(টীকা) শ্রীমদ্ ভাগবত গীতা – সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস

শ্রীমদ্ ভাগবত গীতা সম্পর্কে কিভাবে ৫ নম্বর এর টীকা লেখা যায় তা তুলে দ্ধরা হল ।

শ্রীমদ্ ভাগবত গীতা (টীকা)

সূচনা:-

 শ্রী কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন রচিত মহাভারতের ভীষ্ম পর্বের 25 হতে 42 তম অধ্যায় শ্রীমদ্ভগবদগীতা নামে পরিচিত। গীতা ভীষ্ম পর্বের অন্তর্গত হলেও বর্তমানে এটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রূপে স্বীকৃত। ” গীতা ” ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ নি:সৃতবানী। ” গীতা”-র একটি অধ্যায়কে যোগ বলা হয়। তাই গীতার আর এক নাম “যোগশাস্ত্র”।

গীতা উদ্ভবের কারণ/পূর্বকথা:-

কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে যে দাঁড়িয়ে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন দেখলেন শত্রুপক্ষের আত্মীয় ও পরিবারবর্গ। এদের সঙ্গে যুদ্ধ করার কথা ভেবে অবসন্ন হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উজ্জীবিত করার জন্য যে উপদেশ দেন তাই গীতা।

গ্রন্থ বিন্যাস –

গীতার আঠারোটি অধ্যায় 745 শ্লোক উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে এর শ্লোক সংখ্যা 700। তাই একে সপ্তসতী বলা হয়।

বিষয়বস্তু :-

শ্রীকৃষ্ণ বীরের ধর্ম আত্মার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যে উপদেশ দেন তাই গীতার বিষয়বস্তু। ভারতীয় আধ্যাত্মতাবাদের মূল তত্ত্ব নিহিত আছে। গীতার মর্মবানী তিনটি। যথা:- (i)আত্মার অবিনশ্বরত্ব। (ii)নিষ্কাম কর্মযোগ এবং (iii)ঈশ্বরের নিকট পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ।কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান এবং তিনি সর্ব রূপে বিরাজিত এ কথাই গীতাতে প্রচারিত।

গীতার শিক্ষনীয় বিষয় –

ধর্মে উদারতা, কর্মে নিষ্ক্রিয়তা, জীব সেবা, স্বধর্ম পালন -এই উদার সর্বজনীন সার্বভৌম উপদেশই শিক্ষনীয় বিষয়।’যত মত তত পথ’ এই বাণী ও গীতাতে পাই।

মূল্যায়ন :- 

গীতা দার্শনিক কাব্য হিসেবে সমগ্র জগতের সমাদৃত। হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ রূপে পঠিত হয়। গীতাকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ বলা হয়।”শ্রীমদভাগবদগীতা” ভারতীয়দের শ্রেষ্ট দর্শন শাস্ত্র। পৃথিবীর প্রায় ৩৬টি ভাষায় গীতার অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।শঙ্করাচার্য, মাধবাচার্য, শ্রীধরস্বামী প্রমুখ পন্ডিতগন গীতার উপর বহুভাষ্য ও টীকা রচনা করেছেন। আধুনিককালেও বালগঙ্গাধরতিলক, ঋষি অরবিন্দ এবং মহাত্মাগান্ধীর ব্যাখ্যাও উল্লেখযোগ্য। সকল শাস্ত্রের সার সংগ্রহ করেই “শ্রীমদভাগবদগীতা”-র সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতীয় অন্যান্য ধর্ম শাস্ত্রে মোক্ষপ্রাপ্তির উপায়ের কথাতে আপাত বিরোধ বর্তমান। কিন্তু গীতা সেই সমস্ত বিরোধের অবসান ঘটিয়ে সমস্ত মত-পথের সমন্বয় সাধন করেছেন। এইজন্য গীতার জনপ্রিয়তা। দেশ ওকালের গন্ডি অতিক্রম করে গীতা বিশ্বমানের সামগ্রী হয়ে উঠেছে।

শ্রীমদ্ভগবদগীতা বা গীতা কি ?

উঃ=> বর্তমানে প্রচলিত মহাভারতের ভীষ্ম পর্বের ২৫-৪২ তম অধ্যায় পর্যন্ত অংশটি “গীতা বা শ্রীমদ্ভগবদগীতা” নামে পরিচিত।
মহাভারতের যুদ্ধে অর্জুন যখন প্রতিপক্ষরূপে নিজেরই আত্মীয় ও গুরুজনদের দেখে যুদ্ধ করতে অসম্মত হন, তখন পান্ডবদের পরামর্শদাতা, আত্মীয় ও বন্ধু বাসুদেব কৃষ্ণ তাঁকে যুদ্ধে উৎসাহ দেওয়ার জন্য যে সমস্ত উপদেশ প্রদান করেন, সেই উপদেশের সংকলনই গীতা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বলে, কথিত বলে তা “গীতা” (গৈ+ক্ত= গান বা কীর্তিত হয়েছে এই অর্থে গীত>গীতা, বানী বা বাক্ স্ত্রীলিঙ্গ বলে তার বিশেষনরূপে “গীতা” শব্দটিও স্ত্রীলিঙ্গে ব্যবহৃত।)

২) গীতা মহাভারতের কোন্ পর্বের অন্তর্গত ? এর অধ্যায় ও শ্লোক সংখ্যাকত ?

উঃ=> মহাভারতের ভীষ্মপর্বের ২৫-৪২ তম অধ্যায় পর্যন্ত অংশটিই গীতা বা ভগবদগীতা ।
এই গীতায় ১৮ টি অধ্যায় ও ৭০০ শ্লোক আছে। তাই গীতা “সপ্তশতী” নামেও পরিচিত।

৩) গীতা মহাভারতের অংশ না কি স্বতন্ত্র গ্রন্থ ?

ঐতিহ্য অনুসারে গীতা মহাভারতের ভীষম পর্বের অন্তর্গত, তাই মহর্ষি বেদব্যাস এর রচয়িতা । কিন্তু বিষয়বস্তুর বিচারে এবং স্বয়ং গীতার সাক্ষ্য অনুসারে গীতা উপনিষদ জাতীয় গ্রন্থ এবং তার প্রতিপাদ্য ব্রহ্মবিদা, যোগশাস্ত্র প্রভৃতি (প্রতি অধ্যায়ের শেষে আছে “ইতি শ্রীমদভগবদগীতাসু উপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে…..)। এদিক থেকে অনেকে গীতাকে স্বতন্ত্র গ্রন্থের মর্যাদা দিতে চান। তাঁদের মতে, গীতা একটি প্রাচীন অথবা অর্বাচীন (পরবর্তী) উপনিষদ, কিংবা ভাগবত দর্শন ও ধর্মসাধনার বিবিধ তত্ত্বের সংকলন এবং পরবর্তীকালে ভাগবত সম্প্রদায়ের দ্বারা মহাভারতের মধ্যে সংযোজিত, অন্তর্ভাবিত। এবিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কঠিন ।

৪) পরবর্তীকালে গীতার আদর্শে রচিত গীতানামধারী গ্রন্থগুলির নাম লেখ।

উঃ=> গীতার জনপ্রিয়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তীকালে বিভিন্ন ভারতীয় দর্শন সম্প্রদায় গীতা নাম দিয়ে নিজ নিজ ধর্ম ও সম্প্রদায়ের কথা প্রচার করেছে। সেরকম কয়েকটি গ্রন্থ হল- রামগীতা,শিবগীতা, শম্ভূগীতা, কপিলগীতা, শক্তিগীতা, গনেশগীতা, নারদগীতা, ভক্তিগীতা, পান্ডবগীতা, গুরুগীতা, পঞ্চদশীগীতা প্রভৃতি।

৫) গীতার প্রকৃত শিক্ষা কি ?

উঃ=> গীতায় বিভিন্ন মত ও পথের সত্যতা ও স্বাধীনতা স্বীকার করা হয়েছে। অতএব, গীতা এক মহত্তম অখন্ডতার আদর্শ, এক সমস্তকে-মস্তকে-ধারন-করা সমন্বয়ের বানী। এই হল গীতার পরম শিক্ষনীয় বিষয়।

৬) গীতার অধ্যায়গুলি কি নামে পরিচিত ? অধ্যায়গুলির ক্রমান্বয়ে উল্লেখ কর।
উঃ=> গীতার অধ্যায়গুলি “যোগ” নামে পরিচিত। এক একটি অধ্যায়ে এক একটি বিষয় আলোচিত। ক্রমানুসারে অধ্যায়গুলির নাম বিষাদ যোগ, সাংখ্যযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, সন্ন্যাসযোগ, ধ্যানযোগ, জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ, অক্ষরব্রহ্মযোগ, রাজযোগ, বিভূতিযোগ, বিশ্বরূপদর্শনযোগ, ভক্তিযোগ, ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ, গুনত্রয়বিভাগযোগ, পুরুষোত্তমযোগ, দৈবাসুরসম্পদবিভাগযোগ, শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ এবং মোক্ষযোগ।

৭) গীতা কি শুধুই দার্শনিক গ্রন্থ, না কি কাব্যরসময় রচনা ?

উঃ=> গীতাকে প্রধানতঃ জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি ও অন্যান্য দার্শনিক বিষয় আলোচিত হলেও তার গূঢ়ার্থ অপূর্ব কাব্যধর্মী ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। গীতার ভাষা সরল। একাদশ অধ্যায়টি (বিশ্বরূপদর্শনযোগ) মহৎ কবিকল্পনার শ্রেষ্ট নিদর্শন । তাই গীতার দার্শনিক মূল্য ও কাব্যমূল্য অস্বীকার করা যায় না। পাশ্চাত্য দার্শনিক হুমবোল্ট গীতাকে বিশ্বসাহিত্যের “Only truly philosophical poem”(একমাত্র যথার্থ দার্শনিক কবিতা ) রূপে উল্লেখ করেছেন।

৮) গীতার মর্মবানী কি ?

উঃ=> আত্মার অবিনশ্বরত্ব, নিস্কাম কর্মযোগ ও ঈশ্বরে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ- এই তিনটিই গীতার মর্মবানী, গীতায় জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির সমন্বয় সাধিত হয়েছে।

সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যান্য টীকাগুলি পড়ুন

Join Our Facebook Page

Leave a Comment