স্বপ্নবাসবদত্তম্: উদয়নের চরিত্র

স্বপ্নবাসবদত্তম্ নাটক হতে উদয়নের চরিত্র বিশ্লেষণ কর।

উদয়নের চরিত্র বিশ্লেষণ – স্বপ্নবাসবদত্তম্ নাটক

উ:- পাঠক চিত্তবলভীর পৌঢ় পারাবত রসিককুলের মানস সরোবরের মুগ্ধমরাল মহাকবি ভাসের সর্বোত্তমা সৃষ্টি ষষ্ঠ অংক সমন্বিত স্বপ্নবাসবদত্তম্ নাটকটি বিশ্বসাহিত‍্যের দরবারে এক মহার্ঘ রত্ন। চরিত্র সৃষ্টিতে মহাকবি ভাস এক অদ্ভূত কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর লেখনী স্পর্শে নাটকের প্রত‍্যেকটি চরিত্র জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তার মধ‍্যে অন‍্যতম প্রধান পুরুষ চরিত্র হল উদয়ন।

সংস্কৃত নাট‍্যশাস্ত্রে নায়কের গুণাবলী

সংস্কৃত নাট‍্যশাস্ত্রে নায়কের গুণাবলী নির্দেশ করে বলা হয়েছে-

” নেতা বিনীতো মধুরস্ত‍্যাগী দক্ষঃ প্রিয়ংবদঃ।
রক্তলোকঃ শুচির্বাগ্মী রূঢ়বংশঃ স্থিরো যুবা।।”

অর্থাৎ নাটকের নায়ক হবেন বিনয়গুণসম্পন্ন, মধুরস্বভাব, দানশীল, কর্মদক্ষ, প্রিয়ভাষী, লোকরঞ্জক, বিশুদ্ধস্বভাব, বাক‍্যানিপুন, প্রথিতবংশোদ্ভব ও ধর্য সম্পন্ন যুবাপুরুষ। বিভিন্ন গুনের তারতম‍্য অনুসারে নায়ক ধীরোদাত্ত, ধীরললিত, ধীরশান্ত এবং ধীরোদ্ধত এই চারপ্রকার হতে পারেন। বৎসরাজ‍্যের প্রখ‍্যাত রাজা উদয়ন একজন ধীরোদাত্ত শ্রেনীর নায়ক।

এর লক্ষণ প্রসঙ্গে সাহিত‍্যদর্পনকার বিশ্বনাথ বলেছেন-

” অবিকত্থনঃ ক্ষমাবানতিগম্ভীরো মহাসত্ত্বঃ।
স্থেয়ান্ নিগূঢ়মানো ধীরোদাত্তো দৃঢ়ব্রতঃ কথিতঃ।।”

রাজা উদয়নের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাবো তিনি একজন যথার্থ নায়ক।

স্বপ্নবাসবদত্তম্ নাটকের শুরুতেই লাবাণক থেকে মগধরাজ‍্যের উপান্তে অবস্থিত আশ্রমে আগত ব্রহ্মচারীর মুখ থেকে আমরা জানতে পারি যে, বৎসরাজ যখন লাবাণক ছেড়ে চলে এলেন-

“ততো নিষ্ক্রান্তে রাজনি প্রোষিতনক্ষত্রচন্দ্রামিব নভোঅরমণীয়ঃ সংবৃত্তঃ স গ্রামঃ।”

অর্থাৎ রাজা চলে গেলে চন্দ্র নক্ষত্রহীন আকাশের মতো সে গ্রাম শ্রীহীন হয়ে পড়ল। প্রজাগণ তার গুণে মুগ্ধ- ‘ভবদগুণবতাঃ পৌরাঃ।’ আগন্তুক ব্রহ্মচারীর সপ্রশংস এ উক্তি থেকে অনুমান করা যায় যে রাজা উদয়নের জনপ্রিয়তা কতখানি ছিল।

আদর্শ প্রেমিকের সকল গুনেই তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তার চরিত্রের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো বাসবদত্তার প্রতি তাঁর নিবিড় ও প্রগাঢ় অনুরাগ, যা সমগ্র নাটকের শুরু থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত সঞ্চারিত হয়েছে। উজ্জয়িনীরাজ প্রদ‍্যোত মহাসেনের কন্যা বাসবদত্তা বৎসরাজ উদয়নের কেবল প্রিয়তমা মহর্ষি ছিলেন না, তিনি ছিলেন-

“গৃহিনী সচিবঃ সখী মিথঃ প্রিয়শিষ‍্যা ললিতে কলাবিধৌ।।”

(রঘুবংশ) অপরদিকে মৃগয়া থেকে ফিরে এসে যখন রাজা উদয়ন জানতে পারলেন যে তাঁর প্রিয়তমা পত্নী বাসবদত্তা অগ্নিতে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন, তখন তিনি সেই অগ্নিতে প্রাণ বিসর্জন দিতে উদ‍্যত হলে অমাত‍্য রুমন্বান তাঁকে বহু কষ্টে নিবারণ করেন-

“তদ্বৃত্তান্তং শ্রুত্বা তয়োর্বিয়োগজনিতসন্তাপস্তস্মিন্ এব অগ্নৌ প্রাণান্ পরিত‍্যক্তুকামঃ অমাতৈঃ মহতা যত্নেন বারিতঃ।”

রাজা হয়েও তিনি পত্নী বাসদত্তার শোকে বিহ্বল হয়ে নিতান্ত সাধারণ মানুষের মতো ভূতলে লুন্ঠিত হয়ে ধূলি ধূসরিত দেহে অজস্র অশ্রুমোচন করেছেন। অবিরাম করুণ বিলাপ করেছেন-

” হা বাসবদত্তে! হা অবন্তিরাজপুত্রি! হা প্রিয়ে! হা প্রিয়শিষ‍্যে। ইতি কিমপি কিমপি বহু প্রলপিতবান্।”

বাসবদত্তার প্রতি রাজার প্রণয়াতিশয্যের প্রশংসা করে ব্রহ্মচারী বলেছেন – ভর্ত্তা যাকে এইরূপ প্রিয়তমা মনে করেন সে স্ত্রীই ধন্যা। পতিপ্রেম হেতু বাসবদত্তা দগ্ধ হয়েও অদগ্ধার মতো পতিত হন-

“ধন‍্যা সা স্ত্রী যাং তথা বেত্তি ভর্তা
ভর্তুস্নেহাৎ সা হি দগ্ধাপ‍্যদগ্ধা।।”

রাজ্যরক্ষার জন্য বৎসরাজ পুনরায় মগধ রাজ দর্শকের ভগিনী পদ্মাবতীকে বিবাহ করা সত্ত্বেও বাসবদত্তার প্রতি তার প্রণয় আগের মতই গভীর ও নিবিড় ছিল।”কা ভবতঃ প্রিয়া-তদানীং তত্রভবতী বাসবদত্তা ইদানীং পদ্মাবতী বা?” বয়স‍্য বসন্তকের এ প্রশ্নের উত্তরে রাজা উদয়ন বলেছিলেন-

” পদ্মাবতী বহুমতা মম যদ‍্যপি রূপশীলমাধুযৈঃ।
বাসবদত্তাবদ্ধং ন তু তাবন্মে মনো হরতি।।”

অর্থাৎ সৌন্দর্য, স্বভাব ও মাধুর্যে পদ্মাবতী আমার কাছে অত্যন্ত আদরনীয়া হলেও সে বাসবদত্তার প্রতি আবদ্ধ আমার চিত্তকে হরণ করতে পারেনি।

রাজা উদয়ন যেভাবে বাসবদত্তার জন্য শোক প্রকাশ করেছেন তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। যখনই তিনি বাসদত্তার সম্পর্কে কিছু বলতে চেয়েছেন তখনই তার নয়ন দুটি অশ্রু সজল হয়ে এসেছে। রাজা উদয়ন বিদূষক বসন্তককে বলেন-

“দুঃখং ত‍্যক্তং বদ্ধমূলোঅনুরাগঃ
স্মৃত্বা স্মৃত্বা যাতি দুঃখং নবত্বম্।
যাত্রা ত্বেষা যদ্ বিমুচ‍্যেহ বাষ্পম্
প্রাপ্তানৃণ‍্যা যাতি বুদ্ধিং প্রসাদম্।।”

অর্থাৎ সুদৃঢ় অনুরাগ ত্যাগ করা অত্যন্ত কষ্টকর। পুনঃ পুনঃ স্মরণ করলে দুঃখ নবীভূত হয়, মানব জীবনে এইটি স্বাভাবিক গতি যে, বুদ্ধি অশ্রুপাতে নিজ ঋণ পরিশোধ করে নির্মল হয়।

অপরদিকে পঞ্চম অঙ্কে স্বপ্নে দেখা বাসবদত্তার সঙ্গে কথোপকথনের পর তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন বাসবদত্তা জীবিত আছেন। সম্পূর্ণ বিষয়টি বিদূষক অলিক ও অবান্তর বলে মন্তব্য করায় উদয়ন বলেছেন-

” যদি তাবদয়ং স্বপ্নো ধন‍্যম্ প্রতিবোধনম্। অথায়ং বিভ্রমো বা স‍্যাদ্ বিভ্রমো হ‍্যস্ত্তুমে চিরম্।।”

অর্থাৎ যদি এইটি স্বপ্ন হয়, তাহলে আমার না জাগায় মঙ্গল। আর যদি এইটি ভ্রম হয়, তাহলে সে ভ্রম যেন চিরকাল থাকে। কেননা, উভয় ক্ষেত্রেই বাসবদত্তার সঙ্গে মিলনের অবকাশ থাকবে। বাসবদত্তার চরম উৎকর্ষ এখানেই প্রকাশিত হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, স্বপ্নবাসবদত্তম্ নাটকে সর্বগুণসম্পন্ন নায়ক রাজা উদয়ন। নাট্যগুরু ভরত নায়কের যে সমস্ত গুণ লিপিবদ্ধ করেছেন তার সব কটি গুণেই উদয়নের চরিত্রে পরিলক্ষিত হয়। এই প্রসঙ্গে ভরতমুনি বলেছেন-

“শীলাবান্ বুদ্ধিসম্পন্নঃ সত‍্যবাদী জিতেন্দ্রিয়ঃ দক্ষঃ প্রগলভঃ স্মৃতিবান্ বিক্রান্তঃ ধৃতিমান্ শুচিঃ।।”

অর্থাৎ যে নায়ক আত্মশ্লাঘা করেন না, হর্ষশোকাদিতে অভিভূত না হয়ে বিনয় দ্বারা গর্বকে পছন্দ রাখেন ও অঙ্গীকার পালন করেন, তিনিই ধীরোদাত্ত রাজা, নায়ক উদয়নের চরিত্রে এই সকল গুন গুলোই প্রস্ফুটিত হয়েছে।

Leave a Comment