মহাভারতের রচনাকাল

মহাভারতের রচনাকাল সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

মহাভারতের রচনাকাল সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত বিবরণ

উ:- মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব‍্যাস রচিত মহাগ্রন্থ মহাভারত কেবল ইতিহাস পুরাণ নয়,  ভারতবর্ষে রামায়ণের মতো মহাভারতও একটি কালজয়ী মহাকাব্য। এর নামকরণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- ‘মহত্বাত্ ভারবত্বাচ্চ মহাভারত মুচ‍্যতে।’ মহত্ব এবং বিশালতার কারণে এর নাম মহাভারত। রামায়ণের মতো মহাভারতেও নির্দিষ্টকাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। প্রাচীন মতানুসারে, মহাভারত এক সময়ে ২৪ হাজার শ্লোকে নিবন্ধ ছিল-

“উপাখ‍্যানেঃ সহজ্ঞেয়মাদ‍্যং ভারতমু।
চতুর্বিংশতি সাহস্ত্রীং চক্রে ভারতসংহিতাম্।।”

           এবং শেষ স্তরে এর শ্লোক সংখ্যা দাঁড়ায় এক লক্ষে-

“একশত সহস্রস্তু মানুষেষু প্রতিষ্ঠিতম্।।”

           এর থেকে বোঝা যায় যে মহাভারত কালে কালে বিভিন্ন লেখকের হাতে ক্রমশ পরিবর্তিত হয়েছে।

মহাভারতের রচনাকাল সম্বন্ধে তিনটি স্তর বা পর্যায় নির্ণয়

ম্যাকডোনাল, ওয়েবার, অধ্যাপক ভিন্টারনিৎস গবেষণা করে মহাভারতের তিনটি স্তর বা পর্যায় নির্ণয় করেছেন। এই তিনটি স্তর হল-

  • i) জয় বা সৌত রচনা।
  • ii) ভারত বা ব্রাহ্মণ‍্যগণের রচনা
  • iii) মহাভারত বা শ্রমণগণের রচনা।

i) প্রথম স্তর বা সৌত রচনা:-

মহাভারতের মূল  অংশ কোন্ সুদূর অতীতে রচিত হয়েছিল তা নির্নয় করা কষ্টসাধ‍্য। এই পর্যায়ে কেবল কুরু পান্ডবদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী রাজাদের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ বিগ্রহের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এই স্তরের শ্লোক সংখ্যা ৪৪০০, তাই মহাভারতের আদি পর্বে বলা হয়েছে-

“অষ্টৌ শ্লোক সহস্রানি অষ্টৌ শ্লোকশতানি চ।”

কুরু পান্ডবদের যুদ্ধ মহাভারতের মূল ঐতিহাসিক ঘটনা হওয়ায় এর থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যেতে পারে যে,  আনুমানিক ৭০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহাভারত রচিত হয়েছিল।

ii) দ্বিতীয় স্তর বা ব্রাহ্মণ্য গণের রচনা:- 

এই স্তর থেকে মহাভারতের কলেবর বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেবগনের কাহিনী, সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের নানা গল্প, রাজনীতি,
ধর্মনীতি বিষয়ক আখ‍্যান, উপাখ্যান, নলদময়ন্তি,সমুদ্র মন্থনের উপাখ্যান প্রভৃতি। এখানে কৃষ্ণকে বিষ্ণুর অবতার রূপে স্বীকার করে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের দেবত্ব ও প্রাধান্য বর্ণিত হয়েছে। এই অবস্থায় শ্লোক সংখ্যা ২৪ হাজার। তাই আদি পর্বে বলা হয়েছে-

“চতুর্বিংশতি সাহস্রীংচক্রে ভারতসংহিতাম্।”

এই সমস্ত কাহিনী থেকে অনমিত হয় যে আনুমানিক ৫০০ থেকে ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহাভারত রচিত হয়েছিল।

iii) তৃতীয় স্তর বা শ্রমনগণের রচনা:-

তৃতীয় স্তরের রচনা ভিক্ষু বা শ্রবণগনের রচনা।এই স্তরে আরও কাহিনী, অনুশাসন ও দার্শনিক তত্ত্ব ছাড়াও অহিংসা, ব্রহ্মচর্য, জাগতিক নশ্বরতা, মোক্ষ ও নীতি ধর্মের উপদেশ প্রভৃতির দ্বারা সমৃদ্ধি হলে মহাভারত ১৮টি পর্বে, এক লক্ষ শ্লোক সমন্বিত হয়েছে বিশাল গ্রন্থে পরিণত হয়েছে। তাই বলা হয়েছে-

” একং শত সহস্রং মানুষেষু প্রতিষ্ঠিতম্।” 

দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরে মহাভারতের প্রক্ষিপ্তাংশ সূচক। উপরিউক্ত আলোচ্য অংশ থেকে অনুমান করা যায় যে, আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের সময় মহাভারত রচিত হয়েছে ।

মহাভারতের রচনাকাল সম্বন্ধে আধুনিক পণ্ডিতদের অভিমত

আধুনিক পণ্ডিতদের মতে,  বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিদের দ্বারা প্রায় এক হাজার বছরে মহাভারত গ্রন্থটি পূর্ণতা পায়। এদের মতে মহাভারতের রচনা আরম্ভ হয় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে এবং এটি বর্তমান আকার লাভ করে খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতাব্দীতে। এদের যুক্তিগুলো হলো নিম্নরূপ-

  • a) ঋকবেদের কিছু সূক্তের সঙ্গে মহাভারতের মৌল উপাদান ভাগের কিছু যোগ আছে। কোন কোন ব্রাহ্মণ গ্রন্থে, শ্রৌতসূত্রে, আশ্বলায়ন গৃহ‍্যসূত্রে, বৌদ্ধায়ন ধর্ম সূত্রে এবং যজুর্বেদের কাঠক সংহিতায় কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্রের নাম উল্লেখিত হয়েছে। মহাভারত মূলরূপ পরিগ্রহ করেছিল।
  • b) ডঃ বুলারের মতে, বৌদ্ধায়ন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে বিদ‍্যমান ছিলেন। সুতরাং বৌদ্ধায়ণ মহাভারতের –
    “পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়াং যো মে ভক্ত‍্যা প্রযচ্ছতি” – শ্লোকটি থাকায় মহাভারতের রচনাকাল তৎপূর্ববর্তী বলে অনুমিত হয়।
  • c) পানিনীর অষ্টাধ্যায়ী-তে পতঞ্জলির মহাভাষ‍্যে মহাভারতের ভীম, যুধিষ্ঠির, বিদুর নাম উল্লেখ দৃষ্ট হয়। আধুনিক পন্ডিতদের মতে পানিনীর রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর পরে নয়। অতএব মহাভারতের রচনার এর পূর্ববর্তী।
  • d) যবন ও বৌদ্ধগণের উল্লেখ থেকে গবেষকরা এও মনে করেন যে, বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারের পর এবং আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের পরও মহাভারত রচনা অব্যাহত ছিল।
  • e) মহাভারতে বিষ্ণুর অবতার প্রসঙ্গে বুদ্ধের নাম না থাকার মূল মহাভারত বৌদ্ধযুগের পূর্বে রচিত হয়েছিল বলে অনুমিত হয়।
  • f) ভাসের নাটকের একটি শ্লোক কৌটিল‍্য খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ  করেছেন। আবার ভাস মহাভারতের কাহিনী নিয়ে ঊরুভঙ্গ, মধ্যমবায়োগ প্রভৃতি নাটক লেখেন। ডিয়োন ক্রিমোস্টোস বলেন ১ লক্ষ শ্লোকের মহাভারত দক্ষিণ ভারতে ৫০ খ্রিস্টাব্দে সুবিদিত ছিল। অশ্বঘোষের ব্রজসূচিতে হরিবংশ থেকে একটি শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন। অতএব মহাভারত খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের পূর্বে রচিত হয়েছিল।
  • g) খ্রিস্টীয় ৭৮৮ অব্দে জাত বৈদান্তিক প্রবর আচার্য শংকর মহাভারতের উল্লেখ করেছেন। তখন যে গীতা মহাভারতের অংশ ছিল তা তাঁর টীকা হতে জানা যায়।  এথেকে অনুমান করা যায় যে, মহাভারত এই শতাব্দীর পূর্বে রচিত।
  • h) খ্রিস্টীয় পঞ্চম ও চতুর্থ শতাব্দীর বহু ভূমিদান ও তাম্রশাসনে এক লক্ষ শ্লোকে মহাভারতের উল্লেখ আছে। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর ও গুপ্তরাজগণের শিলালিপিতে পূর্ণাঙ্গ মহাভারতের উল্লেখ করা যায়।

মহাভারতের রচনাকাল সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত

         লক্ষ্য শ্লোকাত্মক এই মহাভারতের রচনাকাল নির্ণয় বিষয়ে নানা মুনির নানা মত। এই সমস্ত মতের ভিত্তিতে Winternit সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে,  খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব পর্যন্ত সুদীর্ঘকাল ধরে মহাভারতের রচনাকাল চলেছিল। বর্তমানে আমরা যে আকারে মহাভারত পায় তা যে খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতকের পূর্বে পূর্ণতা লাভ করে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই –

  • i) In the 4th century A.D the work already had, on the whole, its present extent, contents, and character.
  • ii) There is no certain testimony for an Epic Mahabharata before the 4th century B.C.
  • iii) An Epic Mahabharata and Bharata did not exist in the Vedic period.

Leave a Comment