যাজ্ঞবল্ক‍্যসংহিতা: চতুষ্পাদ ব‍্যবহার

যাজ্ঞবল্ক‍্যের যাজ্ঞবল্ক‍্যসংহিতা গ্রন্থের অনুসরন করে চতুষ্পাদ ব‍্যবহারের উপর একটি নিবন্ধ রচনা কর।

যাজ্ঞবল্ক‍্যসংহিতা অনুসরন করে চতুষ্পাদ ব‍্যবহারের উপর একটি নিবন্ধ রচনা কর

উ:- আচার্য যাজ্ঞবল্ক‍্য রচিত যাজ্ঞবল্ক‍্যসংহিতা গ্রন্থটি প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রের মধ‍্যে অন‍্যতম। এটি একটি প্রামাণ‍্য গ্রন্থ হিসাবে আজও স্বীকৃত। গ্রন্থটির ব‍্যবহারাধ‍্যায়ে চতুষ্পাদ ব‍্যবহার সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।

চতুষ্পাদ ব‍্যবহার

আধুনিক যুগে ব‍্যবহার শব্দটি আমাদের পারস্পরিক আচরন বোঝাতে ব‍্যবহৃ হয়। কিন্তু স্মৃতিশাস্ত্রে ব‍্যবহার শব্দটি পারিভাষিক অর্থে ব‍্যবহৃত। যাজ্ঞবল্ক‍্যসংহিতার ব‍্যবহারাধ‍্যায়ে ব‍্যবহার শব্দটি আইন প্রয়োগ পদ্ধতি বা Judicial procedure অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। বি-অব-হৃ ধাতুর উত্তর করণবাচ‍্যে ঘঞ্ প্রত‍্যয় করে ব‍্যবহার শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে। মহর্ষি কাত‍্যায়ন ব‍্যবহারের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন-

“বি-নানার্থে অব-সন্দেহে হরণং হার উচ‍্যতে।
নানা সন্দেহ হরণাৎ ব‍্যবহার ইতি স্মৃতঃ।।”

বি এই উপসর্গটি নানা অর্থে অব উপসর্গটি সন্দেহ অর্থে এবং হার শব্দটি হরণ করা অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ কোনো বিষয়ে সন্দেহ উপস্থিত হলে যে উপায়ে সন্দেহের নিরসন বা বিনাশ হয়, তাকে বলে ব‍্যবহার। যেমন- একজন বলল ক্ষেত্রটি আমার,অপর একজন বলল ক্ষেত্রটি আমার আপনার নয়। এখানে একটি ক্ষেত্র নিয়ে দুজনের মধ‍্যে বিবাদ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটির নিষ্পত্তি হবে যে উপায়ে তাই হল ব‍্যবহার। এই ব‍্যবহার বা বিচার করবেন রাজা। তাই নারদস্মৃতি তে বলা হয়েছে-

‘দ্রষ্টা চ ব‍্যবহারানাৎ রাজা দণ্ডধরঃ স্মৃতঃ।’

যাজ্ঞবল্ক‍্যের মতে, রাজা ক্রোধ ও লোভ বর্জন করে ধর্মশাস্ত্র অনুসারে নানা শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণগণের সহিত ব‍্যবহার দর্শন করবেন-

“ব‍্যবহারান্নৃপঃ পশ‍্যেদ্ বিদ্বদ্ভিঃ ব্রাহ্মণৈঃ সহ।
ধর্মশাস্ত্রানুসারেণ ক্রোধলোভবিবর্জিতঃ।।”

আচার্য বিজ্ঞানের মিতাক্ষরা টীকায় ব‍্যবহার শব্দের ব‍্যুৎপত্তিগত অর্থ গ্রহণ না করে পারিভাষিক অর্থ স্বীকার করে বলেছেন-

“অন‍্যবিরোধেন স্বাত্মসম্বন্ধিতয়া কথনং ব‍্যবহারঃ। যথা কশ্চিদ্ ইয়ং ক্ষেত্রং মদীয়মিতি কথয়তি, অন‍্যোঅপিতদ্ বিরোধেন মদীয়মিতি।”

এই ব‍্যবহারের বিষয় অনেক প্রকার হতে পারে। যেমন- দায়, অধিকার, স্ত্রীধন, স্তেয়, সাহস, উপনিধি, আধি, দণ্ডপারুষ‍্য, বাকপারুষ‍্য ইত‍্যাদি। প্রমাণাদির দ্বারা লেখ‍্যপত্রে লিখিত সাধ‍্য বিষয়ই প্রমাণিত হলে বাদী (অর্থী) জয়লাভ করে। অন‍্যথায় সে পরাজয় বরন করে।

‘ তৎ সিদ্ধৌ সিদ্ধিমাপ্নোতি বিপরীতমতোঅন‍্যথা।’

চতুষ্পাদ ব‍্যবহারের অঙ্গ বা পাদ

এই ব‍্যবহারের চারটি অঙ্গ বা পাদ দেখা যায়। এগুলি হল-

  • i) ভাষাপাদ,
  • ii) উত্তরপাদ
  • iii) ক্রিয়াপাদ
  • iv) সাধ‍্যসিদ্ধিপাদ।

i) ভাষাপাদ:-

কোন ব্যক্তি যদি ধর্ম শাস্ত্র লোক প্রচলিত নিয়ম আচার প্রভৃতি বিরুদ্ধ পথে অপরের দ্বারা নিপীড়িত হয়ে উক্ত পীড়ন বিষয়ে রাজসভায় আবেদন জানায় তাহলে তাহলে তা ব্যবহারের বিষয় হয়-

“স্মৃত‍্যাচার ব‍্যপেতেন মার্গেনাধর্ষিতঃ পরৈঃ।
আবেদয়তি চেদ্রাজ্ঞে ব‍্যবহার পদং হি তৎ।।”

আবেদনটি আক্রান্ত ব‍্যাক্তি নিজে এসে রাজাকে জানাবে। অন‍্য কোনো ব‍্যক্তির মাধ‍্যমে জানালে চলবে না। যে প্রথমে আবেদন করে বিচার প্রার্থনা করে সে হল অর্থী। অর্থীর আবেদনটি যুক্তিযুক্ত হলে মুদ্রাদির দ্বারা প্রত‍্যর্থীকে আহ্বান করা হবে। প্রত‍্যর্থী পীড়িত হলে তাকে তখনই আনা হবে না। প্রত‍্যর্থীর সম্মুখে অর্থী পূর্বে যা যা বলেছে তা হুবুহু লিখিত হবে। লেখার সময় কোনো কথা পরিবর্তন করা যাবে না। লেখার সময়, বৎসর, মাস, পক্ষ, দিন, অর্থীর নাম, প্রত‍্যর্থীর নাম, জাতি, স্থান প্রভৃতির সুস্পষ্ট উল্লেখ করতে হবে। এটাই হল ব‍্যবহারের প্রথম পাদ, ভাষাপাদ –

“প্রত‍্যর্থীনোঅগ্রতো লেখ‍্যং যথাবেদিতমর্থিনা।
সমামাসতদর্ধাহর্ণামজাত‍্যাদিচিহ্নিতম্।।”

ii) উত্তরপাদ:-

ব‍্যবহারের দ্বিতীয় পাদের নাম হল উত্তরপাদ। এখানে অর্থীর বক্তব‍্য শুনে প্রত‍্যর্থী তার উত্তর লেখাবে। উত্তরটি অর্থীর সামনেই লেখা হবে এবং তাতে প্রত‍্যর্থী আত্মপক্ষ সমর্থন করে অর্থীর অভিযোগ খন্ডন করবে-

” শ্রুতার্থস‍্যোত্তরং লেখ‍্যং পূর্বাবেদকসন্নিধৌ।”

উত্তর হবে অর্থের অভিযোগ দূরীকরণে সমর্থ, সারগর্ভ, ন্যায্য ভাষণযুক্ত,সন্দেহরহিত, পূর্বাপর, সামঞ্জস্য যুক্ত এবং ব্যাখ্যা বিনাই সহজবোধ‍্য-

“পক্ষস‍্য ব‍্যাপকং সারম্ অসন্দিগ্ধমনাকুলম্।
অব‍্যাখ‍্যাগমমিত‍্যুত্তরং তদ্ বিদো বিদুঃ।।”

এই উত্তরপাদ চার প্রকার।যথা সম্প্রতিপত্তি, মিথ‍্যা, প্রত‍্যবস্কন্দন এবং পূর্বন‍্যায়।

a) সম্প্রতিপত্তি:-

সম্প্রত্তিপত্তি কথার অর্থ হল সত‍্যবচন বা স‍ত‍্য উত্তর। অর্থী যদি অভিযোগ করে, এই ব‍্যাক্তি একশত টাকা ধার নিয়েছে এবং প্রত‍্যর্থী যদি তা স্বীকার করে নেয় তাহলে উত্তর হবে সম্প্রতিপত্তি উত্তর।

b) মিথ‍্যা:-

উক্ত উদাহরণে প্রত‍্যর্থী যদি বলে- না ধার নিইনি- তাহলে উত্তরটি হবে মিথ‍্যা উত্তর। এখানে মিথ‍্যা শব্দটি পারিভাষিক, কারণ প্রত‍্যর্থীর উত্তরটি সত‍্য বা মিথ‍্যা কিনা তা বিচারের মাধ‍্যমেই জানা যাবে।

c) প্রত‍্যবস্কন্দন:-

পূর্বোক্ত উদাহরনে প্রত‍্যর্থী যদি বলে ধার নিলেও সেই অর্থে সে ফেরত দিয়েছে অথবা অর্থ নিলেও তা দানরূপে গ্রহণ করেছে ধাররূপে নয়- তাহলে উত্তরটিকে বলা হবে প্রত‍্যবস্কন্দন।

d) পূর্বন‍্যায়:-

পূর্বোক্ত উদাহরনে প্রত‍্যর্থী যথি বলে এ ব‍‍্যাপারে আমি পূর্বে অভিযুক্ত হয়েছিলাম এবং অর্থীকে ব‍্যবহারের দ্বারা পরাজিত করেছি তাহলে উত্তরটি হবে পূর্বন‍্যায় উত্তর।

iii) ক্রিয়াপাদ:-

ব‍্যবহারের তৃতীয় পাদের নাম ক্রিয়াপাদ। প্রত‍্যর্থীর উত্তর লেখার পর অর্থীর কর্তব‍্য নিজ অভিযোগের স্বপক্ষে প্রমাণ দাখিল করা। উত্তরদানের সঙ্গে সঙ্গেই প্রমাণ প্রদর্শন করা উচিত। তাই যাজ্ঞবল্ক‍্য বলেছেন-

“ততোঅর্থী লেখয়েৎ সদ‍্যঃ প্রতিজ্ঞাতার্থসাধনম্।”

সম্প্রতিপত্তি উত্তরে সাধ‍্যের সাধন প্রদর্শনের কোনো অবসর নেই।সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় পাদেই ব‍্যবহার সমাপ্ত হয়ে য‍ায়। মিথ‍্যা উত্তরে অর্থীকে প্রমাণ দেখাতে হয়। প্রত‍্যবস্কন্দন ও পূর্বন‍্যায়ে প্রত‍্যর্থীকে প্রমাণ দেখাতে হয়। এই উভয়ক্ষেত্রে প্রত‍্যর্থী অর্থীর পদারূঢ় হয়ে থাকে।

iv) সাধ‍্যসিদ্ধিপাদ:-

ব‍্যবহারের চতুর্থ পাদ হল সাধ‍্যসিদ্ধিপাদ। প্রমানাদির দ্বারা স্বসভ‍্য প্রাডবিবাকের সম্মুখে অর্থী যে অভিযোগ করেছিল তা সত‍্য বলে প্রমাণিত হলে অর্থী জয়লাভ করে আর অর্থী প্রমাণ দেখাতে না পারলে তার পরাজয় হয় এবং প্রত‍্যর্থী জয়লাভ করে। তাই বলা হয়েছে-

” তৎসিদ্ধৌ সিদ্ধিমাপ্নোতি বিপরীতমত‍্যোঅন‍্যথা।
চতুষ্পাদ্ ব‍্যবহারোঅয়ং বিবাদেষু প্রদর্শিতঃ।।”

ভাষাপাদ, উত্তরপাদ,ক্রিয়াপাদ ও সাধ‍্যসিদ্ধিপাদ – এই চারটি পাদ ক্রমানুসারে অবলম্বন করে বিবাদের নিষ্পত্তি হয় বলে ব‍্যবহারকে চতুষ্পাদ বলা হয়ে থাকে।

তবে আচার্য নারদ তার নারদস্মৃতি গ্রন্থের ব্যবহারের চতুষ্পাদকে অন্যভাবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে ধর্ম, ব্যবহার, চরিত্র ও রাজ্যশাসন এই চারটি হল ব্যবহারের অংশ-

“ধর্মশ্চ ব‍্যবহারশ্চ চরিত্রং রাজ‍্যশাসনম্।
চতুষ্পাদ্ ব‍্যবহারোঅয়মুত্তরঃ পূর্ববাধকঃ।।”

আচার্য বৃহস্পতি, কৌটিল্য প্রমুখরাও একই কথা বলেছেন। নারদের মতে ব্যবহার কেবল চতুষ্পাদ নয় তা চতুঃসাধন, চতুর্হিত, চতুঃস্থান, চতুর্ব‍্যাপী ও চতুষ্কারী।

রাজার ব্যবহার দর্শন প্রসঙ্গে যাজ্ঞবল্ক‍্য বলেছেন -যদি অন্য কাজে রাজা ব্যস্ত থাকেন এবং তার ফলে স্বয়ং নিজে ব্যবহার দর্শন করতে না পারেন তাহলে ওই রাজা সভাসদগনের সঙ্গে একজন সর্বধর্মজ্ঞ ও সর্বশাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণকে উক্ত কার্যে নিযুক্ত করবেন-

‘সভ‍্যৈঃ সহ নিযোক্তব‍্যো ব্রাহ্মণঃ সর্বধর্মবিদ্।’

যদি সভ্যগন লোভ, ভয় বা অতিরিক্ত স্নেহবশত স্মৃতি শাস্ত্র বিরুদ্ধ আচরণ করেন তাহলে রাজা বিচার বিষয়ে তাদের প্রত্যেককে বিবাদ বিষয়ীভূত অর্থ অপেক্ষা দ্বিগুণ দণ্ড দান করবেন-

‘সভ‍্যাঃ পৃথক্ পৃথক্ দণ্ড‍্যা বিবাদদ্ দ্বিগুনং দমম্।’

এই ভাবেই যাজ্ঞবল্ক‍্য ব‍্যবহার এবং ব‍্যবহারের চতুষ্পাদ সম্বন্ধে আলচনা করেছেন।

Leave a Comment