আত্মবোধপ্রকরণ: অনুবন্ধ কাকে বলে? কয়প্রকার ও কী কী?

অনুবন্ধ কাকে বলে? অনুবন্ধ কয়প্রকার ও কী কী? আত্মবোধপ্রকরণ, এম.এ সিলেবাসের অন্তর্গত ।

আত্মবোধপ্রকরণ: অনুবন্ধ কাকে বলে? অনুবন্ধ কয়প্রকার ও কী কী?

অনুবন্ধের সংজ্ঞা বা অনুবন্ধ কাকে বলে ?

শাস্ত্রে পুরুষের যাতে প্রবৃত্তি হয়, তার জন্য শাস্ত্রকারগণ শাস্ত্রারম্ভে ঐ শাস্ত্রের চারটি অনুবন্ধকে নির্দেশ করেন। ‘অনু’ পশ্চাৎ স্বজ্ঞানাৎ পরং ‘বধ্নাতি’ আসঞ্জয়তি প্রবর্ত্তয়তি পুরুষং শাস্ত্রে ইতি অনুবন্ধঃ’। অনুবন্ধগুলি স্ব স্ব জ্ঞানপূর্বক শাস্ত্রে পুরুষের প্রবৃত্তির হেতু হয়। এজন্য অন্নংভট্ট অনুবন্ধের লক্ষণ করেছেন- ‘প্রবৃত্তিপ্রয়োজকজ্ঞানবিষয়ত্বম্ অনুবন্ধত্বম্’। যার জ্ঞান হলে পুরুষের কৃতিসাধ‍্যতাজ্ঞান ও ইষ্টসাধনতাজ্ঞানপূর্বক শাস্ত্রে প্রবৃত্তি হয়, তাকে অনুবন্ধ বলে।

অনুবন্ধের প্রকারভেদ অর্থাৎ কয় প্রকার ও কি কি ?

শাস্ত্রের চতুর্বিধ অনুবন্ধ। যথা- i) বিষয়, ii) প্রয়োজন, iii) সম্বন্ধ ও iv) অধিকারী।

অনুবন্ধ সমূহ

(i) বিষয় :-

আত্মবোধই আলোচ‍্য ‘আত্মবোধ ‘ গ্রন্থের প্রতিপাদ‍্য বিষয়। এখানে আত্মবোধ শব্দের অর্থ আত্মজ্ঞান। আত্মার যথার্থস্বরূপজ্ঞান – আত্মতত্ত্বসাক্ষাৎকার। ঔপনিষদিক ভাবনায় নির্গুন ব্রহ্মই আত্মার স্বরূপ। তাই আত্মজ্ঞান বস্তুত ব্রহ্মজ্ঞানেরই পর্যায়। ব্রহ্ম ও আত্মার একত্ববিজ্ঞানে দুঃখময় বন্ধনের মূল কারণ মিথ‍্যাজ্ঞান বা আত্মবিষয়ক অজ্ঞানের বিনাশ হয়। অর্থাৎ ব্রহ্মাকার বিশুদ্ধ অন্তঃকরণবৃত্তিতে এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মচৈতন‍্যের অভিব‍্যক্তি হয় ও পুরুষের পরম প্রার্থনীয় ভূমানন্দ ব্রহ্মস্বরূপ লাভ হয়। সুতরাং, আত্মতত্ত্বোপলব্ধি- আত্মার একত্ব ও সর্বব‍্যাপিত্বের অপরোক্ষ নিশ্চয়জ্ঞানই হল আলোচ‍্য ‘আত্মবোধ’ গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ‍্য বিষয়।

ii) প্রয়োজন:-

সর্বপ্রকার দুঃখময় বন্ধন থেকে জীবনের ঐকান্তিক বিমুক্তিরূপ পরম পুরুষার্থই এর প্রয়োজন। অনুবন্ধ চতুষ্টয় এর সম‍্যক্ সম্ভাবহেতু আত্মবোধ গ্রন্থ অধ‍্যয়নে প্রেক্ষাবানগণের প্রবৃত্তি অবশ্যই স্বীকার্য। কেননা, প্রবৃত্তির প্রতি বস্তুর নিশ্চয়জ্ঞানইষ্টসাধনতা জ্ঞানই কারণ।

প্রকৃতস্থলে আত্মতত্ত্বের অপরোক্ষ নিশ্চয়জ্ঞান এবং ঐ আত্মজ্ঞানের পরম পুরুষার্থ মোক্ষজনকর্তাজ্ঞানই হবে এই আত্মবোধ গ্রন্থ অধ‍্যয়নের প্রয়োজক বা প্রবৃত্তির হেতু। যেটি সন্দিগ্ধ ও সপ্রয়োজন সেটিই হবে জিজ্ঞাস‍্য বা বিচার্য‍্য। এখানে এক ও অদ্বিতীয় আত্মতত্ত্বে বিদ্বজ্জনেরও প্রভূত সন্দেহ উদ্ভূত হওয়ায়, আত্মজ্ঞানের স্বরূপ বিষয়ে আচার্য‍্যদেরও মধ‍্যে নানা মতবিরোধ সঞ্জাত হওয়ায় আর আত্মজ্ঞানে নির্গুন ব্রহ্মত্বপ্রাপ্তিরূপ বিশেষ প্রয়োজন সিদ্ধ হওয়ায় আত্মবোধ প্রকরণটি প্রেক্ষাবান্ ব‍্যাক্তিগণের পক্ষে অবশ‍্যই জিজ্ঞাস‍্য ও বিচার্য‍্য হবে। ফলত ‘আত্মবোধ’ গ্রন্থখানি মুমুক্ষুগণের পক্ষে অবশ‍্যই আরম্ভণীয় হবে।

iii) সম্বন্ধ:-

বিষয়ের সঙ্গে এই গ্রন্থের প্রতিপাদ‍্যপাদক সম্বন্ধ এবং এই গ্রন্থের সঙ্গে অধিকারীর উপকার্যোপকারক সম্বন্ধ।

iv) অধিকারী:-

‘আত্মবোধপ্রকরণ’ গ্রন্থটির উপক্রমে জগদগুরু শঙ্করাচার্য‍্য বলেছেন-

“তপোভিঃ ক্ষীণপাপানাং শান্তানাং বীতরাগিনাম্।
মুমুক্ষুণামপেক্ষ‍্যোঅয়মাত্মবোধো বিধীয়তে।।”

এখানে ‘তপোভিঃ ক্ষীণপাপানাংশান্তানাং বীতরাগিনাম্ মুমুক্ষুণাম্’ – এই অংশে আচার্য‍্য আত্মবোধের অধিকারীকে নির্দেশ করেছেন। ‘

তপোভিঃ ক্ষীণপাপানাং ‘ ইত‍্যাদি অংশের তাৎপর্য‍্য এই শাস্ত্রনিষিদ্ধ সুরাপানাদি কর্ম ও শাস্ত্রবিহিত যাগাদি কাম‍্য কর্ম বর্জনপূর্বক অকরনে প্রত‍্যবায়জনক শ্রৌত ও স্মার্ত্ত নিত‍্য-নৈমিত্তিক কর্ম অনুষ্ঠানের ফলে যাঁদের চিত্ত থেকে রাগাদি দোষ বিদূরিত হয়েছে, আর বেদ-বেদান্তাদি শাস্ত্র নিয়ত অধ‍্যয়ন করার পর আত্মাই নিত‍্য একমাত্র সত্য পরমার্থ এবং আত্মভিন্ন বস্তু অনিত‍্য অসার অযথার্থ ।

এরূপ বিবেকজ্ঞান অর্জন করে যিনি ‘বীতরাগী’ অর্থাৎ ঐহিক (গ্রাম, পশু, পুত্র, স্বর্গ প্রভৃতি) ও আমুষ্মিক (স্বর্গ) ফলভোগবিরাগীহয়েছেন এবং ‘ শান্ত ‘ শমদমাদিসম্পৎসম্পন্ন জিতেন্দ্রিয় ও মুমুক্ষু হয়েছেন তিনিই হলেন আত্মবোধের প্রকৃত অধিকারী। এর দ্বারা সাধনচতুষ্টয়সম্পন্ন ব‍্যাক্তিই বেদান্তের অধিকারী। ব্রহ্মসূত্রভাষ‍্যকার আচার্য‍্য শঙ্করের এরূপ কথাই সূচিত হয়েছে।

একথাও উল্লেখ‍্য, উক্ত শ্লোকস্থ ‘আত্মবোধ’ শব্দে আত্মজ্ঞান বা জীব ও ব্রহ্মের একত্ববিজ্ঞানস্বরূপ বেদান্তপ্রতিপাদ‍্য বিষয় জ্ঞাপিত হয়েছে। আর এর দ্বারা অজ্ঞাননাশ অজ্ঞানজন‍্য বন্ধননাশ ও নিত‍্য নিরতিশয় পরমানন্দভূত ব্রহ্মস্বরূপে নিত‍্য অবস্থানরূপ বেদান্তসম্মত মোক্ষরূপ প্রয়োজনও উপলক্ষিত হয়েছে এবং এই গ্রন্থের সঙ্গে বিষয়ের ও অধিকারীর প্রাগুক্ত সম্বন্ধ বিশেষও অর্থত সূচিত হয়েছে। সুতরাং শাস্ত্রের প্রবৃত্তিহেতু অনুবন্ধচতুষ্টয় সুনিবদ্ধ হওয়ায় শঙ্করাচার্য‍্য প্রণীত আলোচ‍্য আত্মবোধ গ্রন্থে বিদ্ধজ্জনের প্রবৃত্তি যে অনিবার্য‍্য হবে তা দৃপ্তকন্ঠে স্বীকার্য‍্য।

Leave a Comment