ঈশোপনিষদে বর্ণিত তত্ত্বজ্ঞানে কর্মের ভূমিকা

ঈশোপনিষদে বর্ণিত তত্ত্বজ্ঞানে কর্মের ভূমিকা আলোচনা করো।The role of action in the knowledge of theories described in is Upanishad.

ঈশোপনিষদে বর্ণিত তত্ত্বজ্ঞানে কর্মের ভূমিকা কি ?

উঃ- পরমাত্মা হলেন জগতের নিয়ন্ত্রণ এবং অধীশ্বর জগতে সাধকের একমাত্র লক্ষ্য হলো পরম ঈশ্বর লাভ করা পরমাত্মা বা ব্রহ্মই একমাত্র সত্য বস্তু। তাই তিনি শুদ্ধ মুক্ত জ্ঞানের স্বরূপ এবং আনন্দময় এই ব্রহ্ম তত্ত্ব জ্ঞান লাভের উপায় বিভিন্ন উপনিষদে বলা হয়েছে।

ঈশোপনিষদে মোক্ষ‍রূপ পরম পুরুষার্থ তথা ব্রহ্মোপলব্ধির জন্য দুটি পথের কথা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।একটি হল জ্ঞানমার্গ এবং অপরটি হল কর্মমার্গ। 

তত্ত্বজ্ঞ পুরুষেরা জ্ঞান মার্গকেই অবলম্বন করেন তারা জাগতিক সকল বিষয়কে পরিত্যাগ করেন কিন্তু যারা তত্ত্বজ্ঞ ও জ্ঞাণী নয় তারা কর্মমার্গকেই আশ‍্রয় করেন।

উপরোক্ত দুটি পথই পুরুষার্থ লাভে সহায়ক। কিন্তু ঈশোপনিষদে এই পথকে আশ্রয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে উক্ত দুটি পথের  সমুচ্চয়ের বা সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।

  ঈশোপনিষদের অবিদ্যা শব্দের দ্বারা কর্মানুষ্ঠান ও বিদ্যা শব্দের দেবতা জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে। অবিদ‍্যা বলতে সকাম অগ্নিহোত্রাদি কর্মানুষ্ঠানকে  বোঝায।

“কর্মনা পিতৃলোকঃ’

এই শ্রুতি বাক্য থেকে বোঝা যায় যে কর্মের দ্বারা পিতৃলোক লাভ হয়।

কিন্তু নির্দিষ্টকালের পর পুণ্যক্ষীন হলে কর্মীকে পুনরাষ্ট্র পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে হয় সুতরাং যে সাধক মুক্তি কামনা করেন তিনি  পিতৃলোক কামনা করেন না পুনঃ পুনঃ জন্মগ্রহণ করা হলো অন্ধকারময় তমিস‍্যায় প্রবেশ তূল্য।

পরন্তু যিনি বিদ্যা রত তিনি আরও অধিকতর ঘন অন্ধকারে প্রবেশ করেন। বিদ‍্যয়া দেবলোকঃ- এই শ্রুতি বাক্য অনুসারে সাধক দেবতা চিন্তাদ্বারা ব্রহ্মলোক ইন্দ্রলোক প্রভৃতি দুর্লভ স্থান লাভ করে।

কিন্তু এর ফল চিরস্থায়ী নয় প্রাপ্ত দেবলোকে সুকৃতি বা পূণ্য লাভের সঙ্গে সঙ্গে সাধককে পুনরায় দেভলক পরিত্যাগ করে পৃথিবীতে ফিরে আসতে তাই মোক্ষ অভিলাষী সাধকের নিকট কেবল বিদ‍্যা বা দেবতা চিন্তায় রত হওয়া কাম‍্য নয়।

এতে রত হওয়ার ফলে তাকে অবিদ‍্যা উপাসনার ফললাভ থেকেও অধিকতর অন্ধকারে প্রবেশ করতে হয। দেবতা চিন্তার জন্য বেদবিহিত নিত্যকর্মের অনুষ্ঠান হয় না। ফলে বিষময় পাপ হয়ে থাকে।

কেবলমাত্র দেবতা চিন্তার দ্বারা মুক্তিলাভ সম্ভবপর হয় না। বরঞ্চ নিত্য অনুষ্ঠান না করার জন্য যুগপৎ পাপ এবং অধোগতি লাভ হয় তাই এখানে বিদ্যা এবং অবিদ্যা অর্থাৎ কর্ম অনুষ্ঠান এবং দেবতার চিন্তার নিন্দা করা হয়েছে।

এই নিন্দা অর্থ হল উভয়ের সমুচ্চয়ের প্রশংসা করা। মুক্তি লাভের জন্য জ্ঞান এবং কর্মে সমন্বয় সাধন একান্তভাবে আবশ্যিক।শ্রুতিতে কর্ম এবং দেবতা চিন্তা এই উভয়ের পৃথক অনুষ্ঠানের নিন্দা করা হয়েছে।

কিন্তু উভয়ের মিলিতভাবে অনুষ্ঠান করলে সমুচ্চয়কারী অবিদ‍্যা বা কর্মের দ্বারা মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারেন এবং বিদ্যা বা দেবতা চিন্তাদ্বারা অমৃতত্ব লাভে সমর্থ হন। খানে মৃত্যু বলতে মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান ও কর্মকে বোঝানো হয়েছে অমৃতত্ত্ব হল আপেক্ষিক।

ব‍্রহ্ম জ্ঞান ব্যতীত পারমার্থিক অমৃতত্ব লাভ করা যায় না। তবে বিদ্যা বা দেবতা চিন্তার দ্বারা উপাসক দেবভাব লাভ করায় অমৃতত্ত্বই লাভ করেন। কারণ মনুষ্যভাব অপেক্ষা দেবভাব অমৃতত্ত্বের মতোই।তাই একে আপেক্ষিক অমৃতত্ব বলা হয়েছে পারমার্থিক মৃত্যুকে অতিক্রমণের কথা

এবং পারমার্থিক অমৃতত্ব লাভের কথাও বলা হয়নি অবিদ্যার দ্বারা আপেক্ষিক মৃত্যুকে অতিক্রম করলেও সমুচ্চয়কারীকে জন্মমরণ প্রবাহরূপ সংসারে আবর্তিত হতে হবে। বিদ্যার দ্বারা দেবতা ভাব প্রাপ্ত হলেও মুক্তি সম্ভব নয। পুনঃ জন্ম থেকে অব‍্যাহতি লাভের জন্য ব্রহ্ম জ্ঞান প্রয়োজন।

তাই অন্যত্র বলা হয়েছে-

“ত্বমেববিদিত্বাঅতিমৃত‍্যুমেতি নান‍্য পন্থাঃ বিদ‍্যতে অয়নায়’।

বিদ্যা ও অবিদ্যার সমুচ্চয়ের ক্ষেত্রে একটিকে অপরটির অঙ্গ বলে চিন্তা করা যুক্তিযুক্ত নয। কেননা উভয়ের সমুচ্চয় করতে হলেও কোনটি নিষ্ফল নয।

উভয়ের পৃথক পৃথক ফল আছে কিন্তু বিদ্যা ও অবিদ্যা সমুচ্চয় অবলম্বন করলে অমৃতত্ব লাভ করা যায়

তাই ঈশোপনিষদে বলা হয়েছে-

বিদ‍্যাং চাবিদ‍্যাঞ্চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ।
অবিদ‍্যয়া মৃত‍্যুং তীর্ত্বা বিদ‍্যয়ামৃতমশ্নুতে।।

ব্রহ্ম তার সৃষ্টি বিদ্যা এবং অবিদ্যা উভয়কে একসঙ্গে গ্রহণ করেছেন।

কারণ সৃষ্টিতে আত্মা বিকাশের জন্য সৃষ্টি কার্য সম্পাদন এবং  উহার উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্ত বিদ‍্যা ও অবিদ্যার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

বিদ্যা ও অবিদ্যাকে ধারণ ও পোষণ করে বলেই অবিদ্যা থাকতে পারে। পুনরায় আত্মার পক্ষে সেই মহান একত্বের জন্য প্রস্তুত হওয়া এবং তাঁহার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার নিমিত্ত বিদ‍্যা অবিদ‍্যার উপর নির্ভরশীল।

একটি পরিত্যাগ করে অপরটি কখনোই থাকতে পারে না কারণ একটি যদি বিলুপ্ত হয় তবে উভয় এমন অবস্থায় পৌঁছাবে যথা বিদ্যাও নহে, আবার অবিদ্যাও নহে।

যাহা সমস্ত প্রকাশের অতীত হবে যাহা কল্পনা করা যাবে না এবং বাক্য দ্বারা প্রকাশ করা যাবে না।অবিদ্যার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলে মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারে বিদ‍্যা অবিদ‍্যাকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করলে মানুষ অমৃতত্ব লাভ করতে সক্ষম হয।

এভাবে ঈশোপনিষদে তত্ত্বজ্ঞানে কর্মের সমুচ্চয় বা সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।

ঈশোপনিষদ হতে গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট গুলি

  1. ঈশোপনিষদে প্রতিপাদিত শিক্ষনীয় বিষয় আলোচনা

2. ঈশোপনিষদে বর্ণিত তত্ত্বজ্ঞানে কর্মের ভূমিকা

ঈশোপনিষদ হতে মন্ত্রগুলির বাখ্যাগুলি পড়ুন

ঈশোপনিষদ মন্ত্র বাখ্যা-(1-4)
ঈশোপনিষদ মন্ত্র বাখ্যা-(5-7)
ঈশোপনিষদ সংস্কৃত মন্ত্র বাখ্যা-(8-10)
ঈশোপনিষদ মন্ত্র বাখ্যা-(11-13)

Leave a Comment