক্ত ব্যবহার যথেচ্ছ পরিমাণে দেখা যায়। যেমন – প্রোজ্জ্বল ইত্যাদি।
  • 2. স্বর – ব্যঞ্জন ও বিসর্গ সন্ধির বিচিত্র ও জটিল প্রয়োগ বৈদিক এবং সংস্কৃত ভাষার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৈদিক ভাষায় স্বর ধ্বনিগুলির উপর স্বর-এর বিশেষ তাৎপর্য ছিল।
  •  3. সংস্কৃতের শব্দরূপের বিপুল বৈচিত্র্য অন্যতম লক্ষ্যণীয় বিষয়। ছয় কারক, সাতটি বিভক্তি, তিন লিঙ্গ এবং তিন বচনভেদে এক-একটি শব্দ থেকে অসংখ্য প্রত্যয়ান্বিত রূপ পাওয়া যায়।
  •  4. প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার ধাতুরূপেও অজস্র বৈচিত্র্য রয়েছে।

2. মধ্য ভারতীয় আর্যভাষা—

 মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার বিস্তৃতিকাল হিসাবে আনুমানিক ৬০০-৩০০ খ্রিঃ পূঃ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে ধরা যেতে পারে।

 এই যুগে ভারতীয় আর্যভাষার নিদর্শনরূপে সম্রাট অশোকের অনুশাসন গুলিকে উল্লেখ করা যায়। এছাড়াও পালি ভাষায় রচিত বিবিধ বৌদ্ধ সাহিত্য, প্রাকৃত ভাষায় রচিত জৈন সাহিত্য, সংস্কৃত নাটকের অংশবিশেষে ব্যবহৃত অংশগুলিও উল্লেখযোগ্য।মধ্যভারতীয় আর্যভাষার তিনটি উপস্তর অত্যন্ত স্পষ্ট।

প্রথম স্তরে পালি, দ্বিতীয় স্তরে প্রাকৃত এবং তৃতীয় স্তরে অপভ্রংশ বা অবহট্ ঠ

এই স্তরের ভাষার বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে প্রদত্ত হল—

  • 1. সংস্কৃত স্বরধ্বনিগুলির সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। সংস্কৃতের দীর্ঘ ঋ (ঋ) এবং দীর্ঘ-৯ (৯) ধ্বনি সম্পূর্ণ লুপ্ত। হ্রস্ব স্বরধ্বনিসমূহ কখনও দীর্ঘতাপ্রাপ্ত, আবার দীর্ঘস্বর কখনও হ্রস্বস্বরে রূপান্তরিত। সংস্কৃত- অশ্ব > প্রাকৃত- অস্ স।
  • 2. ম্ বা ন্ ভিন্ন অন্য ব্যঞ্জন পদাত্তে থাকলে তা লুপ্ত হয়েছে। সংস্কৃত, পশ্চাত্ >পালি প্রাকৃত, পচ্ছা। দন্তান প্রায়শঃ মূর্ধন্য ণ্-তে পরিণত। সং.নব পা / প্রাণব। পচ্ছা,
  • 3. শব্দরূপের সরলতা ক্রমশ বাড়তে লাগল। ব্যঞ্জনান্ত শব্দসমূহকে স্বরান্তে পরিবর্তিত করে শব্দরূপ গঠনের প্রবণতা অত্যন্ত প্রবল।
  •  4. ধাতুরূপের বিপুল বৈচিত্রাও ক্রমশ লোপ পেল।

(3) নবা ভারতীয় আনার্যভাষা

 নব্য ভারতীয় আর্যভাষার বিস্তৃতি কালরূপে আনুমানিক ৯০০ খ্রিঃ থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত সময়কে অনুর্ভুক্ত করা যায়। এই যুগে ভারতীয় আর্যভাষার নিদর্শন হিসাবে বর্তমান সময়কালের বিভিন্ন সাহিত্য উল্লেখযোগ্য।

 বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া, মারাঠী, গুজরাটি, রাজস্থানি, পাঞ্জাবি ইত্যাদি বিবিধ ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষায় রচিত সাহিত্যগুলিই এই স্তরের প্রকৃষ্ট নিদর্শন।

প্রসঙ্গত দক্ষিণ ভারতের তামিল, তেলেগু, কন্নড় ও মালয়ালম— এই চারটি ভাষা কিন্তু এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত নয়। এগুলি দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত।ইন্দো-ইউরোপীর ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত নয়।

এই স্তরের বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে এরকম—

  •  1. নব্য ভারতীয় ভাষাতে স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। তিনটি শিধ্বনির সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। তিনটি শিষধ্বনির পার্থক্য নির্ণয় করা অসম্ভব।
  • 2. পদমধ্যস্থিত যুক্ত ব্যঞ্জনও স্বরভক্তি, স্বরাগম, সমীভবন প্রভৃতির মাধ্যমে সরলীকৃত হয়েছে। যথা—নৃত্য >নচ্চ নাচ।
  • 3. শব্দরূপ ও ধাতুরূপের সরলতা অত্যন্ত স্পষ্ট। ধাতুরূপের প্রাচীন রূপও লুপ্ত। যথা— ঘৃত >ঘৃঅ> ঘি।
  • 4. কারক বিভক্তির স্থানে কিছু অনুসর্গের ব্যবহার বৃদ্ধি হয়েছে।

Leave a Comment