জাতকমালা: অবিষহ‍্য শ্রেষ্ঠিজাতকম্ এই উপাখ‍্যানের সারবস্তু বর্ণনা করে দানসম্পর্কে আলোচনা

অবিষহ‍্য শ্রেষ্ঠিজাতকম্ এই উপাখ‍্যানের সারবস্তু বর্ণনা করে দানসম্পর্কে আলোচনা করা হল । অবিষহ‍্য শব্দের অর্থ কী? অবিষহ‍্য কে ছিলেন? তা আলোচনা করা হয়েছে ।

অবিষহ‍্য শব্দের অর্থ কী? অবিষহ‍্য কে ছিলেন? অবিষহ‍্য শ্রেষ্ঠিজাতকম্ এই উপাখ‍্যানের সারবস্তু বর্ণনা করে দানসম্পর্কে আলোচনা কর – জাতকমালা

আরো পড়ুন জাতকমালা হতে প্রশ্ন উত্তর গুলি –

অবিষহ‍্য শব্দের অর্থ কী?

উ:- ‘অবিষহ‍্য’ শব্দের অর্থ হল অজেয় বা অপরাজেয়।

অবিষহ‍্য কে ছিলেন?

অবিষহ‍্য হলেন বোধিসত্ত্ব।

অবিষহ‍্য শ্রেষ্ঠিজাতকম্ এই উপাখ‍্যানের সারবস্তু বর্ণনা করে দানসম্পর্কে আলোচনা

ভূমিকা:- আর্যশূর রচিত জনপ্রিয় জাতকমালা গ্রন্থে  পারমিতা বা বোধিসত্ত্বের পূর্ণতালাভের উদাহরণ প্রসঙ্গে ৩৪টি পুরাতন জাতকের কাহিনী নতুন কাব‍্যরসে সঞ্জীবিত করে পরিবেশন করা হয়েছে। গ্রন্থটি গদ‍্য ও পদ‍্যে মিশ্র চম্পূকাব‍্যের রীতিতে রচিত।  কালিদাস পূর্বযুগের সংস্কৃতে রচিত বৌদ্ধসাহিত‍্যের দুটি ধারা- পদ‍্য ও গদ‍্য। পদ‍্য সাহিত‍্যের মধ‍্যে প্রধান হল অবদান-গ্রন্থমালা( অবদানশতক, দিব‍্যাবদান ইত‍্যাদি। ) গদ‍্য সাহিত‍্যের মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য হল মহাবস্তু ও ললিতাবিস্তুর।

পালিভাষায় রচিত জাতকের গল্পের অনুসরনে সংস্কৃতে যে ব‍ৌদ্ধ গল্পসাহিত‍্য গড়ে ওঠে, অবদানগ্রন্থমালা তারই অন্তর্গত। বৌদ্ধসাহিত‍্যের  মধ‍্যে জাতকগুলির বিশেষ একটা স্থান আছে। বৌদ্ধ মতে, নানা জন্মে জীবনে বহু বিচিত্র পারমিতা বা পূর্ণতা লাভের অনুষ্ঠানের মধ‍্যদিয়েই বুদ্ধদেব পূর্ণত্ব বা অভিসম্বুদ্ধত্ব লাভ করেন। অভিসম্বুদ্ধ মাত্রেই জাতিস্মর বলে সেই অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী গৌতম বুদ্ধ শিষ‍্যদের ধর্মোপদেশ দেবার সময়ে তাঁর অতীত জীবনের নানা কাহিনী বলতেন, এই কাহিনী গুলিই জাতককাহিনী নামে পরিচিত এবং বৌদ্ধধর্মশাস্ত্রের নব অঙ্গের এক অঙ্গরূপে এবং সূত্তপিটকের খুদ্দনিকায়ের একটা শাখারূপে পরিগণিত হয়েছে।

গল্পের মাধ‍্যমে জনসাধারনকে মানবজীবন, সমাজ ও আচরনবিধি শিক্ষা দেবার উদ্দেশ‍্যেই জাতকগুলি রচিত হয়েছে। জাতকের মূল বস্তু হল গল্প, তারপর ধর্মোপদেশের স্থান। জাতক কাহিনীগুলির মাধ‍্যমে বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়। বুদ্ধদেবের উপাদেশবলীর মধ‍্যে আমাদের মনে সর্বাপেক্ষা বেশি প্রাধান‍‍্য পায় বুদ্ধের মৈত্রী ভাবনার বাণী। অবিষহ‍্যশ্রেষ্ঠি জাতকে দাতার ও দানের প্রশংসা করা হয়েছে। প্রসন্নচিত্তে দান করলে দাতার মনে যে সন্তোষ প্রাপ্তি ঘটে, তা এখানে বর্ণিত হয়েছে।

অবিষহ‍্যশ্রেষ্ঠিজাতকের কাহিনী ও দান সম্পর্কে বর্ণনা

ধার্মিক ব‍্যাক্তিরা অতি ধনসম্পদের মধ‍্যে থেকে যেমন দানশীল হন, ভাগ্য বিপর্যয়ের কালেও তাঁরা দান ধর্ম থেকে থেকে নিজেদের সরিয়ে আনেন না-” ন বিভবক্ষয়াবেক্ষয়া সমৃদ্ধ‍্যাশয়া বা প্রদানবৈধুর্যমুপয়ন্তি সৎপুরুষাঃ।” একসময় বোধিসত্ত্ব এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে বণিক সম্প্রদায়ের প্রধানরূপে অতিমাত্রায় দানশীল ছিলেন। তাঁর এই দানশীলতা চিত্তকে এমন ভাবে আপ্লুত করে রেখেছিল যে, তাঁর চিত্তে হিংসা- লোভ আদি দোষের কোন স্থান ছিল না। মাৎসর্যাদি দোষের দ্বারা অবিষহ‍্য থাকার জন‍্য তিনি অবিষহ‍্য নামে বিখ‍্যাত ছিলেন। একবার ইন্দ্র তাঁর দানশীলতার দৃঢ়তা পরীক্ষা করার জন্য দান সামগ্রী ধীরে ধীরে অন্তর্হিত করতে থাকেন। কিন্তু দানসামগ্রী ক্ষীন হলেও তিনি একই ভাবে দানকার্য চালিয়ে যেতে থাকেন।

তখন অত্যন্ত বিষয়ে একদিন রাত্রে ইন্দ্র কিছু রজ্জু এবং একটি কাস্তে ব্যতিত তাঁর সব কিছু অদৃশ্য করে দিলেন। বোধিসত্ত্ব সকালে সবকিছু শূণ্য দেখে ভাবলেন যে, কোনো যাচক যাঞ্চা করতে অভ্যস্ত না থাকায় সে এই ভাবে তার প্রার্থিত বস্তু নিয়ে গেছে। যাই হোক তিনি তখন দানক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার জন্য সেই কাস্তে ও রজ্জু নিয়ে ঘাস কেটে তা বিক্রয় করে যৎসামান্য বিক্রয় উপলব্ধ অর্থে দানকার্য করতে থাকেন। ইন্দ্র অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বোধিসত্ত্বের নিকটে উপস্থিত হয়ে, দানকার্যে বিরত হবার জন্য নানাভাবে তাকে নিরুৎসাহ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বোধিসত্ত্ব প্রদান অভ্যাসের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে ইন্দ্রকে বলেন যে, যাচকদের কষ্ট দূর করতে যদি না সক্ষম হন, তবে কৃপনদের মতো সেই অর্থে তার কোন প্রয়োজন নেই। অতঃপর ইন্দ্র বোধিসত্ত্বের দানশীলতার প্রতি নিষ্ঠা দেখে সবকিছু তাকে ফিরিয়ে দিলেন এবং প্রসন্নচিত্তে তাকে বললেন- তুমি দান বৃষ্টি দ্বারা যাচকদের সন্তোষ বিধান করো। তাঁর অনুগ্রহে কোনদিন বোধিসত্ত্বের ধনসম্পদ ক্ষীন হবে না। এই বলে তিনি অন্তর্ধান করলেন-” যতঃ প্রসানৈরভিবর্ষ যাচকান্ হৃদান মহামেঘ ইবাভিপূরয়ন্।”

“ধনক্ষয়ং নাপ্স‍্যসি মৎপরিগ্রহাদিদং ক্ষমেথাশ্চ বিচেষ্টিতং মম।।”

” ইত‍্যেনমভিসংরাধ‍্য শক্রস্তচ্চাস‍্য বিভবসারমুপসংহৃত‍্য ক্ষময়িত্বা চ তত্রৈবান্তর্দধে।।”

অবিষহ‍্যশ্রেষ্ঠিজাতকম্ উপাখ‍্যানের মূল‍্যায়ন

‘অবিষহ‍্যশ্রেষ্টিজাতক’ গল্পের কাহিনী ও দান সম্পর্কে যে বর্ণনা পাওয়া যায় এই গল্পে তা থেকে বোঝা যায় যে, ধার্মিক ব‍্যাক্তিরা ভাগ‍্যবিপর্যয়ে কিংবা অতি ধনসম্পদের মধ‍্যে থেকেও তারা কখনই দানব্রত থেকে বিরত হননা। অথবা সৎপুরুষেরা ধনক্ষয়ের আশঙ্কায় অথবা সমৃদ্ধির আশায় কখনই দানক্রিয়া থেকে বিরত হন না-

তদৈবং বিভবক্ষয়াবেক্ষয়া সমৃদ্ধ‍্যাশয়া বা প্রদানবৈধুর্যমুপযান্তি সৎপুরুষা ইতি।”

Leave a Comment