নিরুক্ত

নিরুক্ত বেদাঙ্গ সম্পর্কে আলোচনা করো। বেদের মন্ত্রগুলির সঠিকভাবে বোঝাতে বেদাঙ্গের জ্ঞান অপরিহার্য।

নিরুক্ত- টিকা

বৈদিক সাহিত্যের শেষ দিকে সংহিতাব্রাহ্মণ, অরণ্যকউপনিষদের বাইরেও এক বিশাল সাহিত্য গড়ে উঠেছিল,  যার নাম বেদাঙ্গ।  বেদের মন্ত্রগুলির সঠিকভাবে পাঠ, শব্দবোধ, অর্থবোধ এবং ক্রিয়ার সঙ্গে সম্বন্ধ বোঝাতে বেদাঙ্গের জ্ঞান অপরিহার্য।

ষড়্ ভেডাঙ্গের মধ্যে বিলুপ্ত হলো অন্যতম এর রচয়িতা হলেন যাস্ক। নির√বচ্+ ক্ত = নিরুক্ত। নিরুক্ত শব্দের আক্ষরিক অর্থ নিঃশেষে উক্ত অর্থাৎ যেখানে নিঃশেষে পদ সমূহ ব্যাখ্যাত হয়েছে তাকে নিরুক্ত বলে।  নিরুক্তকে বেদের কর্ণরূপে কল্পনা করা হয়েছে-

‘নিরুক্তং শ্রোত্রমুচ‍্যতে’।

পন্ডিতদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ থেকে ৫০০ অব্দের মধ্যে এই গ্রন্থের রচনাকাল বলে অনুমান করেছেন।

যাস্কের  নিরুক্ত গ্রন্থের‍ তিনটি ভাগ –

  • i) নৈঘন্টুক কান্ড,
  • ii)  নৈগম কাণ্ড এবং
  • iii) দৈবত কান্ড।

তাই এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-


” আদ‍্যং নৈঘন্টূকং কান্ডং দ্বিতীয়ং নৈগমং তথা।
তৃতীয়ং দৈবতঞ্চেতি সমাম্নায়স্ত্রিধা স্থিতঃ।”

i) নৈঘন্টূক কান্ড:-

নৈঘন্টুক কান্ডের পাঁচটি অধ্যায় আছে। এই কাণ্ডের সংক্ষিপ্ত নাম নিঘন্টু। এতে সমার্থক শব্দ ও অনেকার্থক শব্দ পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বিশেষ্যপদ ও ক্রিয়াপদের সমার্থক শব্দের সমাবেশ এখানে হয়েছে। এই নৈঘন্টুক কাণ্ডে যাস্ক চার ধরনের পদকে স্বীকৃত দিয়েছেন- নাম (বিশেষ‍্য-বিশেষণ ও সর্বনাম) আখ‍্যাত (ক্রিয়া), উপসর্গ ও নিপাত (অব‍্যয়)। এই নিঘন্টু পরবর্তীকালের কোষগ্রন্থ, অমরকোষ, মেদেনীকোষ প্রভৃতির উৎস।

ii) নৈগম কান্ড:-

এই কান্ডে বেদে ব্যবহৃত বেশ কিছু শব্দের বুৎপত্তি, অর্থ দৃষ্টান্ত ও মন্ত্র বা মন্ত্রাংশের উদ্ধৃতিসহ ব্যাখ্যাত হয়েছে। নিগম শব্দের অর্থ বেদ। সেই অর্থে যাস্ক এই কথাটি আলোচনা করেছেন।

iii) দৈবত কান্ড:-

এই কান্ডে বৈদিক দেবতাতত্ত্বের বিস্তৃত বিচার করেছেন যাস্কাচার্য। ভূলোক, অন্তরীক্ষ লোক ও দ‍্যুলোক ভেদে দেবতাদের ৩টি শ্রেনীতে বিভক্ত করে কোন  দেবতার মন্ত্র কোন ছন্দে রচিত হবে প্রভৃতির বিশ্লেষণ করেছেন। এই তিন দেবতা পরস্পর স্বতন্ত্র নন। তাঁরা একক পরমাত্মার অংশ বিশেষ –

” দেবতায়া এক আত্মা বহুধা স্তূয়তে।”

ব‍্যুৎপত্তি অনুশীলনের ক্ষেত্রে সেই প্রাচীনকালে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দেও যাস্ক বিস্ময়কর অবদানের সাক্ষ‍্য রেখে গেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে শব্দসমুহের নির্বাচন সম্ভব। একথা স্পষ্ট যে বৈয়াকরণদের এক দীর্ঘতর ঐতিহ‍্যের পরিণত পর্বে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর নিজস্ব অবদান এত অসামান‍্য ছিল যে পূর্বসূরীদের কীর্তিকে সম্পূর্ণ ম্লান করে দিয়েছিল।

Leave a Comment