ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষাপটল: সুত্র ব্যাখ্যা

ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষাপটল হতে সুত্র ব্যাখ্যা

Table of Contents

ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষাপটল হতে সুত্র ব্যাখ্যা

১) উষ্মা রেফী পঞ্চমো নামিপূর্বঃ।(১/১৬) সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

প্রসঙ্গ:- আলোচ‍্য সূত্রে রেফীসংজ্ঞার বিধান করা হয়েছে।

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষাপটল নামক প্রথম পটলের  অন্তর্গত।

ব‍্যাখ‍্যা:- পঞ্চম উষ্মবর্ণ অঃ (অর্থাৎ বিসর্গ) যদি নামিস্বরের পূর্বে থাকে, তখন রেফী সংজ্ঞা, আখ‍্যা দেওয়া হয়। অ,আ বাদে বাকি দশটি স্বরবর্ণকে নামি বলা হয়। যেমন- অগ্নিরশ্মিজন্মণা -এখানে অগ্নিশব্দের বিসর্গ টি রেফী সংজ্ঞা। এখানে বিসর্গটি পঞ্চম উষ্মবর্ণ। তারই আগে আছে ‘ই ‘ যা নামিবর্ণ তাই সংহিতা পাঠে ঐ বিসর্গ রেফী হয়েছে। এছাড়াও প্রাতঃ শব্দটি রেফী সংজ্ঞক।

২ ) স্বরান্তরং তু বিবৃত্তিঃ (২/৩)সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শ‍ৌণকের ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের সংহিতাপটল নামক দ্বিতীয় পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- বিবৃত্তির সংজ্ঞা নির্ণয় প্রসঙ্গে আলোচ‍্য সূত্রটির অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- (অর্থাৎ) স্বরের মধ‍্যে যে ব‍্যবধান বা আকাশ, তাই বিবৃত্তি বলে কথিত হয়। যেমন- ‘নূ ইত্থা তে পূর্বয়া চ ‘- এক্ষেত্রে ‘নূ ইত্থা’- এই স্বরদ্বয় মিলিত না হয়েছে একটু অবকাশ রয়েছে। এটিই বিবৃত্তি স্বরভক্তিকালা অর্থাৎ স্বরভক্তির উচ্চারণে সমাকাশযুক্ত অথবা তার অধিকসময়যুক্ত হবে।

৩) “ন‍্যায়ৈর্মিশ্রান্ অপবাদান্ প্রতীয়াৎ।(১/৫৩)সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ‘ঋগ্বেদ প্রাতিশাখ‍্য ‘ গ্রন্থের পরিভাষাপটল নামক প্রথম পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- সাধারন বিধি এবং বিশেষ বিধির মধ‍্যে কোনটি বলবান সেই প্রসঙ্গে আলোচ‍্য সূত্রটির অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- ন‍্যায় ও অপবাদ বিধির বলাবলত্ব বোঝানো হয়েছে। ন‍্যায় = সাধারনবিধি, অপবাদ = বিশেষবিধি। এর অক্ষরার্থ এই রকম অপবাদের অংশ বাদ দিয়ে সাধারন বিধি প্রযুক্ত হবে। অন‍্যভাবে বললে সামান‍্য বিধি ও বিশেষ বিধির মধ‍্যে কোনো বিরোধ হলে সেক্ষেত্রে বিশেষবিধিই বলবান হবে। সাধারন বিধি বিশেষবিধিকে জায়গা ছেড়ে দেবে । আরো একপ্রকার বিধি আছে শাস্ত্রসম্মত তার নাম প্রতিকণ্ঠবিধি। ব‍্যাকরণের ভাষায় এর নাম নিপাতন বিধি। এই বিধি সামান‍্য বা বিশেষ কোনো বিধিরই তোয়াক্কা করে না। যেমন- ‘নূ ইত্থা তে ‘ ইত‍্যাদি মন্ত্রে ‘নূ + ই’ -এর সন্ধি না হওয়া কি নূ এর দীর্ঘত্ব কোনোটাই বিধিসম্মত নয়। অথচ শাস্ত্রে  প্রয়োগ আছে, তাই একে নিপাতন বিধি বলে জানতে হবে।

৪) উভয়ে ত্বক্ষরানি। (১/৩)সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ‘ঋগবেদপ্রাতিশাখ‍্য’ গ্রন্থের পরিভাষাপটল নামক প্রথম পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- হ্রস্বস্বর এবং দীর্ঘস্বর উভয় মিলে অক্ষর সংজ্ঞা হয়। অক্ষরসংজ্ঞা প্রসঙ্গে এই সূত্রটি করা হয়েছে।

ব‍্যাখ‍্যা :- অ,আ,ই,ঈ,উ,ঊ,ঋ,ঋৃ -এই আটটি অক্ষরকে সমানাক্ষর বলা হয়। এ,ঐ,ও,ঔ -এই চারটি অক্ষরকে সন্ধ‍্যক্ষর বলা হয়। চারটি হ্রস্বস্বর (অ, ই,উ,ঋ) এবং আটটি দীর্ঘস্বর (আ,ঈ,ঊ,ঋৃ, এ,ঐ,ও,ঔ) উভয় মিলে বারোটি অক্ষরকে স্বরসংজ্ঞা বলা হয়। অক্ষর বলতে উভয় স্বরকে বোঝায়-হ্রস্বস্বর ও দীর্ঘস্বর। ভাষ‍্যকার উবট এর সঙ্গে যোগ করেছেন যে, ৯ কার এবং প্লুতস্বরকেও গুরুবর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে।

৫) প্রথমং শাকটায়নঃ।(১/১৬)সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষাপটল নামক প্রথম পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- পদান্ত বা পদান্তীয় বর্ণের নির্ণয় প্রসঙ্গে আলোচ‍্য সূত্রটির অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা :- আনুমানিক ভিন্ন অন‍্য যে সমস্ত স্পর্শবর্ণগুলি আছে অর্থাৎ প্রতিটি বর্ণের প্রথম বর্ণচতুষ্টয় অবসানে অর্থাৎ পদান্তে বিদ‍্যমান থাকলে বিকল্পে সেখানে তৃতীয় বর্ণ (গ,জ,ড,দ,ব) প্রাপ্তি হয় বলে আচার্য‍্য গার্গ‍্য মনে করেন।

        পদান্ত বা পদান্তীয় বলতে অবশ‍্য আচার্য‍্যদের মধ‍্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ প্রথম বর্ণকে পদান্ত বলেন, কেউ কেউ তৃতীয় বর্ণকে। গার্গ‍্য তৃতীয় বর্ণকে পদান্ত মনে করেন। পাণিনি বাবসানে সূত্রে প্রথম এবং তৃতীয় দুটি বিকল্পই স্বীকার করেছেন। শাকটায়ন শুধু প্রথমবর্ণকে পদান্তীয় বর্ণ বলেন। সেজন‍্য তাঁর মতে বাক্, ষট্, তৎ, ককুপ্ – এইসব প্রথম স্পর্শ পদান্ত বলে গণ‍্য হবে। তৃতীয় বর্ণ হবে না এবং এটিই আমাদের মতে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত। সন্ধিতে তৃতীয় বর্ণের আগম হতে পারে।
      

৬) চতস্রো অন্তস্থাস্ততঃ।(১/৯)সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষাপটল নামক প্রথম পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- অন্তঃস্থ বর্ণের সংজ্ঞা নির্ণয় প্রসঙ্গে আলোচ‍্য সূত্রটি করা হয়েছে।

ব‍্যাখ‍্যা:- ব‍্যঞ্জনবর্ণের প্রথম পঁচিশটি বর্ণের স্পর্শ সংজ্ঞা করার পর, তারপরের চারটি বর্ণ অন্তঃস্থ সংজ্ঞারূপে গণ‍্য হবে। এরূপ নামকরণের হেতু কী? ভাষ‍্যকার উবট একটি সমাধান দিয়েছেন, সেটি হল ঐ চারটি বর্ণ স্পর্শবর্ণ ও উষ্মবর্ণের মধ‍্যে বিদ‍্যমান থাকায় এগুলি ঐরূপ নামকরণ অন্তঃ অর্থাৎ মধ‍্যে। য,র,ল,ব- এই চারটি বর্ণ স্পর্শের পরে আর উষ্মবর্ণ অর্থাৎ হ,শ,ষ,স,অঃ,  X ক,  Xপ, অং-এই আটটি বর্ণের মাঝখানে অবস্থান করে।

৭) ‘ স্বরান্তরে ব‍্যঞ্জনানুত্তরস‍্য’।(১/২৩)সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষা পটল নামক প্রথম পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- দুটির স্বরের মধ‍্যে ব‍্যঞ্জনবর্ণটি উত্তর অর্থাৎ পরের স্বরের অঙ্গে হয়, এই প্রসঙ্গে আলোচ‍্য সূত্রটির অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- দুই স্বরের মধ‍্যগত ব‍্যঞ্জনের অঙ্গত্ববিচার করা হয়েছে। পূর্বসূত্র থেকে অক্ষরাঙ্গম্ অনুবৃত্তি নিতে হবে। অর্থ হবে যখন ব‍্যঞ্জনবর্ণটি স্বরবর্ণদ্বয়ের মাঝখানে থাকবে তখন তা উত্তর অর্থাৎ পরবর্তী স্বরবর্ণের অঙ্গ হবে। উদাহরন হিসাবে বলা যায়- ‘অয়ং দেবায় জন্মনে’। এক্ষেত্রে ‘অয়ম্ পদে ‘য়’ বর্ণটির পূর্বে ‘অ’ আছে পরে অ আছে (অয়ম্ = অ+য়+অ-ম্)। সেক্ষেত্রে য় টি পরবর্তী অ-এর অঙ্গ হবে এবং ঐ অ এর স্বর য় কার লাভ করবে। পূববর্তী স্বরের নয়। (অর্থাৎ ঐ অকার উদাত্ত হবে, অতএব য়-কার অকার  উদাত্ত হবে) ভাষ‍্যেও একথা বলা হয়েছে।

৮) ইপরো দীর্ঘবত্ প্লুতঃ।(১/৪)সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষাপটল নামক প্রথম পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- ই কার পরে যায় সেই বর্ণসমূহের প্লুতের কোন্ সংজ্ঞা হয়, সেই প্রসঙ্গে আলোচ‍্য সূত্রটির অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- আলোচ‍্য সূত্রটির ক্রম সন্ধি বিষয়ক। ঈ কারের পর যদি হ্রস্ব ই থাকে তাহলে সন্ধিতে ঈকার হবে। কিন্তু হিসাব মতো দুমাত্রা + একমাত্রা = তিনমাত্রা ই কারের প্লুত না হয়ে ঈ কারের মতো উচ্চারিত হবে এই হল সূত্রটির মর্মার্থ। এই দীর্ঘ নিরঅনাসিক হবে।

৯) সংহিতা পদপ্রকৃতিঃ।(২/১)সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শ‍ৌণকের ঋগ্বেদপ্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের সংহিতাপটল নামক দ্বিতীয় পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- সংহিতার বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে এই সূত্রটির অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- ‘সংহিতা পদপ্রকৃতিঃ’ অর্থাৎ পদ হচ্ছে যার প্রকৃতি, তাই সংহিতা। প্রাতিশাখ‍্যকার বলতে চেয়েছেন সংহিতা হল- পদের বিকার। পদই আসলে মূল, প্রকৃতিই হল পদ। সংহিতা পদসন্নিকর্ষজনিত বিকারমাত্র। সংহিতার সূত্রটি হল “পদান্তান্ পদাদিভিঃ সন্দধেতি য‍ৎ সা কালাব‍্যবায়েন”। অর্থাৎ কালের বা সময়ের ব‍্যবধান না রেখে পদান্তের সঙ্গে পদাদির মিলন। পানিনি সংহিতাকে বর্ণবিধি বললেও প্রাতিশাখ‍্যকার পদবিধি বলতে আগ্রহী। সে যাইহোক -চরিত্রগতভাবে উভয়েই সমপন্থী।

১০) আনপূর্বেন সন্ধীন্।সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য স‍ূত্রটির আচার্য শ‍ৌণকের ঋগবেদপ্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের সংহিতাপটল নামক দ্বিতীয় পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- সন্ধিকার্যের ক্রম নির্নয় প্রসঙ্গে আলোচ‍্য সূত্রটির অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- আলোচ‍্য সূত্রটিতে সন্ধিকার্যের ক্রম উল্লেখিত হয়েছে। সাধারনভাবে পদান্তের সঙ্গে পদাদির সন্ধি হয়, কালব‍্যবধান না রেখে, একথা দ্বিতীয় সূত্রেই বলা হয়েছে। কিন্তু সংহিতা পাঠে পদগুলি প্রশ্লিষ্ট (সংযুক্ত) হয়েই থাকে, সেখানে একাধিক সন্নিকর্ষ যদি হয়ে থাকে তাহলে সেই সন্ধিকার্যের ক্রম- অর্থাৎ কোন্ সন্ধিটি আগে হয়েছে কোন্ সন্ধিটি পরে হয়েছে-  এমন সংশয় উপস্থিত হতে পারে। সেই সংশয় নিরসন করবে এই সূত্র। বলা হচ্ছে পদপাঠের ক্রমটি দেখতে হবে। সেই ক্রমে যে প্রশিষ্ট পদগুলি আগে আছে, ষদষ্ট জানতে হবে যে সেই সন্ধিটি পূর্বে হয়েছে। উদাহরণ দিলে আরো স্পষ্ট হবে ব‍্যাপারটি – যেমন- প্রশিষ্ট পদ – ‘ইন্দ্রেহি ম‍ৎস‍্যন্ধসঃ।’ এখানে পদপাঠ হল- ইন্দ্র /আ/ ইহি/মৎসি/অন্ধসঃ। তাহলে প্রথমে সন্ধিকার্য হবে ক্রমানুসারে ইন্দ্র + আ = ইন্দ্রা। তারপর ইন্দ্রা +  ইহি = ইন্দ্রেহি।

১১) এতে স্বরাঃ-সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ঋগ্বেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষাপটল নামক প্রথম পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- স্বরবর্ণের সংজ্ঞা নির্ণয় প্রসঙ্গে আলোচ‍্য সূত্রটির অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- ভাষ‍্যকার উবট চমৎকার ব‍্যাখ‍্যা ও বিচারপূর্বক স্বরবর্ণের স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর বক্তব‍্য হল যে সমস্ত সমানাক্ষর (অ, আ, ঋ, ঋৃ,ই, ঈ,উ,ঊ) ও সন্ধ‍্যক্ষরের (এ, ও,ঐ,ঔ) কথা পূর্বে বলা হল, সেই দ্বাদশ সংখ‍্যক বর্ণকে (অ থেকে ঔ পর্যন্ত, ৯ কার বাদ ) স্বর সংজ্ঞায় অভিহিত করতে হবে, ঐ বারোটি অক্ষরকে কেন স্বর রূপে অভিহিত করা হল? অন‍্য নামও তো দেওয়া যেতে পারতো। ভাষ‍্যকার একটি ব‍্যাখ‍্যা দিয়েছেন – ‘স্বর্যন্তে শব্দন্ত ইতি স্বরাঃ। অর্থাৎ যারা স্বয়ং অন‍্যের (বর্ণের) সাহায‍্য ছাড়াই উচ্চারিত হতে পারে।

১২) স্বরান্তং তু বিবৃত্তিঃ।সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি শৌণকের ঋগ্বেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের সংহিতাপটল নামক দ্বিতীয় পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- বিবৃত্তির সংজ্ঞা নির্ণয় প্রসঙ্গে আলোচ‍্য সূত্রটির অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- বিবৃত্তির সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-“স্বরান্তং তু বিবৃত্তিঃ” অর্থাৎ সন্নিকর্ষের সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও কোথাও কোথাও দুটি স্বরের মধ‍্যে একত্রীভবন না হয়ে একটু অবকাশ বা ফাঁক থাকে। সেই অবকাশটুকুই হল বিবৃত্তি। অবকাশ বা ফাঁক থাকে। সেই অবকাশটুকুই হল বিবৃত্তি। যেমন- নূ ইত্থা তে পূর্বয়া চ’ এক্ষেত্রে ‘নূ ইত্থা’ এই স্বরদ্বয় মিলিত না হয়ে একটু অবকাশ রেখেছে, এটিই বিবৃত্তি।

১৩) পূর্বো নন্তা নতিষু নম‍্যমুত্তরম্।সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ঋগ্বেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষাপটল নামক প্রথম পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- মূর্ধন‍্যী ভবনের ক্ষেত্রে কোনটি নন্তা এবং কোনটি নম‍্য হবে সে প্রসঙ্গে আলোচ‍্য সূত্রের অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- পূর্বসূত্রে (ঋকারদয়ো দশ নামিনঃ স্বরাঃ) নামি সংজ্ঞার বিধান করা হয়েছে। এখন কিভাবে নবর্ণ ণবর্নে কিংবা সবর্ণ ষবর্ণে পরিণত হয় তার শর্ত বা ক্ষেত্র আলোচিত হচ্ছে। পূর্বেই বলা হয়েছে এই প্রাতিশাখ‍্যের পঞ্চম পটল নতিপটল। সেখানে একটি সূত্রে বলা হয়েছে -“ঋকাররেফসকারা ণকারং নমন্তি”। অর্থাৎ  ঋকার, রকার এবং ষকার ন-কে ণ-তে পরিণত করে। এ প্রসঙ্গে পাণিনি সূত্র ও বার্তিক স্মরণীয় ‘রষাভ‍্যাং নো নঃ সমানপদে’ এবং তৎসহ বার্তিক ‘ঋবণাচ্চেতি বক্তব‍্যম্’। সোজাকথায় ঋ, র, ষ- এই তিনটি বর্ণ নত্ববিধানের মূল হেতু। আলোচ‍্য সূত্রে বলা হল- নত্ববিধানে যে বর্ণটি পূর্বে থেকে নত্বের নিমিত্ত হয় সেটিকে নন্তা বলে। আর পরের যে বর্ণটি নত্বে পরিণত হয়, সেটি নম‍্য। ভাষ‍্যে স্পষ্ট তা বলা হয়েছে- “পূর্বো নন্তা বর্ণো ভবতি; নম‍্যং ব‍্যঞ্জনমুত্তরম্।”

উদাহরণ:- ‘নৃবাঅনম্’ (ঋ,২/৩৭/৫)। পূর্বে ঋকার (ন্ + ঋ) নন্তা এবং পরে ণ নম‍্য, (সেটি মূলে দন্ত‍্য ন বর্ণ ছিল।

১৪) অনুস্বারো ব‍্যঞ্জনং বা স্বরো বা।সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটির আচার্য শৌণকের ঋগ্বেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের পরিভাষা পটল নামক প্রথম পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- অনুস্বারের স্বরূপ নির্নয় প্রসঙ্গে আলচ‍্য সূত্রটির অবতারণা।

ব‍্যাখ‍্যা:- বর্ণসমাম্নায়ে অং বলে অনুস্বারের পাঠ  আছে। এই বর্ণ স্বরবর্ণ না ব‍্যঞ্জনবর্ণ সে সম্পর্কে সূত্রকার বিচারে প্রবৃত্ত হয়ে বলেছেন। এটির মধ‍্যে স্বরবর্ণ ও ব‍্যঞ্জনধর্ম উভয়ই বিদ‍্যমান থাকায় এটিকে স্বরবর্ণ এবং ব‍্যঞ্জনবর্ণ উভয়রূপে বিবেচনা করতে হবে। অং রূপে পঠিত অনুস্বারের মধ‍্যে হ্রস্বত্ব, দীর্ঘত্ব, প্লুতত্বাদি ধর্ম থাকায় তাকে স্বরবর্ণ এবং অর্ধমাত্রা স্বরবর্ণযোগে উদাত্তাদি ধর্ম থাকায় তা ব‍্যঞ্জনবর্ণ – এমনই মত উবটের। এখানে বলা আবশ‍্যক যে সূত্রটির তাৎপর্য নিয়ে কিছু জটিলতা আছে। কিন্তু সূত্রকার যখন অনুস্বারের পৃথক স্বরূপ উল্লেখ করেছেন তাতে বোঝাতে চেয়েছেন যে অনুস্বারের মধ‍্যে স্বরবর্ণ এবং ব‍্যঞ্জনধর্ম উভয় আছে কিন্তু এটি তদতিরিক্ত তৃতীয় ধরনের বর্ণ। ভাষ‍্যকার বলেছেন- অনুস্বারের উচ্চারন বিষয়টিও খুব সহজবোধ‍্য নয়।

১৫) উদাত্ত পূর্বং স্বরিতমনুদাত্তং পদেঅক্ষরম্।সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ঋগ্বেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের স্বরপটল নামক তৃতীয় পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- উদাত্ত পূর্বে থাকলে পরবর্তী স্বরিত অনুদাত্ত হবে এটি বলতে গিয়ে আলোচ‍্য সূত্রের অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- উদাত্তানুদাত্ত সন্ধিতে স্বরিত উৎপন্ন হয়। উদাত্তপূর্বম্-এর অর্থ উদাত্তস্বর পূর্বে থাকলে, তার পূববর্তী স্বরে যে স্বরিত অক্ষর দৃষ্ট হয় আসলে তা অনুদাত্ত। অন‍্যভাবে বললে উদাত্তের পরবর্তী কোনো অনুদাত্ত থাকলে সেখানে স্বরিত অক্ষর দৃষ্ট হয়।

উদাহরন:- আদ‍্যুদাত্ত  (+স্বরিত) = ইন্দ্রঃ।
                 মধ‍্যোদাত্ত (+স্বরিত) = অগ্নিনা।
                অন্তোদাত্ত -অগ্নিঃ ইত‍্যাদি।

উদাত্ত, অনুদাত্ত এবং স্বরিতের একাদশ প্রকার ঋগ্বেদ ব‍্যবহার ভাষ‍্যকার দেখিয়েছেন। এগুলি হল- আদ‍্যুদাত্ত, মধ‍্যোদাত্ত, অন্তোদাত্ত, আদিস্বরিত, শুধুস্বরিত, দ্বিরুদাত্ত, ত্রিরুদাত্ত, সর্বানুদাত্ত এবং শুধু উদাত্ত।

১৬) স্বরিতানুদাত্তানাং পরেষাং প্রচয়ঃ স্বরঃ।সুত্র ব্যাখ্যা- ঋগবেদ প্রাতিশাখ‍্য

উৎস:- আলোচ‍্য সূত্রটি আচার্য শৌণকের ঋগ্বেদ প্রাতিশাখ‍্য গ্রন্থের স্বর পটল নামক তৃতীয় পটলের অন্তর্গত।

প্রসঙ্গ:- স্বরিতের পর অনুদাত্ত প্রচয় স্বর হয়- এটা বলতে গিয়ে আলোচ‍্য সূত্রের অবতারনা।

ব‍্যাখ‍্যা:- সংহিতাপাঠে সাধারনত উদাত্তের পরবর্তী অনুদাত্ত স্বরিত হয়। সেই স্বরিতের পর এক বা একাধিক অনুদাত্ত থাকলে সেগুলির প্রচয় সংজ্ঞা হয়ে থাকে (যতক্ষণ না আর একটি উদাত্ত / স্বরিত আসছে। এই সমস্ত প্রচয়স্বরের উচ্চারণ উদাত্তশ্রুতি অর্থাৎ উচ্চারন উদাত্তের মতোই হবে। এখানে ঐ অনুদাত্ত অক্ষরগুলিকে বিশেষ প্রচয় সংজ্ঞা দেওয়া হল। এখানে পাণিনিসূত্রটিও উল্লেখ করা যেতে পারে – ” স্বরিতাং সংহিতায়ামনুদাত্তানাম্।” পাণিনি সেখানে অনুদাত্ত পদে বহুবচন বললেও তা এক বা একাধিক উভয়ক্ষেত্রেই প্রযোজ‍্য।

যেমন:-

“ইমং মে গঙ্গে যমুনে সরস্বতি ( ঝ.১০/৭৫/৫)
ই ম ম্ / মে /গ ঙ্গে /য মু নে /স র স্ব তি।

  পদপাঠ দেখলেই বোঝা যাবে যে স্বরিতের পরবর্তী স্বরগুলি অনুদাত্ত এবং স্বরিত পরবর্তী হওয়ায় তারা প্রচয়সংজ্ঞক উচ্চারণ উদাত্তশ্রুতি।

Leave a Comment