কাতন্ত্র ব্যাকরণ

ব্যাকরণ সাহিত্যের ইতিহাস হতে কাতন্ত্র ব্যাকরণ সম্পর্কে যা জানো লেখো- কেন এই ব্যাকরণকে কলাপ বলা হয়? কাতন্ত্র ব্যাকরণের নামান্তর বা কলাপ নামকরণের কারন আলোচনা করা হল ।

কাতন্ত্র ব্যাকরণ সম্পর্কে যা জানো লেখো


ভূমিকা :- অপানিণীয় অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রধান ব্যাকরণগুলির মধ্যে প্রথমেই নাম করতে হয় ‘কাতন্ত্র ব‍্যাকরণ’ -এর। প্রাচীনত্ব, মৌলিকত্ব, জনপ্রিয়তা প্রভৃতি দিক থেকে বিচার করলে অপাণিনীয় ব্যাকরণগুলির মধ্যে কাতন্ত্র ব্যাকরণের শ্রেষ্ঠত্ব অবশ্যই স্বীকার করতে হয়। এই ব্যাকরণকে ঘিরেই যে ব্যাকরণ সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছিল, তাই কাতন্ত্র ব্যাকরন সম্প্রদায় বা The katantra school of sanskrit grammer’  নামে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে।

কাতন্ত্র ব্যাকরণের নামান্তর

এই ব্যাকরণটির মোট চারটি নাম পাওয়া যায়- কাতন্ত্র, কলাপ,  কলাপক এবং কৌমার।

কাতন্ত্র ব্যাকরণের সম্প্রদায়:- 

এই ব‍্যাকরণের দুটি শাখা সম্প্রদায়ের কথা পণ্ডিতগণ স্বীকার করেছেন – কাশ্মীরের বাররুচ সম্প্রদায় এবং বঙ্গদেশের দৌর্গ সম্প্রদায়।

কাতন্ত্র শব্দটির ব্যুৎপত্তি:- 

এখানে কাতন্ত্র শব্দটির অর্থ হল লঘুতন্ত্র। কাতন্ত্রবৃত্তিটীকাকার দুর্গসিংহ প্রভৃতি বৈয়াকরণগণ এই অর্থই করেছেন।  শব্দটিকে ভাঙলেও এই অর্থ পাওয়া যায়- কাতন্ত্র = কা + তন্ত্র, অর্থাৎ ‘ ইষৎ তন্ত্রম্’।

কাতন্ত্র ব্যাকরণের রচয়িতা :-

এই কাতন্ত্র ব্যাকরণটির  রচয়িতা কে? -এই প্রশ্নের উত্তরেও বিভিন্ন পন্ডিত বিভিন্ন অভিমত দিয়েছেন । তবে অধিকাংশ পন্ডিতেরই ধারণা ব্যাকরণটি শর্ববর্মা বা সর্ববর্মার নামে প্রচলিত  থাকলেও তাঁরও পূর্বে কোনো একটি কাতন্ত্র ব‍্যাকরণ ছিল, যাকে কেউ কেউ বৃদ্ধকাতন্ত্র, আদ‍্য- ব‍্যাকরণ  প্রভৃতি নামে উল্লেখ করেছেন।  মনে হয় শর্ববর্মা সেই পূর্বেকার কাতন্ত্র ব্যাকরণটিকে অবলম্বন করেই নিজের ব্যাকরণটি রচনা করেছেন।

শর্ববর্মার সময়কাল :-

বিভিন্ন মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ পন্ডিতই শর্ববর্মাকে  খ্রিস্টীয় প্রথম শতক বা দ্বিতীয় শতকের মধ‍্যেই রাখতে চেয়েছেন।

কাতন্ত্র ব্যাকরণের বিষয়বস্তু:-

পাণিনীয় ব্যাকরণের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই যেন কাতন্ত্রের ক্রমশঃ বৃদ্ধি ঘটেছে। প্রারম্ভিক স্তরে কাতন্ত্র ব্যাকরণের বিষয়বস্তু মূলত চারটি ভাগে বিন‍্যস্ত ছিল – সন্ধি, শব্দ(নাম), কারক ও আখ‍্যাত (ধাতু)। এই কারনেই  হয়তো চতুষ্টয় আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। পরে ক্রমশ এর কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃৎ সহ সমগ্র কাতন্ত্রে মোট ২৬ টি পাদ আছে। তবে বিভিন্ন সংস্করণে সূত্রসংখ্যা ৮৫৫, বেলভালকারের মতেও ৮৫৫, ঢাকা সংস্করণে ৮৫৪ টি। তবে কৃৎপ্রকরণ ও অন্যান্য প্রকরণ ধরে হিসাব করলে সূত্র সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি দাঁড়ায়।


কাতন্ত্র ব্যাকরণের বৈশিষ্ট্য :-

এই ব‍্যাকরণের বিষয় বিন্যাস ভাষা শিক্ষার পক্ষে বেশ অনুকূল। সহজ এবং সহজবোধ্য হওয়ায় সাধারণের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। তবে তদ্ধিতাংশ অতিসংক্ষিপ্ত হওয়ায় অসুবিধা হয়। তাই বলাও হয় ‘কালাপাস্তদ্ধিতে মূঢ়’।

         পন্ডিত যুধিষ্ঠির মীমাংসককে অনুসরন করে বলা যায় যে, বর্তমান কাতন্ত্র ব্যাকরণের মূল কর্তা শর্ববর্মা হলেও কৃদন্ত ভাগের কর্তা কাত্যায়ন এবং কাতন্ত্রোত্তর- এর কর্তা বিজয়ানন্দ। এই ব্যাকরন মূলত লৌকিক প্রয়োজনের দিকেই বেশি মাত্রায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে। এর আকৃত্রিম সারল‍্য আর সহজবোধ্যতা ব্যাকরণ শিক্ষাকে জনপ্রিয় করে তোলার কাজেও যথেষ্ট উপযোগী হয়েছে। বঙ্গদেশে এই ব্যাকরন বিশেষভাবে চর্চিত হয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও ভারতের নানাস্থানে এর পঠন-পাঠনের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

কাতন্ত্র ব‍্যাকরণের বৃত্তি ও টিকাসমূহ:- 

এই কাতন্ত্র ব্যাকরণের অনেক বৃত্তিকার হয়তো ছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন যে, শর্ববর্মা নিজেই হয়তো বৃহৎবৃত্তি নামে একটি বৃত্তি লিখেছিলেন, কিন্তু বর্তমানে তা পাওয়া যায় না। কৃদন্ত সহ সমগ্র কাতন্ত্রের ওপরেই দৌর্গসিংহী বৃত্তি রচিত হয়েছে। রচনায় পতঞ্জলি মহাভাষ্যের প্রভাব চোখে পড়ে। এই দূর্গবৃত্তির ওপরে দুর্গগুপ্তসিংহ, উগ্রভূতি,  ত্রিলোচন দাস প্রমুখরা টীকা লিখেছিলেন। ত্রিলোচন দাসের রচিত কাতন্ত্রপঞ্জিকা -র ওপরেও ত্রিবিক্রম, বিশেশ্বর তর্কাচার্য প্রভৃতি বৈয়াকরণগন টিকা – ব্যাখ্যাদি রচনা করেছেন। এছাড়া বর্ধমানের কাতন্ত্রবিস্তর, জগদ্ধরভট্টের বালবোধিনী প্রভৃতি টীকারও  নাম করা চলে। পুন্ডরীকাক্ষ বিদ্যাসাগরের রচিত কাতন্ত্রপ্রদীপ ও সুষেণ বিদ‍্যাভূষণ রচিত কলাপচন্দ্র বা কবিরাজ ও কাতন্ত্র সম্প্রদায়ের দুটি নামকরা গ্রন্থ -তথা ব‍্যাখ‍্যা। বস্তুত টীকা-পঞ্চী-কবিরাজ – এই তিনটি গ্রন্থেরই প্রাধান‍্য পরিলক্ষিত হয় কাতন্ত্র সম্প্রদায়ে।

কাতন্ত্র ব‍্যাকরণের মূল‍্যায়ন:-

এইভাবে আলোচনা করলে দেখা যাবে যে, কাতন্ত্রব্যাকরণের ওপর বহু টিকা, -টীপ্পনী,পঞ্জি ও জাতীয় ব্যাখ্যা গ্রন্থ রচিত হয়েছে।  এগুলি এই সম্প্রদায়ের জনপ্রিয়তা ও ব্যাপক চর্চারও প্রমাণ বহন করে। তাই বলা চলে যে, শুধু জনপ্রিয়তার দিক দিয়েই নয়,  টীকাটিপ্পনী দিক দিয়ে বিচার করল পাণিনী সম্প্রদায়ের পরেই কাতন্ত্র সম্প্রদায়ের স্থান।  ব্যাকরণের সম্পূর্ণতা সাধনের জন্য এই সম্প্রদায়েও গণপাঠ, উনাদিপাঠ, লিঙ্গানুশাসন প্রভৃতি বিষয়ে গ্রন্থাদি রচিত হয়েছে। অতএব সব মিলিয়ে বিচার করলে অবশ্যই স্বীকার করতে হয় যে, অপাণিনীয় ব্যাকরণ সম্প্রদায় গুলির মধ্যে কাতন্ত্রসম্প্রদায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রদায়।

কলাপ নামকরণের কারন:-

ব্যাকরণটির কলাপ নামের উৎস নিয়ে দৌর্গ সম্প্রদায়ে একটি কথা প্রচলিত আছে। তাদের মতে, মহাদেব শংকরের নির্দেশে ষড়ানন কুমার কার্তিক তাঁর নিজের বাহন শিখীর বা ময়ূরের পুচ্ছে এই ব‍্যাকরণ লিখেছিলেন। তাই এর নাম কলাপ। প্রসঙ্গত বলা যায় যে, ময়ূরের পুচ্ছের নামান্তর হল কলাপ।

Leave a Comment