অর্থশাস্ত্র: ভূমিচ্ছিদ্রবিধান অধ‍্যায় অবলম্বনে কৃষির অযোগ‍্য ভূমির ব‍্যবহার

অর্থশাস্ত্রের দ্বিতীয় অধিকরণের প্রথম অধ‍্যায় ভূমিচ্ছিদ্রবিধান অধ‍্যায় অবলম্বনে কৃষির অযোগ‍্য ভূমির ব‍্যবহার বর্ণনা কর। এই অধ‍্যায়ে বিশেষভাবে হস্তিবন সম্বন্ধে কৌটিল‍্য কেন আলোচনা করেছেন? উৎকর্ষ অপকর্ষের বিচারে কোন কোন অঞ্চলের হস্তী উল্লেখ হয়েছে? ৬+২+২=১০

Table of Contents

অর্থশাস্ত্রের দ্বিতীয় অধিকরণের প্রথম অধ‍্যায় ভূমিচ্ছিদ্রবিধান অধ‍্যায় অবলম্বনে কৃষির অযোগ‍্য ভূমির ব‍্যবহার বর্ণনা কর। এই অধ‍্যায়ে বিশেষভাবে হস্তিবন সম্বন্ধে কৌটিল‍্য কেন আলোচনা করেছেন? উৎকর্ষ অপকর্ষের বিচারে কোন কোন অঞ্চলের হস্তী উল্লেখ হয়েছে?


ভূমিকা:- অর্থশাস্ত্রের দ্বিতীয় অধিকরণের প্রথম অধ‍্যায় ভূমিচ্ছিদ্রবিধানম্-এ জনপদ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাজ‍্যের যে সমস্ত জমি চাষের অযোগ‍্য, সেই জমিগুলিকেও ব‍্যবহারের কথা কৌটিল‍্য চিন্তা করেছেন। এই অধিকরণের দ্বিতীয় অধ‍্যায়ে ভূমিচ্ছিদ্রবিধানম্ বা কর্ষনের অনুপযোগী জমির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

ভূমিচ্ছিদ্রবিধান অধ‍্যায় অবলম্বনে কৃষির অযোগ‍্য ভূমির ব‍্যবহার

কৃষিকার্যের অনুপযোগী জমি বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্রে ব‍্যবহৃত হত। যেমন-


i) গোচারনভূমিরূপে:-

ঘাস এবং অন‍্যান‍্য পশুখাদ‍্যের চাষ করে তৃণজলাদিযুক্ত গোচারণভূমি গড়ে তোলা হত। অর্থশাস্ত্রে গোচারণভূমি অর্থে বিবীত কথাটি ব‍্যবহৃত হয়েছে। বী ধাতুর অর্থ ভক্ষণ করা।

কৌটিল‍্য বলেছেন-

“অকৃষ‍্যাং ভূমৌ পশুভ‍্যো বিবীতানি প্রযচ্ছেত্।”


ii) অরণ‍্যভূমিরূপে:-

অর্থশাস্ত্রে স্বাভাবিক অরণ‍্যের পাশাপাশি বৃক্ষ রোপনের মাধ‍্যমে বনসৃজনের কথাও জানা যায়। এইসব অরন‍্যময় প্রদেশে ব্রাহ্মণদের ব্রহ্মারণ‍্য এবং সোমারণ‍্য দান করা হত। ব্রহ্মারণ‍্যে বেদ, উপনিষদ,আরণ‍্যকাদির চর্চা হত। সোমারণ‍্য ছিল যাগযজ্ঞাদির অনুষ্ঠানক্ষেত্র। তপস্বীদের জন‍্য তপোবনও এই ধরনের জমিতে অনুষ্ঠানক্ষেত্র। তপস্বীদের জন‍্য তপোবনও এই ধরনের জমিতে নির্মিত হত। ব্রহ্মারণ‍্য, সোমারণ‍্য ইত‍্যাদির আয়তন ছিল এক গোরুত অর্থাৎ প্রায় চার ক্রোশ জমি।

কৌটিল‍্য বলেছেন-

“প্রদিষ্টাভয়-স্থাবর-জঙ্গমানি চ ব্রাহ্মণেভ‍্যা ব্রহ্ম-সোমারণ‍্যানি, তপোবনানি চ তপস্বিভ‍্যো গোরুত -পরানি প্রযচ্ছেত্।”

iii) বিনোদনের ক্ষেত্ররূপে:-

চাষের অযোগ্য জমি রাজার বিনোদনের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হত। রাজার মৃগয়া করার জন্য এক গোরুর পরিমাণ জমিতে মৃগবন স্থাপন করা হত। এখানে প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য একটিমাত্র প্রবেশপথ থাকতো। কৌটিল‍্য এখানে একটি মাত্র প্রবেশপথের কথা বলেছেন কেন? কারণ অন্য কোনো শত্রু প্রবেশ করে যাতে রাজার ক্ষতি করতে না পারে সেই কারণে কৌটিল্য এই উপায় স্থির করেছেন। রাজার সুরক্ষার জন্য মৃগবন পরিখার সাহায্যে বেষ্টিত থাকত এবং হিংস্র জন্তু থাকলেও তাদের দাঁত ও নখ ভাঙ্গা থাকত যাতে সহজে তাদের আক্রমণে রাজা আহত বা নিহত না হন। রাজার স্বচ্ছন্দ বিহারের জন্য অরণ্য অঞ্চলের জলাশয় গুলি অগভীর হত। কোনো ধরনের কাঁটাগাছও মৃগবনে রাখা হত না। পরন্তু আহার্যের প্রয়োজন মেটাতে রাজার মৃগয়াক্ষেত্রে সুস্বাদু ফলবান বৃক্ষ রোপন করা হত।

কৌটিল্য বলেছেন-

“তাবন্মাত্রমেকদ্বারং খাতগুপ্তং স্বাদুফল-গুল্ম-গুচ্ছমকন্টকিদ্রুমমুত্তান-তোয়াশয়ং দান্তমৃগ-চতুস্পদং ভগ্ন -নখ-দংষ্ট্র-ব‍্যালং মার্গায়ুক-হস্তি-হস্তিনী-কলভং মৃগবনং বিহারার্থং রাজ্ঞঃ কারয়েত্।”

iv) অভয়ারণ‍্যরূপে:-

এছাড়া প্রত‍্যন্ত অঞ্চলে বা যোগ‍্য জমি হলে অন‍্যত্র সমস্ত পশুর আশ্রয়ের জন‍্য মৃগবন স্থাপিত হত। এগুলি বর্তমান যুগের অভয়ারণ‍্যের সঙ্গে তুলনীয়।

কৌটিল‍্য বলেছেন-

“সর্বাতিথিমৃগং প্রত‍্যন্তে চান‍্যন্মৃগবনং ভূমিবশেন বা নিবেশয়েত্।”

v) দ্রব‍্যবনরূপে :-

এছাড়াও কৌটিল‍্য নানা ধরনের গাছ বা গুল্মের প্রয়োজনে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বৃক্ষরোপন করে কৃত্রিমভাবে বনসৃজনের কথা বলা গেছেন। এইভাবে সেগুন, শাল, অর্জুন, মহুয়া, শিশু, শিরীষ প্রভৃতি বৃক্ষ বিভিন্ন ধরনের বাঁশ, বেত ইত‍্যাদির অরন‍্য গড়ে তোলা হত। এই সমস্ত অরণ‍্যজাত দ্রব‍্য থেকে উৎপন্ন দ্রব‍্যগুলি নির্মাণ -এর জন‍্য প্রয়োজনীয় কারখানাও এই অঞ্চলে স্থাপিত হত। এই বনাঞ্চলগুলিকে বলা হত দ্রব‍্যবন।

মৃল‍্যায়ন:-

সুতরাং, দেখা গেল কৌটিল‍্য রাজ‍্যের সমস্ত জমিই কোনো না কোনো ভাবে ব‍্যবহার করার পক্ষপতী। সেই কারনে চাষের অযোগ‍্য জমি অবহেলায় ফেলে না রেখে তিনি যে সমস্ত উপায়ে সেগুলি ব‍্যবহারের চিন্তা করেছেন তার কয়েকটি বর্তমানযুগেও উপযোগী।

জমির সুষ্টু ব‍্যবহার করা হয়েছে-

  • i) গোচরনভূমি, পশুদের অভয়ারণ‍্য, রাজার মৃগয়াক্ষেত্র ও প্রয়োজনীয় অরণ‍্যসম্পদের জন‍্য দ্রব‍্যবন নির্মান করে এবং
  • ii) ব্রহ্মণদের ব্রহ্মারণ‍্য, সোমারণ‍্য ও তপোবনের উপযোগী অরণ‍্য প্রদান করে।

ভূমিচ্ছিদ্রবিধান অধ‍্যায়ে বিশেষভাবে হস্তিবন সম্বন্ধে কৌটিল‍্য কেন আলোচনা করেছেন?

হস্তিবনের উপযোগিতা:-

প্রাচীন ভারতে চাষের অনুপযোগী জমি আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব‍্যবহৃত হত। সেটি হল ‘হস্তিবননির্মাণ’। প্রাচীন ভারতে যুদ্ধে ব‍্যবহৃত চতুরঙ্গ বলের অন‍্যতম হল রনহস্তী। অত‍্যন্ত বলশালী হওয়ায় এবং অল্প সময়ের মধ‍্যে বহুলোককে হত‍্যা করার সামর্থ‍্য থাকায় যুদ্ধে হাতির প্রয়োজন ছিল খুব বেশি। এই কারনেই কৌটিল‍্য বলেছেন- “হস্তিপ্রধানো হি বিজয়ো রাজ্ঞাম্। পরানীকব‍্যুহ- দুর্গ – স্কন্দাবার -প্রমর্দনা হ‍্যতিপ্রমাণ-শরীরাঃ প্রাণহর-কর্মাণো হস্তিন ইতি।” সুতরাং বিজিগীষু রাজার অবশ‍্যকর্তব‍্য ছিল হস্তিবন নির্মাণ করিয়ে রনহস্তীর রক্ষণাবেক্ষণ। ‘ভূমিচ্ছিদ্রবিধানম্ ‘ অধ‍্যায়ে কৌটিল‍্য বিশেষভাবে হস্তিবন বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন।

ভূমিচ্ছিদ্রবিধান অধ‍্যায়ে উৎকর্ষ অপকর্ষের বিচারে কোন কোন অঞ্চলের হস্তী উল্লেখ হয়েছে?

কৌটিল‍্যের মতে, কলিঙ্গ ও অঙ্গদেশের হাতি এবং পূর্বদেশীয় ও চেদি, করাষদেশে জাত হাতি উত্তমশ্রেনীর দশার্ন ও অপরান্তের হাতি মধ‍্যম শ্রেনীর এবং সুরাষ্ট্র ও পঞ্চনদের হাতি অধম শ্রেনীর। কৌটিল‍্য তাই বলেছেন –

” কলিঙ্গাঙ্গ – গজাঃ শ্রেষ্ঠাঃ প্রাচ‍্যাশ্চেদ-করুষজাঃ।
দাশার্নাশ্চাপরান্তাশ্চ দ্বিপানাং মধ‍্যমা মতাঃ।
সৌরাষ্ট্রিকাঃ পাঞ্চনদা স্তেষাং প্রত‍্যবরাঃ স্মৃতাঃ।।”

Leave a Comment